প্রথমেই ট্যাকসি হাঁকড়ে এসে গেল লালটু। ভিতরে ভিতরে যত বিরোেধই থাক, পরিবারের কেউ বিপদে পড়লেই সে আগে ঝাঁপিয়ে পড়ে।
লাউঞ্জে বসে কৃষ্ণকান্ত একটা কোল্ড ড্রিংক খাচ্ছিলেন। ভিতরে প্রচণ্ড উদ্বেগ ও দুশ্চিন্তা, গলা শুকিয়ে কাঠ। নার্সিংহোমের কর্তৃপক্ষ অবশ্য তিনি উঠতে বললে উঠছে, বসতে বললে বসছে, কিন্তু তাতে তিনি নিশ্চিন্ত হতে পারছেন না। জীবন-মৃত্যুর ওপর কোনও খলিফারই তো হাত নেই।
লালটু ঢুকল বুনো মোষের মতো। তেমনই প্রকাণ্ড চেহারা, বেশ বড়সড় একটা ভুঁড়ি, বড় বড় শ্বাস ফেলে, প্রচণ্ড জোরে কথা বলে। ঢুকেই বলল, সেই হারামজাদাটা কোথায়?
কৃষ্ণকান্ত একটু হতাশ ভঙ্গিতে মাথা নাড়লেন। হারামজাদা এক ও অদ্বিতীয় ধ্রুব। ছেলেটা তাকে কতদুর ডোবাবে তা তিনি এখনও জানেন না। মতিগতি ফেরানোর জন্য একটু অল্প বয়সেই বিয়ে দিয়েছিলেন। লাভ হয়নি।
লালটু বলল, আপনি বাড়ি চলে যান কাকা। আমরা তো আছি। আপনি বুড়ো মানুষ, রাত জেগে বসে থাকার কী দরকার?
কৃষ্ণকান্ত একটু গা ঢিলে দিয়ে একটা সোফায় বসে আছেন। পাশে নার্সিংহোমের সুপারিনটেনডেন্ট ও আর-একজন উচ্চপদস্থ গোছের লোক খুব সতর্ক মুখচোখ নিয়ে উপবিষ্ট। কৃষ্ণকান্ত কোল্ড ড্রিংকের ঔ-তে আর-একটা মৃদু টান দিয়ে বললেন, যাব। রক্ত দেওয়ার লোকজন সব আসুক।
আর কে আসবে?
কৃষ্ণকান্ত লালটুর কথার জবাব দেওয়ার আগেই সুপারিনটেনডেন্ট বিনীতভাবে বলল, ব্লাড উইল বি নো প্রবলেম স্যার।
কৃষ্ণকান্ত একথাটায় বিরক্ত হলেন। মাথা নেড়ে বললেন, প্রবলেমটা তোমার বোঝার কথা নয়, মিত্র। তোমরা সব আপ টু ডেট লোক। ব্লাডের ব্যাপার বোঝো না। আমার একটু সংস্কার আছে। আই ওয়ান্ট ব্লাড অফ মাই ওন ক্ল্যান। এটা সায়েন্টিফিক ব্যাপার কিছু নয়, কিন্তু সংস্কার।
মিত্র কথা বাড়াল। শ্রদ্ধার সঙ্গে চুপ করে রইল।
লালটু বলল, কত রক্ত লাগবে? ধ্রুবর বউ তো একটা চিংড়ি মাছের মতো। যা লাগবে আমিই দিতে পারব।–বলে একখানা অতিশয় বলিষ্ঠ হাত বাড়িয়ে দেখাল।
কৃষ্ণকান্ত বললেন, যা লাগার লাগবে। প্রস্তুত থাকা ভাল। ওই তো বোধহয় কানু আর চানু এল। দেখ তো লালটু।
লালটু লাউঞ্জের সিঁড়ি দিয়ে নামে। একটা ট্যাকসি থেকে কানু আর চানু নামছে। তার খুড়তুতো ভাই। বড় কাকার ছেলে। দুজনই ব্রিলিয়ান্ট। একজন শিবপুরে বি ই, অন্যজন এম বি বি এস পাশ করে এম এস করছে। তাদের সঙ্গেই এসেছে বড় পিসির ছেলে সুশান্ত। সে ব্রিলিয়ান্ট নয় বটে, কিন্তু দুর্দান্ত মস্তান। হাঁক-ডাকে ওস্তাদ লোক। লালটু তিনজনকে তাড়া দিয়ে বলল, যা যা ভিতরে যা। আমি একটু এগিয়ে দেখি আর কে আসে।
