শচী হেসে ফেলে বলে, দরকার? তা হলে…
তাহলে কী?
শাসনের জন্য একজন লোক তো চাই।
বিশাখা মুখ নত করল। হাসি নেই মুখে, তবে একটু স্মিত ভাব। পরমুহূর্তেই সংযত আর গম্ভীর হয়ে বলে, বাবা সত্যিই ভাল আছেন তো?
সত্যিই ভাল আছেন। অন্তত প্রাণের ভয় নেই।
আমি একটু পুজো দিতে যাব কালীবাড়িতে।
যাও না!
খুব ধীরে ধীরে বিশাখা সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেল। একদৃষ্টে চেয়ে রইল শচীন। কী অপূর্ব, কী অপার্থিব সৌন্দর্য এই মেয়েটির।
০৭৪. ধ্রুবর যে একটা কিছু হয়েছে
ধ্রুবর যে একটা কিছু হয়েছে তা আশঙ্কা করেছিল জয়ন্ত। তাই সতর্কতাবশে সে রেস্টুরেন্টের দরজার বাইরে এসে ধ্রুবকে দেখছিল হাঁটার ভঙ্গিটা কিছু অস্বাভাবিক। যেন জল ভেঙে হাঁটছে। পদক্ষেপ সমান মাপের নয়। শরীরটা একটু ঝুঁকে আছে।
ধ্রুব যখন পড়ল তার আগেই জয়ন্ত লম্বা লম্বা পায়ে এগিয়ে গেছে তার দিকে।
ধ্রুবর জ্ঞান ছিল না। কপালটা ঠুকে গেছে ফুটপাথের শানে। একটু রক্ত পড়ছিল ক্ষতস্থান থেকে।
এত সকালে রাস্তায় বিশেষ লোকজন থাকে না বলে একটা সিন হল না। জয়ন্ত ধ্রুবকে চিত করে শুইয়ে হাইড্রাস্টের নোংরা জল তুলে ঝাপটা দিল চোখে। কয়েকবার ঝাপটা দিতেই ধ্রুব তাকায়। আস্তে আস্তে উঠেও বসে। তবে চোখের দৃষ্টি কাচের মতো ভাবলেশহীন, মুখ সাদা।
জয়ন্ত জিজ্ঞেস করে, এখন কেমন লাগছে?
বেটার। কী হয়েছিল বলো তো? পড়ে গিয়েছিলাম নাকি?
আপনার ডাক্তার দেখানো দরকার।
বার বার ওকথা বলছ কেন? আমার কিছু হয়নি।
জয়ন্ত একথার জবাব না দিয়ে ধ্রুবকে ধরে আস্তে আস্তে দাড় করাল। তারপর বলল, একটা ট্যাকসি ধরে দিই, বাড়ি চলে যান।
বাড়ি! —বলে ধ্রুব কিছুক্ষণ ভাববার চেষ্টা করে। কিন্তু তার চিন্তাশক্তি ভাল কাজ করছে না। মাথাটা শূন্য। একটু ভাববার চেষ্টা করে হাল-ছাড়া গলায় বলল, তাই করি তা হলে। আমি কেন যে নিজের ওপর গ্রিপ হারিয়ে ফেলছি!
সকালবেলায় ট্যাকসি সহজলভ্য। জয়ন্ত একটা ট্যাকসি ধরল এবং ধ্রুবকে তুলে নিজেও উঠে বসল পাশে।
চলুন, পৌঁছে দিয়ে আসি।
রেমির কী হবে?
যা হচ্ছে তা আপনাকে ছাড়াই তো হচ্ছে। কেউ তো আপনার সাহায্য চায়নি।
ধ্রুব কথাটার জবাব দিল না প্রথমে একটু বাদে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, তা বটে। আমার এক ফোঁটা রক্তও নেওয়া হয়নি রেমির জন্য।
বাড়ির সামনে ধ্রুবকে নামিয়ে দেয় জয়ন্ত, নিজে নামে না। ট্যাকসি থেকে মুখ বাড়িয়ে বলে, গিয়ে গরম জলে স্নান করে ভরপেট কিছু খেয়ে নিন।
ধ্রুব ফটক খুলে বাড়িতে ঢোকে। লোকজন, চাকরবাকর আজ চোখেই পড়ল না। নিজের ঘরে এসে ধ্রুব কিছুক্ষণ চুপচাপ বিছানায় পড়ে থাকে। কাল রাতে সে মদের দোকানে ভাঙচুর করেছে। তখনও সে বেশ ফিট ছিল। তারপর পুলিশের খপ্পর থেকে পালাতে দৌড়েছে অনেকটা পথ। তারপর বাড়ি ফিরে রেমির খবর পেয়ে গেছে নার্সিংহোমে। সব ঘটনাগুলো ভেবে দেখল সে। কোথাও কোনও অস্বাভাবিকতা ছিল না তার। অসুস্থতা তো নয়ই। তা হলে কী হল? জ্ঞানবয়সে সে কখনও অজ্ঞান হয়েছে বলে মনে পড়ে না।
শরীরটা যে ভীষণ দুর্বল তা একটু নড়াচড়া করতে গেলেই সে টের পাচ্ছে। মাথাটা বড্ড বেশি ফাঁকা।
কিছুক্ষণ চুপচাপ শুয়ে থাকতে থাকতে কখন টুপ করে ঘুমের মধ্যে তলিয়ে গেল সে, টেরও পেল না।
যখন ঘুম ভাঙল তখন দুপুর গড়িয়ে গেছে। শীতের বেলা প্রায় শেষ হয়ে এল। রোদের আভায় লালচে রং ধরে গেছে।
ডাকছিল লতু, এই ছোড়দা, ওঠ! খাবি না!
