সে উঠে হালকা কিছু ব্যায়াম করল। তার শরীর নমনীয় এবং সুগঠিত। সহজে কোনও অসুখ করে না। কিন্তু যখন করে তখন ভোগায়। ধ্রুব অসুখ-বিসুখকে বড় ভয় পায়। কারণ অসুখ মানেই এক ধরনের বন্দিত্ব। বন্দিত্ব তার অসহ্য।
গরম জলে কষে স্নান করল সে। শরীর অনেক ঝরঝরে লাগতে লাগল। ঘরে আসতেই ঠাকুর উঁকি দিয়ে জিজ্ঞেস করল, খাওয়ার ঘরে যাবেন, না এখানে খাবার দিয়ে যাব?
খাওয়ার ঘরে।
ধ্রুব, পায়জামা আর পাঞ্জাবির ওপর শাল জড়িয়ে নেয়। গরম জলে স্নান করার পর শীতটা একটু বেশি লাগছে।
ঠাকুর গরম ভাত বেড়ে দিয়েছে টেবিলে। ধ্রুব ভাত ভাঙল। তারপর ঠাকুরের দিকে চেয়ে বলল, বউদি কেমন আছে জানো?
ঠাকুর শশব্যস্তে বলল, ভাল।
ঠিক জানো?
হ্যাঁ দাদাবাবু। আমি তো দুপুরেই নার্সিংহোমে গিয়েছিলাম।
নিশ্চিন্ত হল ধ্রুব। লতুর কথা যে তার বিশ্বাস হয়নি তা নয়। তবে এমন হতে পারে যে, কোনও অশুভ কিছু ঘটে থাকলে লতু হয়তো সত্যি খবরটা তাকে দিতে চায়নি।
পেট ভরে খাওয়ার পর ধ্রুব ঘরে এসে একটা সিগারেট ধরায়। পেট ভরার পর এক ধরনের আলসেমি জড়িয়ে ধরেছে তাকে। একবার নার্সিংহোমে যাওয়া উচিত সে বুঝতে পারছে। কিন্তু উৎসাহ পাচ্ছে না।
জানালা দিয়ে সে বাড়ির পিছনকার ছোট্ট বাগানটার দিকে চেয়ে থাকে। রাঙা রোদে নম্র ও স্বপ্নময় হয়ে আছে জায়গাটা। পপি ফুল ফুটেছে অনেক। নিঃশব্দ এক প্রাণের খেলা চলছে এই এক টুকরো বাগানের পরিধিতেও।
ধ্রুব সিগারেটটা শেষ করে কিছুক্ষণ শুয়ে থাকে বিছানায়। ভাল লাগে না। এবকম শুয়ে বসে। সময় কাটানোর মানেই হয় না কিছু। বিকেলবেলা ঘরে থাকতেও পারে না সে।
ধ্রুব উঠল। চটি পরে আস্তে আস্তে বেরিয়ে এল বাড়ি থেকে। তারপর হাঁটতে লাগল। এমন উদ্দেশ্যহীন ভাবে বহুকাল সে হাঁটেনি। কিন্তু কিছুক্ষণ হাঁটবার পর সে বুঝতে পারে, এটারও কোনও মানে হয় না। হেঁটে যদি কোথাও যাওয়ার না থাকে তবে হাটবাব মানে কী?
আসলে ভীষণরকম একঘেয়ে লাগছে তার বিকেলটা। এরকম তো লাগে না। আজ লাগছে। কেন?
