কৃষ্ণকান্ত পিস্তলটা জামার তলায় রেখে ড্রয়ারটা বন্ধ করে। দরজায় তালা দিয়ে চাবি যথাস্থানে রেখে সে চলে আসে বার বাড়িতে নিজের ঘরে। তোশকের তলায় খাপসুদ্ধ পিস্তলটা রেখে সে বেরিয়ে আসে।
শচীন হাসপাতাল থেকে এল আটটা নাগাদ। কৃষ্ণকান্ত তখন দালানের সিঁড়িতে বসে গভীর চিন্তায় মগ্ন। পিস্তল হাতে এলেও টোটা তার হাতে নেই। সে প্রথম ড্রয়ারটা হাঁটকে দেখেছে। সেখানে শুধু বন্দুকের টোটা আছে। পিস্তলটা বহুকাল ব্যবহৃত হয়নি।
শচীন এসে সাইকেল থেকে নামতেই কৃষ্ণকান্ত মগ্নতা ভেঙে টান টান উঠে দাঁড়ায়।
শচীনদা, বাবা?
শচীন একটু হেসে বলে, ভয় নেই। ভাল আছেন।
জ্ঞান ফিরেছে?
হ্যাঁ হ্যাঁ। ইনজুরিটা খুব কম নয়। তবে জ্ঞান আছে। তোমার কথা খুব বলছেন।
আমি যাব।
যাবে। আমিই নিয়ে যাব। তবে এ বেলাটা থাক।
কেন?
এখনও দুর্বল তো। তোমাকে দেখলে যদি উত্তেজিত হন বা উঠে বসার চেষ্টা করেন তবে ব্লিডিং হবে।
কৃষ্ণকান্ত মানমুখে বলে, তবে থাক।
ডাক্তাররা বলছে, ভিজিটারা এখন না এলেই ভাল।
বাবা বাঁচবে তো!
বাঁচবেন না কেন? ইনজুরি ফ্যাটাল নয়। নিশ্চিন্ত থাকে।
আপনার সঙ্গে বাবার দেখা হয়েছে?
একবার। এখন আর দেখা করতে দিচ্ছে না। শুনলাম, ঘুমোচ্ছেন। ভাল আছেন। তোমাকে ওরকম দেখাচ্ছে কেন বলো তো! কেমন যেন রেগে আছ!
কৃষ্ণকান্ত জবাব দিল না। একটু হাসবার চেষ্টা করল মাত্র।
শচীন বলল, যাও, স্নান করে কিছু খাও, অত ভাবতে হবে না।
বাবাকে কারা মেরেছে, শচীনদা? জানেন?
না। পুলিশ খোঁজ করবে।
পুলিশ করবে জানি। আপনার কিছু সন্দেহ হয় না?
শচীন মাথা নেড়ে বলল, এ তো ভাবনা-চিন্তার অতীত। হেমকান্তবাবুর মতো নির্বিরোধী লোক আমি তো অন্তত দেখিনি। ওঁর কেউ শত্রু থাকতে পারে বলে কল্পনাও করা যায় না। আমার মনে হয় কেউ ভুল করে এ কাণ্ড করেছে। হয়তো অন্য কাউকে মারতে চেয়েছিল।
কৃষ্ণকান্ত বলল, তা নয় শচীনদা। আমার ইস্কুলের একটা ছেলে কদিন আগেই বলেছিল, আমার বাবাকে নাকি স্বদেশিরা মারবে।
কেন মারবে? তাঁর অপরাধ?
স্বদেশিদের ধারণা বাবা শশীদাকে ধরিয়ে দিয়েছে।
শচীন একটু হতভম্ব হয়ে যায়। তারপর খুব বিস্ময়ের সঙ্গে বলে, সে কী? একথা তো আগেও হয়েছে। আমি নিজে শশিভূষণের সঙ্গে কথা বলেছি। সেও তো এরকম সন্দেহ করে না। এমনকী উনি দারোগা রামকান্তবাবুব অনুরোধেও নিজেকে বাঁচানোর জন্য কোনও স্টেটমেন্ট দেননি।
কিন্তু লোকে তো বাবাকে ভাল বলে না।
শচীন একটু ভাবে। তারপর বলে, আচ্ছা, দেখা যাক। খুনি যদি ধরা পড়ে তবে তার কাছ থেকেও তো কিছু জানা যাবে। তোমার স্কুলের সেই ছেলেটি কে বললো তো!
কেন? তাকে ধরিয়ে দেবেন।
দেওয়াই তো উচিত।
কৃষ্ণকান্ত মাথা নেড়ে বলল, তার দরকার নেই। আমি আজ স্কুলে গিয়ে নিজেই ব্যবস্থা করব।
মারপিট করবে নাকি?
