কৃষ্ণকান্ত ডাক্তারকে উপেক্ষা করে প্রশ্নাতুর চোখে লালটুর দিকে তাকালেন।
লালটু বলল, তাই করুন, কাকা।
কী করব?
বাড়ি যান। একটু বিশ্রাম করুন। একটু বেলায় ফের এলেই হবে।
তোরা কে কে থাকবি এখানে?
আমি আছি। জগাও থাক। আর সবাই চলে যাক এখন।
আর কুট্টি! সেই দামড়া কোথায়?
গাড়িতে বসে আছে।
তার কি লজ্জা হয়েছে?
লালটু মৃদু একটু হাসল। জবাব দিল না।
কৃষ্ণকান্ত ডাক্তারের দিকে চেয়ে বললেন, আমি আমার নাতিটাকে একবার দেখব।
নিশ্চয়ই। আমি আয়াকে বলে দিচ্ছি।
যদি দেখেন যে ঘুমোচ্ছ তা হলে থাক। বাচ্চাদের এ সময়টায় খুব ঘুম দরকার।
ঠিক আছে। দেখছি।
একটু বাদেই একজন পরিচ্ছন্ন আয়া মোটাসোটা ফরসা একটি ঘুমন্ত বাচ্চাকে কোলে করে নিয়ে এল। কৃষ্ণকান্ত নির্নিমেষ চোখে দেখলেন। তারপর জগার দিকে তাকিয়ে চোখের একটা ইংগিত করলেন। জগা দশ টাকার একটা নোট আয়ার হাতে দিল।
কৃষ্ণকান্ত বাইরে এসে চারধারে ভোরের আবছা আলোয় নির্জন রাস্তাঘাটের দিকে অন্যমনস্ক চোখে চেয়ে দেখলেন। বুকের পাষাণভার সবটুকু নেমে যায়নি। তবু একটু আশা ভরসা হচ্ছে, মনের ভিতর একটু জোর পাচ্ছেন। ছেলেবেলায় একসময়ে তিনি কিছুদিন ব্রহ্মচর্য পালন করেছিলেন। তখন ধ্যান করতে খুব ভাল লাগত। একটা মানসিক স্থিরতা আসত ধ্যানে। বুকের জোর বেড়ে যেত। নানা ঘটনার ওলট-পালট স্রোত এসে ভাসিয়ে নিয়ে গিয়েছিল তাকে দূরে। তবু জীবনে একটা স্থির প্রত্যয়ের ভূমি বরাবরই ছিল তার। আজও কি আছে? কে জানে! কিন্তু ওই প্রত্যয়টুকু না থাকলে জীবনের সুখদুঃখগুলিকে অহরহ সহ্য করা যায় না। তিনি জীবনে সহ্য করেছেন বড় কম নয়। স্বদেশি আমলে মার খেয়েছেন, জেল খেটেছেন, স্ত্রী-র অপঘাত মৃত্যু ঘটেছে একরকম চোখের সামনে, বড় ছেলে বংশের নাম ড়ুবিয়ে এক ঘর-খেদানো মেয়েকে বিয়ে করে আলাদা হয়েছে, মেজো ছেলে উচ্ছন্নে গেছে। কিন্তু আজ হঠাৎ মনে হচ্ছে, এই শেষ ধাক্কাটা, রেমিকে নিয়ে এই যমে-মানুষে টানাটানি তিনি বুঝি সইতে পারবেন না।
এদিক ওদিক তাকিয়ে কৃষ্ণকান্ত তার মেজো ছেলেটিকেই খুঁজছিলেন। কুলাঙ্গারটা অবশ্য তার সামনে এসে দাঁড়ানোর মত সাহস পায় না। তবু খুঁজছিলেন। আশ্চর্যের বিষয়, সবচেয়ে অবাধ্য, সবচেয়ে বখা, সবচেয়ে নিন্দিত ও ধিকৃত এই ছেলেটির প্রতি তার এক অপরিমেয় দুর্বলতা রয়েছে, যা ব্যাখ্যার অতীত, যা যুক্তিহীন। এই দুর্বলতা ঠিক পুত্রস্নেহ নয়। অন্য কিছু। কৃষ্ণকান্ত জীবনে কাউকে ভয় পেয়েছেন বলে মনে পড়ে না। এখনও পান না। কিন্তু এই মধ্যম পুত্রটির চোখের দিকে তাকালে তিনি এক বিপুল ভাঙচুরের কাল্পনিক ছবি দেখতে পান। তার মনে হয় এই ধর্মহীন, অবিমৃষ্যকারী কালাপাহাড় দুনিয়াতে