লতুর দিকে তাকিয়ে আজ কৃষ্ণকান্তব একটু কষ্ট হল। মেয়েটা সারা রাত বসে ছিল টেলিফোনের কাছে। কত না জানি কষ্ট পেয়েছে। তিনি খুব নরম স্নেহসিক্ত গলায় বললেন, যাও গিয়ে স্নান সেরে নাও। রাত জাগলে সকালে স্নান করতে হয়। তাতে ক্লান্তিটা চলে যায়।
লতু একটা হাই চেপে বলে, আপনিও সারা রাত জেগে ছিলেন। চোখ তো লাল হয়ে আছে। টায়ার্ড দেখাচ্ছে।
কৃষ্ণকান্ত একটু হেসে বলেন, আমার কথা আলাদা। সারাটা জীবন তো অনিয়মেই কেটেছে মা। আমাকে কি কখনও আরামে থাকতে দেখেছ? কিছু হবে না আমার। ভয় পেয়ো না।
লতু এমনিতে বাবার মুখের ওপর কোনও কথা বলে না। কিন্তু আজ নরম স্বরে বলল, এখন তো বয়েস হচ্ছে! তাই না! আপনার রাত জাগার দরকার ছিল না। আর সবাই তো ছিল।
মেয়ের একটু লঘু শাসনে কৃষ্ণকান্ত কয়েক বছর আগে হলেও চটে যেতেন। আজ চটলেন না। বয়স হচ্ছে, কথাটা তো মিথ্যে নয়। এতকাল নিজের বয়সটাকে একেবারেই পাত্তা দেননি তিনি। বয়স একটা অ্যাবস্ট্রাক্ট জিনিস, একটা সংস্কার মাত্র। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত একটা মানুষের জীবনকে বয়সের পরিপ্রেক্ষিতে যে ভাগটা করা হয় সেটাও উদ্ভট। মানুষকে কিছু কাজ করার জন্যই জন্মগ্রহণ করতে হয় এবং শরীর পাত করেও সেইসব কাজ সম্পূর্ণ করার প্রয়াসই জীবন। এ ছাড়া জীবনের আর কোনও উদ্দেশ্য নেই।
মেয়েকে বললেন, বউমার ওরকম অবস্থা, ঘুম বা বিশ্রাম সম্ভব ছিল না।
অপারেশন কি হয়ে গেছে?
না। আজ সকাল আটটায় হবে।
আপনি কি যাবেন আবার?
না গিয়ে উপায় কী?
তা হলে আপনি স্নান করে আহ্নিক সেরে নিন। আমি ঠাকুরকে তাড়াতাড়ি ভাত রাঁধতে বলে দিই।
কৃষ্ণকান্ত কিছু বললেন না। লতু চলে গেলে নার্সিংহোমে ফোন করে জানলেন, রেমিব অবস্থা আর-একটু ভাল। অপারেশনের তোড়জোড় চলছে। আর তার সদ্যোজাত নাতি ভাল আছে। লালটুকে ফোনে ডাকিয়ে নিম্নস্বরে জিজ্ঞাসা করলেন, দামড়াটাকে দেখেছিস নাকি? ধারে কাছে আছে?
না তো।
একটু দেখ। কাল রাত থেকে বোধহয় কিছু খায়-টায়নি।
দেখছি। কিছু বলতে হবে?
বাড়ি চলে আসতে বলিস। এসে স্নান-খাওয়া সেরে যেন যায়।
বলব। আপনি ভাববেন না।
একটু দেখিস ওকে লালটু।–বলে কৃষ্ণকান্ত টেলিফোন নামিয়ে রাখলেন।
একটা রেস্তোরাঁয় বসে এক কাপ চা খাওয়ার চেষ্টা করছিল ধ্রুব। পারছিল না। মুখটা বিস্বাদে ভরে আছে। মুখোমুখি বসে তার দিকে স্থির ও ঠান্ডা চোখে চেয়ে ছিল জয়ন্ত। খানিকক্ষণ ভগ্নীপতির দুরবস্থা লক্ষ করে বলল, লেবুর জল খাবেন?
লেবুর জল খেলে কী হয়?
জানি না। শুনেছি হ্যাংওভারের পক্ষে ভাল।
দূর। লেবুর জল খেলে বমি হয়ে যাবে।
হোক না। তাতে রিলিফ পাবেন।
না হে, রিলিফ অত সোজা নয়। অ্যাসপিরিন আছে তোমার কাছে?