গা গরম করা এবং সময় কাটানোর মতো একটা জিনিস আছে। মদ। কিন্তু গতকালের অভিজ্ঞতা তার ভাল নয়। আজ সকালে অল্পক্ষণের জন্য হলেও সে অজ্ঞান হয়ে পড়ে গিয়েছিল রাস্তায়। না, আজ সে মদ খাওয়ার সাহস পাচ্ছে না। শরীরের ভিতরে যদি কোনও গোলমাল ঘটে গিয়ে থাকে তবে সেটাকে একটু থিতোনোর সময় দেওয়া ভাল।
তার দুরকম বন্ধু আছে। একরকম–জুয়াড়ি, মদ্যপ, বদমাশ, লোচ্চা এবং গুন্ডা। আর একদল ভদ্র, শিক্ষিত, মধ্য বা উচ্চবিত্ত। কারও সঙ্গেই বস্তুত তার খুব ঘনিষ্ঠতা নেই। থাকার কথাও নয়। সে কাউকেই খুব বেশিক্ষণ সহ্য করতে পারে না। নিয়মিত কোথাও সে আড্ডা দেয় না। তার অনেকগুলো ঠেক আছে। কোনওটা মেসবাড়ি, কোনওটা শুড়িখানা বা জুয়ার আড্ডা, একজন নষ্ট মেয়েমানুষের ঘর অবধি, আর আছে কফি হাউস, ধারার ফ্ল্যাট, দুটো ক্লাব ইত্যাদি। যখন যেটায় খুশি যায় বা যায় না। মাঝে মাঝে ধ্রুব একা-একা ঘুরে বেড়ায় ভূতগ্রস্তের মতো। কখনও কলকাতার বাইরে পাড়ি দেয়।
শিগগিরই, যদি তার বাবা কৃষ্ণকান্তর চাল খেটে যায়, তবে তাকে যেতে হবে নাসিকে। জায়গাটায় সে গেছে। ভাল নয়, খারাপও ন্য। কৃষ্ণকান্তর এক বন্ধুর ফার্ম আছে সেখানে। তার সঙ্গে ব্যাবসাতে জুড়ে দেওয়া হবে তাকে। কিন্তু মুশকিল হল, কৃষ্ণকান্ত সেটা পেরে উঠবে কি না সেটাই। প্রশ্ন।
তার বাবাকে সবাই সমীহ করে, একথা ঠিক। একথাও ঠিক বাংলাদেশের এনিমি প্রপার্টির ক্ষতিপূরণ বাবদ টাকাও আইনত কৃষ্ণকান্তর প্রাপ্য। কিন্তু কথাটা সবাই মেনে নিচ্ছে না। তার দাদু হেমকান্ত অন্য দুই ছেলেকে বঞ্চিত করে ছোট ছেলের নামে সব বিষয়-সম্পত্তি উইল করে ন্যায্য কাজ করেননি একথা ধ্রুবও মানে। এই উইলের ফলে রাগ করে বহুকাল আগে তার জ্যাঠা। কনককান্তি কলকাতার বাড়ি ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন, আর কখনও এ বাড়ির চৌকাঠ মাড়াননি। সেই জ্যাঠা এবং সেজো জ্যাঠার ছেলেরা বড় হয়েছে। তারা ফুসছে। এনিমি প্রপার্টির টাকা বড় কম নয় এ বাজারে। প্রায় ত্রিশ লক্ষ টাকা দাবি করেছেন কৃষ্ণকান্ত। কাটছাট হওয়ার সম্ভাবনা কম, কারণ তিনি প্রাক্তন মন্ত্রী এবং সম্ভাব্য এম পি। এত টাকা যদি পেয়েই যান কৃষ্ণকান্ত ৩বে আত্মীয়রা তার ভাগ আশা করবে না কেন? কৃষ্ণকান্তকে তারা এত স্বার্থপর হতে কেনই বা দেবে?
কৃষ্ণকান্ত কী চান তা ধ্রুব খানিকটা আঁচ করতে পারে। তিনি আপাতত ধ্রুবকে দূরে সরিয়ে দিয়ে একটা লাগাতার দুশ্চিন্তা থেকে অব্যাহতি পেয়ে রাজনীতিতে নতুন কোনও খেলা শুরু করবেন। এনিমি প্রপার্টির টাকার কিছু ধ্রুবকে দেবেন, বাকিটা ঢালবেন রাজনীতিতে। সাধ্বী নারীর সতীত্ব, ধার্মিকের সততা, নেতার আদর্শ থেকে শুরু করে সবকিছুই আজকাল ক্রয় বা বিক্রয়যোগ্য।
কিন্তু আশ্চর্য এই, ধ্রুব কৃষ্ণকান্তর এই শেষ প্রচেষ্টায় বাধা হতে চায় না।
কেওড়াতলার কাছে আদিগঙ্গার ওপর কংক্রিটের ব্রিজে এসে দাঁড়ায় ধ্রুব। অবিরল পোড়া ঘিয়ের গন্ধ সমেত মড়া পোড়ানো ধোঁয়া এসে নাকে লাগছে। অনির্বাণ চিতার আলো জ্বলছে শ্মশানে। ধ্রুব সেইদিকে চেয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। তার কোথাও যেতে ইচ্ছে করে না আজ।
কৃষ্ণকান্তর জীবনে যে এটাই শেষ উদ্যোগ হবে তা ধ্রুব ভাল করেই জানে। আত্মিক জোর বহুকাল আগে শেষ হয়ে গেছে কৃষ্ণকান্তর, ছেড়ে গেছে নীতিবোধ, ছিল শুধু অফুরন্ত শারীরিক ক্ষমতা। এখন বোধহয় সেটাও শেষ হয়ে আসছে। আর বেশিদিন নয়।
