রঙ্গময়ি হেমকান্তের শিয়রের কাছে বসে শূন্য চোখে চেয়ে ছিল সামনের দিকে। বিশাখা রক্ত দেখে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিল। তাকে তার ঘরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। অত্যন্ত অস্থির পায়ে রক্তাভ মুখে বারান্দায় উদ্ভ্রান্তের মতো ঘুরে বেড়াচ্ছিল কৃষ্ণকান্ত। খালি গা, পরনে ফেরত দিয়ে পরা একটা ধুতি। চোখ দুটো লাল টকটকে। তার নিরীহ, নির্বিরোধ বাবার এই অবস্থা কে করল? স্বদেশিরা? হায় ভগবান, সে যে নিজে মনে মনে ঘোর স্বদেশি!
রাতটা উদ্বেগের মধ্যে কাটতে লাগল।
শেষরাত্রের দিকে হেমকান্তকে নিয়ে যাওয়া হল হাসপাতালে।
রঙ্গময়ি আর কৃষ্ণকান্ত দুজনেই সঙ্গে যেতে চেয়েছিল। কিন্তু ডাক্তাররা নিষেধ করায় যাওয়া হয়নি।
হেমকান্তকে হাসপাতালে নেওয়ার পর বিশাখার ঘরে বসে ছিল তিনজনে। কৃষ্ণকান্ত, রঙ্গময়ি আর বিশাখা। উপবাস ও উদ্বেগে তিনজনের চেহারাতেই গভীর ক্লান্তির ছাপ। বিশাখার চোখ-মুখ কেঁদে কেঁদে ফুলে উঠেছে। রঙ্গময়ির চোখদুটিও লাল, তবে সে দাঁতে দাঁত চেপে কান্না রুখেছে। কৃষ্ণকান্তের চোখে এক গভীর শূন্যতার চাউনি।
বিশাখা ফোঁপাতে ফোঁপাতে বলে, কী হবে পিসি? বাবা কি বাঁচবে?
রঙ্গময়ি একটা শ্বাস ছেড়ে বলে, বাঁচবে। সাহেব ডাক্তার দেখছে হাসপাতালে। ভাবিস না তো!
তুমিও তো ভাবছ। আমাকে ভোলাচ্ছ, না?
তোকে ভোলাব কী রে? আমাকে ভোলায় কে? সারাটা জীবন একজনের মুখ চেয়ে বেঁচে আছি না? তোর তো সে বাবা, আমার কী জানিস? আমার কাছে সে-ই ভগবান। তুই বুঝবি না।
বিশাখা রঙ্গময়ির এই অস্পষ্ট স্বীকারোক্তি শুনে এই শোকের সময়েও অবাক হয়ে চেয়ে রইল।
উঠোনে এখনও বিস্তর লোকের জমায়েত। সারা রাত কেউ ঘুমোয়নি। এক-আধজন পাজি লোক রটাতে চেয়েছিল, কাণ্ডটা কোনও মুসলমানের। সেই শুনে একটা উত্তেজনার সঞ্চার হয়েছিল বটে, কিন্তু কিছু প্রবীণ মানুষ গুজবটিকে চাপা দিয়েছেন। এটা যে স্বদেশিদের কাজ সে বিষয়ে এখন মোটামুটি সকলেই নিশ্চিন্ত। লাঠি আর বল্লম নিয়ে যারা আততায়িদের খুঁজতে বেরিয়েছিল তারা ফিরে এসেছে। এখন কী কর্তব্য তাই নিয়ে কথাবার্তা আলোচনা চলছে চাপা গলায়।
শচীন হাসপাতাল থেকে খবর নিয়ে ফিরল। হেমকান্তর অবস্থা খারাপ। তবে এ যাত্রা বেঁচে যেতে পারেন। শুনে উঠোনে জমায়েত লোকজন একটু স্বস্তির শ্বাস ফেলে।
শচীন ধীর পায়ে দোতলায় উঠে আসে। সিঁড়ির মুখেই উদ্বেগাকুল মুখে কৃষ্ণ, বিশাখা আর রঙ্গময়ি।
শচীন একটু হাসল। বলল, ভয় নেই। একটু ভাল আছেন।
বিশাখা বলল, সত্যি কথা বলছেন তো?
সত্যি। জ্ঞান ফিরেছিল।
কিছু বলেছেন তখন?