ধ্রুব খুব কষ্টে চোখ খোলে। কিন্তু জেগে উঠতে আরও খানিকক্ষণ সময় লাগে তার। কিছুক্ষণ সে নিজের ঘর, জিনিসপত্র বা লতুকেও চিনতে পারে না। মাথাটা পরিষ্কার হয়ে যেতে সে পাশ ফেরে। কনুইয়ের ওপর ভর দিয়ে মাথাটা তুলে ঘড়ি দেখে। তিনটে।
লতু বড় বড় চোখ করে তাকে দেখছিল। বলল, কখন এসেছিস কেউ টের পায়নি তো! বাবা ভীষণ ভাবছেন। বোধহয় থানাতেও খবর দেওয়া হয়েছে।
ধ্রুব বহুক্ষণ কিছু খায়নি। সম্ভবত কাল বিকেলের পর থেকে তার পেটে খাবার পড়েনি। এখন পেটের ভিতরে একটা ওলট-পালট হচ্ছে। সে লতুর দিকে চেয়ে বলে, সকালেই এসেছি।
কাউকে ডাকিসনি কেন?
ডাকব কী করে? ঘুমোচ্ছিলাম না!
খবরটা দিবি তো যে বাড়িতে এসেছিস!
আমি একটু স্নান করব। গরম জল দিতে বল তো।
কেন? বাথরুমে গিজার তো আছেই।
তুই চালিয়ে রেখে যা। তোর কি শরীর খারাপ?
হ্যাঁ, উইক লাগছে।
হবেই। কাল থেকে কিছু খাসনি বোধহয়। তার ওপর ওই টেনশন।
এবার বিদ্যুৎ চমকের মতো রেমির কথা মনে পড়ল ধ্রুবর। টেনশন কথাটাই মনে পড়িয়ে দিল। নইলে–আশ্চর্য রেমির কথা তার মনেই ছিল না। সে লতুর দিকে চেয়ে বলল, রেমির কী খবর?
লতু মাথা নাড়ল, ভাল।
কীরকম ভাল?
অপারেশন হয়েছে। ব্লিডিং বন্ধ।
তার মানে বাঁচবে?
হ্যাঁ, বাঁচবে না কেন? তুই ওঠ। আমি গিজার চালিয়ে দিচ্ছি।–বলে লতু বাথরুমে গিয়ে গিজার চালিয়ে ঘরে এসে বলল, আবার যেন ঘুমিয়ে পড়িস না। আমি খাবার তৈরি রাখতে বলে যাচ্ছি ঠাকুরকে। বাবাকে ফোন করে তোর খবর দিতে হবে। ওপরে যাচ্ছি।
বাবা কোথায়?
দুপুর পর্যন্ত নার্সিংহোমে ছিলেন। তারপর রাইটার্সে গেছেন। একটুও বিশ্রাম করেননি আজ। ভয় হচ্ছে অসুস্থ হয়ে না পড়েন। বউদির জন্য যা কান্নাকাটি করেছেন আর যা টেনশন গেছে তাতে কাল রাতেই স্ট্রোক হয়ে যেতে পারত।
ধ্রুব উঠল এবং টের পেল, তার শরীরের গ্লানি অনেকটা কম। দুর্বলতা আছে তবে তা মারাত্মক নয়। তবু নিজেকে তার ভারী শিশু-শিশু লাগছে আজ। লতু তার সঙ্গে কদাচিৎ এত ভাল ব্যবহার করে। এই যে তাকে স্নান করে খেয়ে নিতে বলে গেল লতু, ঠিক এরকমটা ওর কাছে প্রত্যাশিত নয়। মনে মনে লতু তাকে ঘেন্না করে এবং সবচেয়ে বড় কথা, তাকে পাত্তা দেয় না। আজ দিচ্ছে। এতে কি খুশি হবে ধ্রুব? না কি কোনও প্রতিক্রিয়া ঘটানোর মতো নয় ব্যাপারটা?
