যাবে না মানে? আপনি কি সোজা ভি আই পি? এক্ষুনি কাঁপতে কাঁপতে দেবে।
তা হলে বলে দাও। আর এক কাপ লিকারও দিতে বোলো, দুধ চিনি ছাড়া শুধু পাতলা একটা লিকার।
একটু হুইস্কি মিশিয়ে দেবে নাকি?–—জয় ঠাট্টার গলায় বলে।
দরকার নেই।
জয় উঠে গেল। ধ্রুব নিজের ভিতরে অ্যাসপিরিনের ক্রিয়া শুরু হওয়ার জন্য চোখ বুজে খুব ব্যর্থ মনে অপেক্ষা করতে থাকে। তারপর হতাশভাবে মাথা নেড়ে নিজেকেই নিজে বলে, ইট ইজ নট ওয়ার্কিং।
লেবুজল এবং লিকার একই সঙ্গে টেবিলে রেখে গেল বেয়ারা।
জয় বলল, লেবুজলটা আগে খেয়ে নিন।
সভয়ে গ্লাসটার দিকে চেয়ে থেকে ধ্রুব বলে, খেলে কিছু হবে না তো!
বললাম তো, জানি না। শুনেছি।
আরে, শুনেছি তোত আমিও। কখনও টাচ করিনি।
করে দেখুন।
ধ্রুব গ্লাসটা তুলল। অল্প-অল্প করে কয়েকটা চুমুক দিয়ে বলল, খুব খারাপ লাগছে না।
তা হলে খেয়ে নিন।
ধ্রুব খেয়ে নিল। একটা মস্ত ঢেঁকুর তোলার পর একটু স্বস্তি বোধ করতে লাগল। লিকারের কাপ মুখে তুলে বলল, রেমির অপারেশন কটায়?
আটটা। এখনও দেড় ঘণ্টা দেরি আছে।
ততক্ষণ আমি কোথাও একটু শুয়ে থাকতে চাই।
বাড়ি চলে যান না। টেক এ ন্যাপ।
ধ্রুব মাথা নেড়ে বলে, না। কারও গাড়ি-টাড়ি নেই? ব্যাকসিটে একটু পড়ে থাকা যেত।
না। গাড়ি সব চলে গেছে। তবে আবার আসবে।
তবে থাক।
কাল রাতে আপনি কিছুক্ষণ ফুটপাথেও শুয়ে ছিলেন।
মনে আছে।
জয়ন্ত কিছুক্ষণ অপলক চোখে ধ্রুবকে লক্ষ করে বলল, আমার ধারণা আপনার শরীর সুস্থ নেই। একজন ডাক্তার দেখানো উচিত।
ধ্রুব একটা বড় শ্বাস ছেড়ে বলে, সেটা আমি জানি। আমি আগেকার মতো সুস্থ আর নেই। নিজের ওপর আমার শোধ তোলা হয়ে গেছে। এখন অপেক্ষা।
জয়ন্ত অবাক হয়ে বলে, কথাটার মানে কী?
তুমি বুঝবে না।
নিজের ওপর শোধ তুলছেন কেন? কৃতকর্মের জন্য নাকি?
ধ্রুব মাথা নেড়ে হাসিমুখে বলে, না। একটা ভুলের জন্য।
কীরকম ভুল?
টু বি বর্ন ইন এ রং প্লেস অ্যান্ড ইন এ রং টাইম অ্যান্ড ইন এ রং ফ্যামিলি।
জয়ন্ত চুপ করে থাকে।
ধ্রুব বলে, কিছু বুঝলে?
আপনার এ ধারণাটাও তো ভুল হতে পারে!