একটাই কথা বারবার বলছেন। মনু, কৃষ্ণকে দেখো।
রঙ্গময়ি কৃষ্ণকে নিজের কাছে টেনে নিয়ে একটু ধরা গলায় বলে, বড্ড ভাবে ছেলের কথা।
কৃষ্ণ কোনও কথা বলল না। পাথরের মতো রঙ্গময়ির গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে রইল।
শচীন বলল, আপনারা একটু ঘুমিয়ে নিন বরং। আমি আবার হাসপাতালে যাচ্ছি। সব সময়ে খবর নেব। চিন্তা নেই।
রঙ্গময়ি বলে, ঘুম কি আসবে? অমন নিপাট ভাল লোককে যারা মারে তারা কেমন লোক, শচীন?
শচীন একটু হেসে বলে, তারা খারাপ কি ভাল তা জানি না। তবে তাদের সিদ্ধান্ত যে ভুল এ বিষয়ে সন্দেহ নেই। আমার মনে হয়, ওঁর পক্ষে এ জায়গা আর নিরাপদ নয়। একটু সুস্থ হলেই ওঁকে কলকাতা বা অন্য কোথাও পাঠিয়ে দেওয়া উচিত।
একথা শুনে তিনজনেই চুপ করে রইল।
সেই নীরবতায় দুজোড়া চোখ আর দুজোড়া চোখের ওপর নির্নিমেষ হয়ে ছিল। শচীন আর বিশাখা।
০৭২. একটি লোকও নার্সিংহোম ছেড়ে যায়নি
একটি লোকও নার্সিংহোম ছেড়ে যায়নি। ধীরে ধীরে পুবের আকাশ ফরসা হয়ে আসছিল। লাউঞ্জে এক ক্লান্ত নীরবতা। অদৃশ্য এক ঘড়িতে টিক টিক করে সময় বয়ে যাচ্ছে।
একজন ডাক্তার সিঁড়ি দিয়ে ধীর পায়ে নেমে এলেন। প্রায় ত্রিশ জোড়া চোখ একসঙ্গে তার ওপর গিয়ে পড়ল।
ডাক্তারের মুখে হাসি নেই, কিন্তু খুব গম্ভীরও নন। ভিড়টার দিকে তাকিয়ে একটু থমকালেন। তারপর নেমে এসে কৃষ্ণকান্তের দিকে চেয়ে বললেন, স্যার, আপনি এখন বাড়ি যেতে পারেন। ব্লিডিংটা বন্ধ হয়েছে।
কৃষ্ণকান্ত বিরক্ত হয়ে বললেন, আরও স্পষ্ট করে বলুন অবস্থাটা কী।
অবস্থা একটু ভাল। তরে আউট অফ ডেঞ্জার বলা যাবে না।
তা হলে বাড়ি যেতে বলছেন কেন? আমার কথা ভেবে? আমার জন্য ভাবতে হবে না।
ডাক্তারটির বয়স অল্প নয়। মধ্যবয়স্ক এবং বিশিষ্ট চিকিৎসক হিসেবে যথেষ্ট নামডাক আছে। তবু কৃষ্ণকান্তের সামনে তাকে নিতান্তই ছেলেমানুষের মতো লাগছিল। তটস্থ হয়ে বললেন, না স্যার, সে কথা বলিনি। বলছিলাম শি ইজ রেসপনডিং টু আওয়ার ট্রিটমেন্ট, কিছু ব্লাড দেওয়া গেছে। হার্ট তেমন খারাপ নয়। ইফ এভরিথিং গোজ ওয়েল তা হলে সকাল আটটা নাগাদ আমরা অপারেশনটা করে ফেলতে পারব।
আপনার কথায় একটি ইফ থেকে যাচ্ছে। ওই ইফটা ইরেজ করুন তারপর বাড়ি যাব। আমার বউমার যদি ভালমন্দ কিছু হয় ডাক্তার, তা হলে আমার নিজের ভালমন্দে কিছু যায় আসে না। অবস্থা কিছু ইমপ্রুভ করেছে বলছেন?
অনেকটা।
সারভাইভ্যালের চান কী?
ফিফটি-ফিফটি।
এটা কি ইমপ্রুভমেন্ট?
তা বলা যায় স্যার, কারণ ঘণ্টা দুয়েক আগেও শি ওয়াজ জাস্ট সিংকিং। আপনি এখন নিশ্চিন্তে বাড়ি যেতে পারেন। কয়েক ঘণ্টার মধ্যে কোনও বিপদ ঘটবে না। বরং আমরা ইমপ্রুভমেন্টের কিছু পজিটিভ সাইন পাচ্ছি। নতুন করে কনভালশনও দেখা দেয়নি।
