কৃষ্ণ স্কুলে যাবে কী? ওর বাবার এই অবস্থা?
স্কুলে যাবে ক্লাস করতে নয়, ওই ছেলেটাকে ধরতে।
কোন ছেলের কথাটা বলেছে জানো?
না, আমাকে বলেনি।
ঠিক আছে, আমি দেখছি।
আমি তা হলে যাই?
যাবে কেন? মোড়াটায় বোসো। তোমার ধকল গেছে সবচেয়ে বেশি। বেলের পানা করতে বলেছি। একটু মুখে দিয়ে যাও। হাসপাতালে আমাদের কে কে আছে?
ওরে বাবাঃ, সে অনেক লোক।–শচীন হেসে বলল, শহর সুদ্ধ ভেঙে পড়েছিল মাঝরাতে। এখন প্রজারা আছে বেশ কিছু কর্মচারীও আছে।
ওঁকে সবাই কত ভালবাসে।–বলে রঙ্গময়ি উদাস নিস্পন্দ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে কিছুক্ষণ। তারপর বলে, ভাল হয়ে ফিরে এলে আর এখানে এক দণ্ড থাকতে দেব না।
কোথায় যাবেন?
যেখানেই হোক। কলকাতায় পাঠিয়ে দেব। কনকের কাছে গিয়ে থাকবে। কী বলল, ভাল হবে না?
শচীন একটু হেসে প্রগল্ভের মতো বলে ফেলল, আপনি কাছাকাছি না থাকলে ওঁকে দেখবে কে? উনি কি পারবেন আপনাকে ছাড়া?
একথায় রঙ্গময়ির যেমন আপাদমস্তক লজ্জায় শিউরে ওঠা উচিত ছিল তেমন কিছুই হল না। কথাটা যেন লজ্জাজনক বলেই মনে হল না তার কাছে। উদাস চোখে বারান্দার বাইরে দিগন্তের দিকে চেয়ে বলল, দরকার হলে আমিও থাকব। আমার কার জন্য বেঁচে থাকা বলো!
শচীন রঙ্গময়ির এই কথায় চোখ নামিয়ে নিল। আশ্চর্য এই, রঙ্গময়িকে তার খুব নির্লজ্জ বলে মনে হল না। বহুকাল ধরেই কৃষ্ণকান্ত আর রঙ্গময়িকে নিয়ে যে গুজব প্রচলিত আছে তা সবই সে জানে। কিন্তু দুজনের কাউকেই তার কখনও অপবিত্র মনে হয়নি। রঙ্গময়ির এই সত্য ভাষণে তাই সে নির্লজ্জতার কোনও চিহ্ন পেল না।
রঙ্গময়ি ধীর স্বরে বলল, এমন মানুষ তো খুব বেশি পাবে না। কেবল আপন মনে ঘরে বসে ভাবেন, কারও অনিষ্ট চিন্তা করেন না, বিষয় চিন্তা করেন না। যেসব ভাবনা ভাবেন সেগুলোও আধ্যাত্মিক ভাবনা। পৃথিবীতে কী ঘটে যাচ্ছে সে খেয়ালও নেই। এরকম মানুষকে কে মারতে পারে বলল তো! ওদের কি হাত ওঠে?
প্রজাদের কেউ হতে পারে কি মনুদিদি?
রঙ্গময়ি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, না। ওঁর প্রজারা তো কেউ দুঃখে নেই।
তবে কি কৃষ্ণর বন্ধু যা বলেছে তাই সত্যি?
