রঙ্গময়ি এখন বয়সের ভারে কিছু শ্রান্ত। নাম ভুলে যান, কথার খেই হারিয়ে ফেলেন। তবু সারাদিন প্রায় আশি বছরের শরীরটাকে এতটুকু বিশ্রাম দেন না। এখনও নিজে রাঁধেন, ঘর ঝট দেন, ঘণ্টার পর ঘণ্টা জপতপ করেন। বললে বলেন, খাটি বলে বেঁচে আছি।
বেঁচে থাকা যে রঙ্গময়ির কাছে খুব সুখকর এমন নয়। তবে রঙ্গময়ি বেঁচে ছিলেন বলেই এদের সংসারটা জোড়াতাপ্পি দিয়ে চলেছিল। অনেক শিশু বেঁচে গিয়েছিল অকালমৃত্যুর হাত থেকে, নিবারিত হয়েছিল সংসারের কিছু অনিবার্য ভাঙন।
রঙ্গময়ি দোতলার সিঁড়ির মুখের চাতালে একটা মোড়া পেতে বসা। ধ্রুবকে দেখেই বলে উঠলেন, এই, তোর অশৌচ না! সদ্য ছেলের বাপ হয়েছিস, আঁতুর-মাখা!
তা হলে চলে যাব নাকি?
তাই বললাম বুঝি? পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করিস না। তফাতে বোস।
তোমার বড় বাতিক।
তা তো বটেই। ছেলে কেমন হল?
ভাল করে দেখিনি। সব বাচ্চাই একরকম।
বাচ্চা একরকম হলে কি হয়! বংশের ধারা যখন পাবে তখন দেখবি কেমন অন্যরকম হয়! এই নবা, ওকে একটা চেয়ার দে।
ধ্রুব বসল।
রঙ্গময়ি বললেন, খুব কষ্ট পেল মেয়েটা।
কোন মেয়েটা?
তোর বউটা। আবার কে! বেঁচে যে আছে সেই ঢের। ও মরলে কৃষ্ণটাও বুঝি বাঁচত না। আমি দিনরাত ভগবানকে ডেকেছি।
সব খবরই রাখো তা হলে?
খবর রাখব না? কেন? বিলেতে থাকিস নাকি!
ধ্রুব চুপ করে থাকে। রঙ্গময়ির কাছে সে কেন এসেছে তা ঠিক বুঝতে পারে না। কিন্তু এসে তার খারাপ লাগছে না। এ যেন একটা প্রাচীন গাছের কাছে বসে থাকা। এ যেন পিদিমের আলোয় এক প্রাচীন পুঁথি পাঠ।
০৭৫. এক সাহেব ডাক্তার আনানো হল
এক সাহেব ডাক্তার আনানো হল ঢাকা থেকে। দেখেশুনে তিনি বললেন, হি হ্যাজ কনস্টিটিউশন অফ এ বুল। নাথিং টু ফিয়ার। হি উইল পুল আউট।
হেমকান্ত সম্পর্কে এই উক্তি যে কতটা খাঁটি তা দশ দিনের মাথায় বোঝা গেল। দু-দুটো গভীর ক্ষত এবং প্রচুর রক্তপাতজনিত অবসাদ কাটিয়ে হেমকান্ত উঠে বসলেন। বললেন, হাসপাতালে আর-একদিনও নয়। আমার বংশে কেউ কখনও হাসপাতালে যায়নি।
এগারো দিনের দিন তিনি একরকম জোর করে হাসপাতাল থেকে বাড়ি চলে এলেন। তাঁর বাড়ি ফেরায় একটা উৎসবের মতো হইচই ছড়িয়ে পড়ল শহরে। বহু লোক দেখা করতে এলেন। বিস্তর প্রজাও এল বিভিন্ন মহল থৈকে। বাড়িতেও বেশ মানুষের ভিড়। খবর পেয়ে বড়, মেজো দুই ছেলেই সপরিবারে চলে এসেছে। এসেছে মেয়েরাও। গিজগিজ করছে বাড়ি।
ভিড় একটু কমলে দুর্বল শরীরে হেমকান্ত চোখ বুজলেন। আগাগোড়া তার কাছে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিল রঙ্গময়ি। এতক্ষণ কথা বলেনি, বারবার শুধু চোখের জল মুছেছে আঁচলে। লোকের ভিড়ে কথা বলার সুযোগ পায়নি এতক্ষণ, এবার পেল।
হেমকান্ত রঙ্গময়ির দিকে তাকাননি ভাল করে। তবে তার দেহের গন্ধ এবং নৈকট্যজনিত একটা তাপ টের পাচ্ছিলেন এত হইচইয়ের মধ্যেও। আশ্চর্য এক সুখানুভূতিতে তার অভ্যন্তর টইটম্বুর হয়ে যাচ্ছিল। রঙ্গময়ি যে তার জীবনে কতখানি জুড়ে আছে তা যেন এতদিনে খুব স্পষ্টভাবে অনুভব করলেন।
চোখ বুজে রেখেই হেমকান্ত মৃদুস্বরে ডাকলেন, মনু।
বলো।
অত চোখের জল ফেলছ কেন? আমি তো বেঁচেই আছি এখনও।
চোখে জল আসবে না? বেঁচে আছ সেই আনন্দেই চোখে জল আসছে।
বেঁচে থেকে আমার কিন্তু তেমন আনন্দ হচ্ছে না।
কেন? তোমার কি মরার ইচ্ছে নাকি?