না। কিন্তু সে কথা থাক। চলো একটু মর্নিং ওয়াক করে আসি।
জয়ন্ত একটা হাত তুলে বলে, আমার আর ওয়াকের দরকার নেই। এমনিতেই যথেষ্ট টায়ার্ড।
তা হলে আমি একটু ঘুরে আসি।
আসুন।
ধ্রুব উঠল, ধীর পায়ে বেরিয়ে এসে শীতের সকালে কবোষ্ণ রোদে হাঁটতে লাগল।
একটা বাঁক ঘুরল সে। মাথাটা দুলছে। মাথাটা হঠাৎ শূন্য লাগছে। ধ্রুব ফেবার চেষ্টা করল। কিন্তু হাঁটুতে জোর পেল না। বুকের মধ্যে একটা অস্থিরতা।
শরীরের একটু অহংকার ছিল ধ্রুবর। কিন্তু সেই চমৎকার দীর্ঘ, একহারা চাবুকের মতো শরীরটাই এখন একটা বোঝার মতো মনে হচ্ছিল।
ধ্রুব হাত বাড়িয়ে বাতাসের হাতল ধরার একটা অক্ষম চেষ্টা করল। তারপর দুমড়ে মুচড়ে উপুড় হয়ে পড়ে গেল কঠিন শানের ফুটপাথে।
০৭৩. কৃষ্ণকান্ত এক জ্বালাভরা চোখে সূর্যোদয় দেখছিল
কৃষ্ণকান্ত এক জ্বালাভরা চোখে সূর্যোদয় দেখছিল। রাঙা আকাশ থেকে রক্তের স্রোত মিশছে ব্রহ্মপুত্রের জলে। ভোরবেলার শান্ত সুন্দর শ্রী আজ সে অনুভব করতে পারছিল না। আজ বুকের জ্বালা, অক্ষম রাগ আর এক গভীর বেদনায় এমন সুন্দর ভোরবেলাটিকে তার ছাইয়ের মতো বিবর্ণ বোধ হচ্ছিল।
অপঘাতে তার কাকা মারা গিয়েছিল। সেই কাকাকে ভাল করে মনেও নেই তার। কিন্তু সে জানে, এই বংশের মুখোজ্জ্বলকারীদের তিনি ছিলেন একজন। ব্রহ্মচারী, দেশভক্ত সেই মানুষটিকে কে বা কারা খুন করেছিল ব্রহ্মপুত্রের ওপর। সেই মৃত্যুর জন্য এক থম-ধরা শোক আছে কৃষ্ণকান্তর। ফের তার নিরীহ বাবার ওপর এই বর্বর আক্রমণ তাকে উত্তেজিত করছে একটা কিছু করে ফেলতে। একটা মারাত্মক কিছু।
কৃষ্ণকান্ত একা একা অনেকক্ষণ ছাদে ঘোরাফেরা করল। কখনও জোরে, কখনও ধীরে। রাত্রি জাগরণের জন্য তার কোনও ক্লান্তি বোধ হচ্ছে না। তার ক্ষুধা-তৃষ্ণার বোধও লুপ্ত। মাঝে মাঝে নিজের তপ্ত মাথাটা চেপে ধরছে দুহাতে। বাবা কি বাঁচবে? বাবা যদি না বাঁচে তবে কৃষ্ণকান্তর মধ্যে। একটা বিপুল কিছু ঘটে যাবে। হয়তো সে পাগল হয়ে যাবে। যদি তা না হয় তবে সে হয়তো হয়ে উঠবে এক সাংঘাতিক খুনি, গুন্ডা বা ডাকাত। একটা লন্ডভন্ড কিছু সে করবেই।
রোদ বেশ চড়া হয়ে ওঠার পর কৃষ্ণকান্ত থমথমে মুখে নেমে আসে নীচে। তালা দেওয়া একটা ঘরের সামনে দুদণ্ড দাঁড়ায়। চাবি কোথায় আছে তা সে জানে। একটু দ্বিধা করে সে গিয়ে হেমকান্তর ঘরে ডেস্কের দেরাজ খুলে চাবির গোছা নিয়ে এসে দরজাটা খুলে ঢোকে।
এ ঘর আজকাল ভোলা হয় না বলে একটা বদ্ধ বাতাসের গন্ধ। কৃষ্ণকান্ত দুটো জানালা খুলে দেয়। চার-পাঁচটা বন্দুকের বাক্স র্যাকের ওপর সাজানো। চেস্ট অফ ড্রয়ার্সটা খুলে ভিতরে উঁকি দেয় সে। প্রথম ড্রয়ারে কিছু তেমন নেই। শুধু চারটে টোটার বাক্স। দ্বিতীয় ড্রয়ারটায় বন্দুকের তেল, লোহার লম্বা শিকে লাগানো বুরুশ, যা দিয়ে ব্যারেল পরিষ্কার করা হয়। তিন নম্বর ড্রয়ারে নেপালি কুকরি, জৌনপুরি ছোরা হ্যান্টিং নাইফ এবং আরও কয়েকরকম শৌখিন বিলিতি ড্যাগার রয়েছে। পরের ড্রয়ারটা খুলে অভীষ্ট বন্দুকটা পেয়ে যায় কৃষ্ণকান্ত। চার-পাঁচ রকমের গুপ্তি, বহু টোটার বাক্স এবং নানাবিধ টুকরো-টাকরা জিনিসের মধ্যে ন্যাকড়ায় জড়ানো চামড়ার খাপে সাবধানে লুকিয়ে রাখা একটা জার্মান মাউজার পিস্তল। জিনিসটা যে আছে এটা সে জানত। কিন্তু কোনও দিন চোখে দেখেনি। হেমকান্ত অস্ত্রশস্ত্র পছন্দ করেন না। এ ঘর তিনি কদাচিৎ খুলেছেন।
