ধ্রুব সরে যেতে চায় আরও একটা কারণে। সে বুঝতে পারছে, কলকাতা শহরের আবাল্য পরিবেশে সে আর মনের খাদ্য পায় না। কেমন স্তিমিত হয়ে আসছে সব উৎসাহ, উদ্দীপনা, যৌবনের উচ্ছলতা। তার উচ্চাশা নেই, ডেভ পর্যন্ত হয় না কিছুতে। রোজ বার বার এক ঠেক থেকে আর-এক ঠেক, এক চেনা মুখ থেকে আর-এক চেনা মুখ, এইরকম ফুর্তি বা ফুর্তির চেষ্টা করতে করতে তার মনে হয় যেন সে বিভিন্ন দেয়ালে মাথা ঠুকে ঠুকে ফিরে আসছে। কোনও মানে হয় না এরকম জীবনের। নাসিক তাকে এরকম জীবনযাপন থেকে মুক্তি দিতে পারে। আর এক মুক্তি ঘটবে রেমির কাছ থেকে। এমন নয় যে রেমিকে সে ঘৃণা করে। তা নয়। তবু রেমি এক জগদ্দল বোঝার মতো চেপে আছে ঘাড়ে। সে মেয়েদের সঙ্গে ভাবালুতার কথা বলতে পারে না, কোনও মেয়েকেই একনিষ্ঠ গাড়লের মতো ভালবেসে যাওয়াও তার পক্ষে সম্ভব নয়। ওরকম প্রতিভা তার কোনও দিনই ছিল না। তাই যৌনতা ছাড়া রেমির সঙ্গে সে ঘনিষ্ঠতর কোনও সম্পর্ক স্থাপন করতে পারেনি। আর কে না জানে, যৌনতা বড় অগভীর এক অভ্যাস মাত্র। তা দুই নর-নারীর সম্পর্ককে কখনও দৃঢ় করে না।
ভরসা এই, কৃষ্ণকান্ত তার মতো দায়িত্বজ্ঞানহীনের সঙ্গে নবজাতক সহ স্নেহের বউমাটিকে কিছুতেই ছাড়বেন না। রেমিও তো নতুন খেলনা পেল। ছেলে। এবার ধ্রুবর মুক্তি।
আস্তে আস্তে ব্রিজটা পেরোয় ধ্রুব। চেতলায় পা দিয়ে আদিগঙ্গার ধার ধরে উত্তরমুখো রাস্তায় হাঁটতে থাকে। মিনিট পাঁচ-সাত হাঁটার পর গলিটা ঠাওর পায়। অন্ধকার গলি, স্যাতদাঁতে, ঘিঞ্জি। শেষ প্রান্তে অন্য দুটো বাড়ির সঙ্গে জড়ামরি করে একটা লাল ছোট দোতলা বাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। খুব পুরনো বাড়ি। প্রায় ত্রিশ বছর আগে বাড়িটা এক দেউলিয়া মক্কেলের কাছ থেকে খুব সস্তায় কিনে নেন কৃষ্ণকান্ত। তারপর এক মহিলাকে দানপত্র লিখে দেন। সেই ঘটনার ফলে এক প্রচণ্ড শোরগোল উঠেছিল আত্মীয়মহলে। কিন্তু কৃষ্ণকান্ত গ্রাহ্য করেননি। এই মহিলা কোনওদিন কালীঘাটে তাদের বাড়িতে আসেননি, তবে তাঁর ভাইপো-ভাইঝিদের কেউ কেউ আসে। মাঝে মাঝে।
ছেলেবেলা থেকেই ধ্রুব গুজবটা শুনেছিল। এই মহিলা নাকি তার দাদু হেমকান্তর গুপ্ত প্রণয়সঙ্গিনী ছিলেন। সোজা কথায় রক্ষিতা। অন্য মতে হল, ইনি হেমকান্তর দ্বিতীয় স্ত্রী, অর্থাৎ ধ্রুবর ঠাকুমা।
তখন ধ্রুবর মা বেঁচে ছিল। এই মহিলাকে নিয়ে একদিন খাওয়ার টেবিলে মা ও বাবার একটু তর্কাতর্কি হয়েছিল। কী বিষয় নিয়ে তা ধ্রুব জানে না। সম্ভবত মা কৃষ্ণকান্তর বাবার চরিত্র নিয়ে কোনও কটাক্ষ করে থাকবে। মায়ের এই স্বভাব ছিল। মাকে ভালবাসত ধ্রুব, কিন্তু এটাও লক্ষ করেছে যে, সুযোগ পেলেই তার মা নানা ছুতোয় তার বাবাকে হেয় করার চেষ্টা করত। বোধহয় সেরকমই কোনও দাম্পত্য বাদানুবাদ হয়েছিল সেই রাত্রে।