কৃষ্ণকান্ত একটু হেসে বলে, দরকার হলে করতেও পারি। তবে আপনি কিছু ভাববেন না।
শচীনকে একটু চিন্তিত দেখাল। সে বলল, আজই স্কুলে যাবে?
যেতেই হবে, শচীনদা।
শচীন চিন্তিত মুখে খানিকক্ষণ তার মুখের দিকে চেয়ে থেকে বলে, তোমার বাবার জন্য তোমার রাগ হতেই পারে। কিন্তু রাগের বশে হুট করে কিছু করে ফেললা না কৃষ্ণ। তোমার বয়স অল্প।
কৃষ্ণকান্ত মাথা নেড়ে বলল, আমি তেমন কিছু করব না, শচীনদা। শুধু জেনে নেব, ছেলেটা কোথা থেকে শুনল যে আমার বাবাকে স্বদেশিরা খুন করবে।
তার চেয়ে ছেলেটার নাম আমাকে বলো। আমি গিয়ে তার সঙ্গে কথা বলব।
কৃষ্ণকান্ত লাজুক হেসে বলে, সেটা ভাল দেখাবে না। শত হলেও সে আমার স্কুলের বন্ধু। তার নাম আপনাকে বলে দিলে বিট্রে করা হবে। আমিই ওর কাছ থেকে জেনে নেব।
শচীন খুব ভাল করে কৃষ্ণকান্তর মুখটা দেখল। দেখে তার মনে হল, পাত্রটি খুব সহজ নয়। এইটুকু ছেলে ঠিক এরকম আত্মপ্রত্যয় নিয়ে কথা বলে না। কৃষ্ণর রকম-সকম একটু আলাদা।
শচীন চিন্তিত মুখেই বলল, ঠিক আছে। তবে মুশকিলে পড়লে আমাকে সব বোলো। মনুদিদি কি ভিতর বাড়িতে আছে?
হ্যাঁ। দোতলায়। ছোড়দিও আছে। যান না।
কথাটায় কিছু ছিল না, তবু একটু লাল হল শচীন। কম্পিত বুক ও উদীপ্ত এক আনন্দ নিয়ে সে ওপরে ওঠার সিঁড়ি ভাঙতে লাগল।
বিশাখা ভেঙে পড়েছে অনেক আগেই। সারা রাত কান্নার পর সকালের দিকে অবসন্ন বিশাখা বিছানায় তেড়াবেঁকা হয়ে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে কখন। রঙ্গময়ি ঘুমোয়নি। তার বুকের জ্বালা তাকে ঘুমোতে দেয়নি। স্নান করে সে দোতলায় ভেজা শাড়ি মেলছিল।
শচীন ওপরে এসে ডাক দিল, মনুদিদি!
কী খবর শচীন?
ভাল।–একটু হাসিমুখে শচীন বলে, ঘুমোচ্ছন।
আমাদের দেখা করতে দেবে না?
আজ নয়।
তবে কবে? আমার যে হাতে-পায়ে বল নেই। অত রক্ত গেল।
অত ঘাবড়াবেন না। হেমকান্তবাবু তো দুর্বল লোক নন। একটু রক্ত গেলেও ক্ষতি কিছু হয়নি। সামলে উঠছেন।
ডাক্তাররা কী বলছে?
এমনিতে ভয় নেই। একমাত্র যদি ক্ষত বিষিয়ে ওঠে বা ধনুষ্টঙ্কার হয়। ওরা সব ব্যবস্থাই করছে।
বিষিয়ে ওঠার লক্ষণ কিছু দেখা গেছে নাকি?
আরে না! আপনিও যদি অত উতলা হন তবে কী করে চলবে? আমি আপনাকে আর-একটা কথা বলার জন্য ওপরে এসেছি। কৃষ্ণর দিকে একটু লক্ষ রাখবেন।
কেন বলো তো!
একটু ইতস্তত করে শচীন বলে, ও একটু অন্য ধাতের। স্কুলে কোনও ছেলে নাকি কদিন আগে ওকে বলেছে যে, ওর বাবাকে স্বদেশিরা মারবে। ও আজ স্কুলে যাচ্ছে সেই ছেলের সঙ্গে মোকাবিলা করতে। একটা হাঙ্গামা বাধাতে পারে। আপনি বরং বিশ্বাসী কোনও দারোয়ানকে ওকে না জানিয়ে স্কুলে মোতায়েন রাখবেন। গণ্ডগোল হলে গিয়ে যেন ছাড়ায়।