অনেকটা তাই। মরার জন্য দীর্ঘদিন অপেক্ষা করতে আর ভাল লাগে না। মরতে যখন হবেই তখন সেই ভয়ংকর ব্যাপারটা এবারই চুকে গেলে হত। আর দুশ্চিন্তা করতে হত না।
সে তো বুঝলাম। স্বার্থপরেরাই ওরকম ভাবে। তুমি মরলে আমার কী হত বলো তো! কী নিয়ে। বাকি জীবনটা কাটত আমার?
একটু হেসে হেমকান্ত চোখ খুলে মুখ তুলে রঙ্গময়ির দিকে তাকালেন। রঙ্গময়ি এই কয়দিনে খুব রোগা হয়ে গেছে। অনেক কান্নার চিহ্ন পড়েছে চোখের কোলে। চুলে এলোমেলো ভাব। পোশাকে পারিপাট্য নেই। তবু রঙ্গময়ির ধারালো মুখখানা পিপাসার্তের মতো মুগ্ধ হয়ে চেয়ে দেখেন হেমকান্ত। বলেন, এমন অবস্থা হয়েছে নাকি তোমার?
কেন? অন্যরকম অবস্থা আবার কবে ছিল?
হেমকান্ত একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, যে-ই আমাকে মেরে থাকুক সে আমার একরকম উপকারই করেছে। অনেকদিনের একটা দ্বিধা কেটে গেছে আমার।
কীসের দ্বিধা গো?
বিপদে না পড়লে তো মনটাকে ঠিক বোঝা যায় না। যখন লোকটা আমাকে ছোরা মারল তখন আমি হঠাৎ বুঝলাম, আয়ু ফুরিয়ে এল, আর সময় নেই। সেই সময় সকলের আগে কার কথা মনে পড়ল জানো?
রঙ্গময়ি চোখ নত করল।
হেমকান্ত বললেন, তোমার কথা। গাড়োয়ানকে বললাম, গাড়ি ছুটিয়ে শিগগির আমাকে মনুর কাছে পৌঁছে দে। তারপর যা হয় হবে।
জানি।–বলে রঙ্গময়ি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, কিন্তু এই বিপদের মধ্যে আর নয়। তোমাকে কলকাতায় বা অন্য কোথাও যেতে হবে।
হেমকান্ত বিস্মিত হয়ে বলেন, কেন মনু?
যারা তোমাকে মারার চেষ্টা করেছিল তারা তো জানে তুমি মরোনি।
সে তো জানেই। তাতে কী? আবার অ্যাটেমপ্ট করবে বলে ভাবছ? করুক। আমি ভয় পাই না।
তুমি পাও না, কিন্তু আমি পাই।
তুমিই বা পাবে কেন? তুমি না স্বদেশি করা!
স্বদেশি করি কে বলল তোমায়?
আমি কি বোকা, মনু?
রঙ্গময়ি তীব্র চোখে হেমকান্তর দিকে চেয়ে বলল, তার সঙ্গে তোমার কী সম্পর্ক? তোমাকে কিছু লোক মারতে চেষ্টা করছে আর আমি স্বদেশি করি বলে হাল ছেড়ে দেব, এটা কেমন যুক্তি হল?