কৃষ্ণকান্ত হঠাৎ একটা হুংকার দিয়ে চাকরকে ডাকলেন। বললেন, ছেলেমেয়েদের ডেকে নিয়ে আয়।
তারা তিন ভাই তখনও ছোট, লতু নিতান্তই বাচ্চা। চারজনকে খাবার টেবিলের চারধারে বসালেন কৃষ্ণকান্ত। তারপর সকলের মুখের দিকে ভাল করে তাকিয়ে নিয়ে গম্ভীর গলায় বললেন, শোনো। ভবিষ্যতে একটা বিষয় নিয়ে কথা উঠতে পারে বলে তোমাদের আজ আমি একটা জিনিস পরিষ্কারভাবে জানাতে চাই। চেতলার বাড়িতে রঙ্গময়ি নামে যে মহিলা থাকেন তিনি তোমাদের ঠাকুমা। আমি তাকে ছেলেবেলায় পিসি বলে ডাকতাম। তার বাবা ছিলেন আমাদের পুরোহিত। আমার বাবা তাকে পরে ধর্মমতে বিবাহ করেন। আমি তাকে আমার মা বলে স্বীকার করেছি। ভবিষ্যতে তার সম্পর্কে যদি কেউ কোনও নোংরা বা খারাপ ইঙ্গিত করে তোমরা তার প্রতিবাদ করবে। তোমরা বলবে যে, তিনি তোমাদের ঠাকুমা। ধর্মত এবং বৈধ ঠাকুমা। বুঝলে? এখন যাও।
তারা কিছুই বোঝেনি। তবে ঘাড় নেড়ে চলে এসেছিল। বুঝেছিল পরে। বড় হয়ে।
চেতলার ঠাকুমার তেজ ছিল সাংঘাতিক। আজও আছে। ধ্রুবর মা আগুনে পুড়ে মরার পব সে। বেশ কিছুদিন একটানা চেতলার ঠাকুমার কাছে ছিল। তাকে তার ছোট ভাই আর লতুকে এখানে দিয়ে গিয়েছিলেন কৃষ্ণকান্ত নিজে।
বড় বড় তীক্ষ্ণ চোখ ও ক্ষুরধার মুখশ্রী বিশিষ্ট এই ঠাকুমাকে ধ্রুব বরাবর পছন্দ করেছে। প্রচণ্ড স্বাবলম্বী ও পরিশ্রমী। দারুণ দাপট আর শাসনে সবাই ঢিট থাকে সব সময়ে। যেটা শাসনে হয় না সেটা হয় তার ভালবাসার তীব্রতায়। এমন স্বার্থশূন্য মানুষ ধ্রুব খুব কম দেখেছে।
ধ্রুব গলিটায় ঢুকে বাড়ির কড়া নাড়ল। নীচের তলাটা আজকাল ফাঁকা থাকে। ঠাকুমার ভাইপোরা তফাত হয়েছে, নাতি-নাতনিও বড় কেউ কাছে থাকে না। ঠাকুমার নাতনিদের মধ্যে একজন ছিল বিজয়া। ধ্রুবর প্রথম ভিকটিম। অর্থাৎ বিজয়া তার প্রেমে পড়েছিল। সে পড়েনি। ধ্রুব কোনওদিনই কেন কারও প্রেমে পড়তে পারল না? কেন পারল না?
এই নিদারুণ প্রশ্নটা নিয়ে যখন সে হতবুদ্ধির মতো দাঁড়িয়ে আছে বন্ধ দরজার সামনে, তখন ওপাশ থেকে প্রশ্ন এল, কে?
আমি ধ্রুব। কালীঘাটের ধ্রুব।
ও! ধ্রুবদা!
দরজা খুলে একটি কিশোরী হাসিমুখে দাঁড়ায়।–তোমার ছেলে হয়েছে জানি। মিষ্টি আনলে না?
ঠাকুমার এই নাতনির নাম নবা।
ধ্রুব একটু লাল হয় লজ্জায়। বলে, ঠাকুমা কী করছে?
বসে বসে বকবক করছে। আর কী করবে? এসো।
ধ্রুব ওপরে উঠে আসে। পুরনো বাড়িটাকেও ঘষে মেজে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা হয় সবসময়। অপরিচ্ছন্নতা রঙ্গময়ির ভীষণ অসহ্য। ধ্রুব এমন পরিপাটি গোছানো সংসার বড় একটা দেখেনি।