স্বদেশিরা? হতে পারে। শশীকে নিয়ে তো কম গুজব ছড়ায়নি। যে-ই মারুক তার দশবার ফাঁসি হওয়া উচিত। স্বদেশিরা আসল কাজ ফেলে যদি এসব করতে থাকে তবে আন্দোলনের বারোটা বাজতে দেরি হবে না। বোসো, আমি আসছি।
রঙ্গময়ি চলে গেলে বারান্দায় রাখা হেমকান্তব আরামকেদারায় বসে ফুরফুরে হাওয়ায়। ব্রহ্মপুত্রের দিকে চেয়ে থাকে শচীন। পালতোলা নৌকো রুপোলি জল কেটে মন্থর গতিতে চলেছে। ওপরে ছিন্ন মেঘ ভাসছে ভেলার মতো। বহু দূর পর্যন্ত অবারিত মুক্ত পৃথিবী। দেখতে দেখতে শচীনের তন্দ্রা চলে এল। ক্লান্ত মাথাটা একটু কাত হয়ে গেল ডানদিকে।
ভারী কোমল ও নরম একটা দেহগন্ধ, খুব অস্পষ্ট একটু গয়নার টুংটাং আর শাড়ির খসখস তার চটকা ভাঙিয়ে দেয়। চোখ চাইতেই দুটি অপরূপ চোখে আটকে যায় সে।
বিশাখা খুব কেঁদেছে। চোখের কোল ভারী। মুখখানা থমথমে। তবু একটু রক্তাভ উজ্জ্বলতা দেখতে পায় ওর মুখে শচীন। সে উঠে বসে। বিশাখা কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই বলে, উনি ভাল আছেন। কোনও ভয় নেই।
বিশাখা চোখ নত করে বলে, মনুপিসির কাছে শুনলাম।
তোমরা এবার নেয়ে খেয়ে একটু বিশ্রাম নাও। সারা রাত খুব ধকল গেছে তোমাদের।
আপনার তো তারও বেশি।
আমার জন্য ভেবো না। আমি তো প্রায়শ্চিত্ত করছি।
কীসের প্রায়শ্চিত্ত?
তোমার কাছে এবং তোমাদের পরিবারের কাছে আমার অনেক দোষ জমা হয়ে আছে। সাধ্যমতো চেষ্টা করছি সেগুলো স্পালন করতে। প্রায়শ্চিত্ত কথাটার মানে জানো?
না। আমাকে তো কেউ কিছু শেখায়নি।
প্রায়শ্চিত্ত কথাটার মানে পুনরায় চিত্তে গমন।
তার মানে কী?
মানুষ যখন কোনও অন্যায় করে তখন সে তার স্বাভাবিক চিত্তবৃত্তি থেকে পতিত হয়ে যায়। সেই পতিত মনটিকে আবার স্বস্থানে স্থাপন করাই প্রায়শ্চিত্ত।
ওসব শক্ত কথা আমি বুঝি না। তবে আপনার কাছেও আমার অনেক দোষ জমা হয়ে আছে। কাটাকাটি করে নিলেই হয়।
হয়? সত্যি বলছ?
একটু রাঙা হয়ে বিশাখা বলে, সত্যি না তো কী? আপনাকে আর কাশী গয়া বৃন্দাবন করে বেড়াতে হবে না।
শচীন একটু হেসে বলে, ওটা তো বেড়াতে যাওয়া, প্রায়শ্চিত্ত করতে নয়। আমি তো ঠিক করেছিলাম তোমাকে আর মুখ দেখাব না।
আমারও মুখ না দেখানোই বোধহয় উচিত ছিল!
কাশী রওনা হওয়ার আগে তোমাকে একটা চিঠি দিয়েছিলাম। তুমি তার জবাব না দেওয়ায় মনে বড় কষ্ট হয়েছিল।
আর আমি যে সুফলাকে দিয়ে আপনাকে অত বলে কয়ে ডেকে পাঠালাম আপনি তো গ্রাহ্যও করলেন না!
সুফলাকে দিয়ে? কই সে তো বলেনি আমাকে!
বলেনি! কী পাজি মেয়ে! আমি ওকে ডাকিয়ে এনে বলে পাঠালাম, শচীনবাবুকে বলিস একবার যেন দেখা করে যান। আমি খুব আশা করে থাকব।
শচীন মৃদু হেসে বলে, বোধহয় হিংসেতে বলেনি। মেয়েরা একটু ওরকম হয়। তোমার ওপর সুফলার একটু রাগও থাকতে পারে। যাক গে, তোমার জবাব তা হলে গিয়েছিল, একটু অন্যভাবে।
হ্যাঁ। আপনি রাগ রাখবেন না।
না। কিন্তু সেদিন ডেকে পাঠিয়ে কী বলতে বলল তো!
বলতাম, আপনি কাশী যাবেন না, আমি আপনার ওপর রাগ করিনি।
একটুও করোনি?
না। আমাকে কেউ কখনও শাসন করেনি বলেই নাকি আমি একটু কেমনধারা হয়ে গেছি। কৃষ্ণও বলে।
বলে নাকি?
হ্যাঁ। ওই তো বলেছিল, আমার নাকি মাঝে মাঝে একটু শাসন হওয়া দরকার।