তিনজনই দৌড় পায়ে ভিতরে চলে গেল। লালটু বাইরে এসে দাঁড়াল। সামনেই একটা তেমাথা। পেট্রল পাম্প। রাত গভীর হওয়ায় রাস্তায় লোকজন নেই। মাঝে মাঝে এক-আধটা মোেটর বা ট্যাকসি দারুণ জোরে বেরিয়ে যাচ্ছে। মধ্যরাত্রির কলকাতার একটা অদ্ভুত চরিত্র আছে। এই কলকাতাকেই লালটুর বেশি পছন্দ। লালটুর বয়স পঁয়ত্রিশ-ছত্রিশ। মাত্র ছ-সাত বছর আগেও সে কলকাতার হার্স্ট টিভিশনে ফুটবল খেলেছে। দুবছর ইস্টবেঙ্গলেও ছিল। জীবন এখনও তার কাছে ফুটবলের মতোই উপভোগ্য, টানাপোড়েন ও উত্তেজনায় ভরা। লালটু ফুর্তি করতে ভালবাসে, মারপিট করতে ভালবাসে, মড়া পোড়াতে ভালবাসে। তার ভালবাসা বিচিত্র ও বহুমুখী। তার রাগ সাংঘাতিক, ভালবাসাও সাংঘাতিক। যাকে ভালবাসে তার জন্য জান দিতে পারে, যার ওপর রাগ। হয় তার গলা কেটে ফেলার কথা ভাবে। এই চরমপন্থী মনোভাব তাকে বহুবার বহু সমস্যায় ফেলেছে। ইস্টবেঙ্গল ক্লাবে সে টিকে থাকতে পারেনি এই স্বভাবের দরুন। এই স্বভাবের জনাই যে মেয়েটিকে সে সত্যিকারের ভালবাসত তাকে বিয়ে কবতে পারেনি। সবচেয়ে যেটা গুরুতর সেটা হল, উগ্র মেজাজের জন্য বহুবার তাকে চাকরি ছাড়তে হয়েছে। এখন সে ব্যাংকের অফিসার বটে, কিন্তু আরও একটু উঁচু জায়গায় তার এতদিনে থাকার কথা ছিল। আত্মীয়স্বজনরা বলে, লালটুর পাতিল কালা হয় না। বাঙাল ভাষার কথাটার সাদা অর্থ হল, তার হাঁড়ি কালো হয় না। তবে সে যে দিলদরিয়া লোক এটা সবাই স্বীকার করে। নিজেদের বৃহৎ পরিবার ও আত্মীয়স্বজনের প্রতি তার আনুগত্য নিরেট ও অটল। ছোটকাকার সঙ্গে তার একটা কাজিয়া চলছে বটে, কিন্তু কাকা কাকাই। রক্তের গভীর সম্পর্ক।
লালটু বাইরে দাঁড়িয়ে ফাঁকা বাস্তাঘাট লক্ষ করছিল। আরও লোক আসবে। তাদেরই জ্ঞাতিগুষ্ঠি সব। রেমির অত রক্ত কিছুতেই লাগবে না। কিন্তু ছোটকাকার স্বভাবই হল ওই। যে কোনও উপলক্ষে নিজের বৃহৎ পরিবারটির সকলকে জড়ো করে ফেলবেন। গোষ্ঠীপতি হিসেবে তিনি নিজের ক্ষমতাটা এইভাবেই যাচাই করতে ভালবাসেন মাঝে মাঝে।
লালটুর হঠাৎ নজরে পড়ল, বাইরের আবছায়ায় দেয়ালে ঠেস দিয়ে একটা অল্পবয়সি ছেলে দাঁড়িয়ে আছে। খুব উদাস ভঙ্গি। লালটুর ছেলেটাকে চেনা-চেনা লাগছিল। সে দু পা এগোল।
আরে! তুমি রেমির ভাই না?
ছেলেটা একটা জ্বলন্ত সিগারেট টুক করে ফেলে চটিতে মাড়িয়ে বলল, হ্যাঁ, আপনি তো লালটুদা!
কতক্ষণ এসেছ তুমি?
অনেকক্ষণ। সেই সন্ধে থেকেই। আমি একা নই। বাবা, মা, দাদা সবাই আছে।
কোথায়! দেখলাম না তো!
ওরা ওপরে। বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে। আমার হাসপাতালের গন্ধ ভাল লাগে না বলে নীচে এসে দাঁড়িয়ে আছি।