সৎ বস্তু বলে কিছু রাখবে না, সমাজ বলে কিছু রাখবে না, সব নীতিবোধ ফুৎকারে উড়িয়ে দেবৈ। একে তিনি বুঝতে পারেন না। তারই শরীর থেকে জাত, তারই আত্মার স্ফুলিঙ্গ থেকে প্রাপ্ত এর প্রাণ, তারই বীজ, তারই জিন, তবু এ যেন এক অপরিচিত দেশের অচিন-ভাষাভাষী, অজানা আদব-কায়দার মানুষ। কিছুই মেলে না। তা বলে ধ্রুব কখনও কৃষ্ণকান্তের মুখে মুখে কথা বলে না, তর্ক বা ঝগড়ার প্রশ্নও ওঠে না, এমনকী চোখে চোখ রাখে না পর্যন্ত। তবু ওর ভিতবে একটা কঠিন উপেক্ষা ও ঘৃণাকে খুব স্পষ্ট টের পান তিনি। এটা শুধু জেনারেশন গ্যাপ নয়, এক ধরনের নীরব বিদ্রোহ। নিজের বাপকে সবচেয়ে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বলে ধরে নেয়েছে ও। জেনারেশন গ্যাপ সহনীয়, কারণ তা স্বাভাবিক এবং প্রকৃতির নিয়মেই ঘটে থাকে। কিন্তু এটা অন্য কিছু। শুধু কৃষ্ণকান্তই ধ্রুবর ঘৃণা ও বিদ্বেষের পাত্র নয়, কৃষ্ণকান্ত যা কিছু পছন্দ করেন, যা কিছুকে মূল্য দেন বা যাকে স্নেহ করেন সবকিছুর প্রতিই ধ্রুবর জাতক্রোধ। এরকম পরিপূর্ণ বিদ্বেষ খুব স্বাভাবিক নয়। বাঘের ঘরে এই ঘোগের বাস তাই কৃষ্ণকান্তর পক্ষে অস্বস্তিকর।
কৃষ্ণকান্ত নিজের গাড়িতে গিয়ে উঠলেন। ড্রাইভার তাড়াতাড়ি কোথা থেকে এসে দরজা খুলে দিল।
কৃষ্ণকান্ত গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করেন, দামড়াটাকে দেখেছিস?
এই তো ছিলেন।
কোথায় ছিল?
গাড়িতেই বসে ছিলেন। একটু আগে নেমে গেলেন।
ধারেকাছে আছে?
ড্রাইভার কয়েক পা হেঁটে চারদিকটা দেখে এসে মাথা নাড়ল, না। ডেকে আনব?
কৃষ্ণকান্ত একটু ভেবে বললেন, থাক গে। বাড়ি চল। একটু বাদেই আবার আসতে হবে।
বাড়ি বেশি দূরে নয়। কয়েক মিনিটেই পৌঁছে গেলেন কৃষ্ণকান্ত। চাকর, দারোয়ান সব তটস্থ, জাগ্রত। তিনি কোনও দিকে ভ্রুক্ষেপ না করে দোতলায় উঠে নিজের চেম্বারে ঢুকলেন। একটা করুণ দৃশ্য চোখে পড়ল। লতু টেলিফোনের কাছে টেবিলে মাথা রেখে ঘুমিয়ে আছে। শোয়নি। বড় কর্তব্যপরায়ণ মেয়ে। কৃষ্ণকান্ত ওকে বলে গিয়েছিলেন যেন টেলিফোনের কাছে থাকে।
মেয়ের মাথায় হাত রেখে কৃষ্ণকান্ত ডাকলেন, ওঠো মা।
লতু এক ডাকে সোজা হয়ে বসে একটু হাসল, এসে গেছেন বাবা? বউদি!
একটু ভাল।
বেঁচে যাবে তো?
মনে তো হয়।
ছেলেমেয়ে কারও দিকেই কোনওকালে নজর দিতে পারেননি কৃষ্ণকান্ত। এরা বড় হয়েছে মায়ের ছায়ায় এবং মায়ের মৃত্যুর পর দাস-দাসীদের তত্ত্বাবধানে। তাই ছেলেমেয়েদের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা কম। এদের শিশুকালেও তিনি খুব একটা কোলেপিঠে নেননি, ছানাঘাঁটা করেননি। সেই দূরত্বটা আজ আর অতিক্রম করা সম্ভব নয়।