না আমি তো রাখি না। দরকার হলে এনে দিতে পারি। কিন্তু খালিপেটে কি ওসব খাওয়া ভাল?
আমার পক্ষে সব সমান। এখন উপদেশ দিয়ো না, আই নিড কুইক রিলিফ।
ঠিক আছে, এনে দিচ্ছি। বাইরের ওষুধের দোকানগুলো বোধ হয় এখনও খোলেনি।
নার্সিংহোমে একটি মেডিসিন স্টোর আছে।
জয়ন্ত উঠে গেল। একটু বাদে দুটো ট্যাবলেট এনে টেবিলের ওপর রেখে বলল, ইয়োর পয়জন।
ধ্রুব ট্যাবলেট দুটো গিলে বলল, তুমি সেই মাঝরাত থেকে আমার সঙ্গে আঠার মতো লেগে আছ, আর টিকটিক করে যাচ্ছ। কেন বলো তো!
আপনাকে আর-একটু স্টাডি করছি।
খুব স্মার্ট ভাবছ নাকি নিজেকে? আমাকে স্টাডি করছ মানে?
নার্সিংহোমের সামনে আপনার এই রাত কাটানোটা আমার একটু অদ্ভুত লাগছে। ভেরি আনলাইক ইউ।
এতে অস্বাভাবিক কী আছে?
আমার দিদির জন্য আপনি কোনওদিনই কিছু ফিল করেননি। বরং নানাভাবে তাকে সর্বনাশের দিকে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। হঠাৎ এমন রেসপনসিবল হাজব্যান্ডের মতো বিহেভ করছেন
যে, খুব অবাক লাগল।
ধ্রুব একটু হাসল, তারপর টপ করে মাথাটা দুহাতে চেপে ধরে ও বলে একটা কাতরতার শব্দ করে চোখ বুজে থাকে কিছুক্ষণ। চোখ বোজা অবস্থাতেই বলে, তুমি বোধহয় আমার সম্পর্কে একটু সফট হয়ে পড়েছ, জয়। ইউ আর টেকিং কেয়ার অফ মি।
জয় বলে, সে তো ঠিকই। আপনার প্রতি আমার ব্যক্তিগত কোনও সফটনেস নেই। কাল রাতেই তো বলেছিলাম, দিদির জন্যই আপনাকে চোখে চোখে রাখছি। দিদি বিধবা হোক এটা তো আর চাইতে পারি না।
ধ্রুব খানিকক্ষণ মৃদু-মৃদু হাসল। তারপর বলল, আপাতত তোমার দিদি বিধবা হচ্ছে না। তাকে জ্বালাতে আমি আরও কিছুদিন বাঁচব।
জয় মাথা নেড়ে বলল, আর আপনিও বোধহয় এ যাত্রা বিপত্নীক হতে পারছেন না। অনেক কষ্ট করেছিলেন যদিও। বেটার লাক নেক্সট টাইম।
ধ্রুব এবার হোঃ হোঃ করে হেসে ওঠে। খানিকক্ষণ হেসে আবার একটা কাতর শব্দ করে থেমে যায়। বলে, পেটের মধ্যে একটা কী যেন হচ্ছে জানো? একটা পেন। খুব বিচ্ছিরি টাইপের।
ডাক্তার দেখাচ্ছেন না কেন?
ভয় পাই। দেখালেই হয়তো বলবে ক্যানসার।
আপনি তা হলে ক্যানসারকে ভয় পান?
কে না পায়?
পেলে তো ভালই। অন্তত বোঝা যায় আপনি কিছুটা হিউম্যান।
ধ্রুব এটাকে অপমান হিসেবে নিল না। বরং আবার তার মুখে স্মিত হাসি ফুটে উঠল। খুশিয়াল একরকম গলায় সে বলে, এত স্মার্ট কিন্তু কখনও ছিলে না, জয়।
এখন হয়েছি তা হলে?
বোধ হয়। আজ বেশ ভাল ফর্ম দেখছি তোমার।
সেটা আপনার মনে হচ্ছে আপনি আজ ভাল ফর্মে নেই বলে।
ধ্রুব একথায় হাসল না। কিছুক্ষণ মুখ বিকৃত করে চোখ বুজে রইল। তারপর বলল, তোমার লেবুজল প্রেসক্রিপশনটা একটু ট্রাই করলে হত। এই রেস্টুরেন্টে কি পাওয়া যাবে?
