একথা ঠিক, মানুষের মৃত্যু হলেও সে সর্বাংশে মরে না। তার কিছু থেকে যায়। কিন্তু জাগতিক পরিচয়ে নয়। সে এক ভিন্ন অস্তিত্ব, এক ভিন্ন জগৎ।
মৃত্যুর পরবর্তী সেই ভিন্ন জগৎ আর ভিন্ন অস্তিত্বের কথাই বিবশ হয়ে ভাবছিলেন হেমকান্ত। আজকের আবহাওয়া এইসব চিন্তা-ভাবনার তানুকুল। এক মৃদু-কোমল বৃষ্টির অসংখ্য প্রেতহাত চরাচরকে এক রহস্যময় অস্পষ্টতা দিয়েছে। নদীর বিস্তারটি আবহাওয়ায় আধেকলীন। পার্থিবতায় লেগেছে পরলোকের আলো-আঁধারি। ঘোড়ার গাড়ির চলমানতাও যেন পৃথিবী ছেড়ে এগিয়ে যাচ্ছে অলৌকিকতায়।
হেমকান্তর চোখে পলক পড়ছিল না। বৃষ্টির ঘঁটে অল্প অল্প ভিজে যাচ্ছেন। কিন্তু গ্রাহ্য করছেন না।
কালীবাড়ি ছাড়িয়ে গাড়িটা এগোতেই আচমকা লাগামে টান পড়ল। গাড়োয়ান চেঁচিয়ে উঠল, হোশিয়ার!
হেমকান্ত সামান্য টাল খেয়ে সোজা হয়ে বসতে না বসতেই পাদানিতে কে যেন লাফিয়ে উঠল। দরজার হ্যান্ডেল ঘুরিয়ে এক ঝটকায় খুলে ফেলল পাল্লাটা। হেমকান্তর মাথায় তখনও পরলোকের ঘোর। বাস্তবতায় নেমে আসতে পারেননি। একটু বিরক্ত হয়েছেন চিন্তাসূত্রে এরকম বাধা পড়ায়।
একজন লোক পাদানি থেকে ঝুঁকে পড়ল ভিতর দিকে। তার মুখে কালো কাপড় জড়ানো। হাতটা প্রসারিত করে দিল ভিতর দিকে।
ঘটনাটা স্পষ্ট দেখলেন হেমকান্ত। কিন্তু তার মস্তিষ্কে অসংগতিটা তখনও ধরা পড়ছিল না। তবে আগন্তুকের হাতটা যখন বিদ্যুৎবেগে তার বুকের দিকে নেমে এল তখন তিনি ঘোড়ার গাড়ির ভিতরকার অন্ধকারেও ইস্পাতের শানানো ঝিলিক লক্ষ করলেন। একটা অস্ফুট ভয়ার্ত চিৎকার তার কণ্ঠ থেকে আপনিই নির্গত হল। তিনি নন, তার শরীরই বোধহয় আত্মরক্ষার তাগিদে একটা হাত তুলেছিল। শরীরটা যতদূর সম্ভব সরে যেতে চেয়েছিল আঘাত থেকে।
ছোরাটা বিঁধল তাই সঠিক বুকে নয়। একটু ওপর দিকে কাঁধের কাছ বরাবর। যেখানটায় বিঁধল সেখানটা যেন আচমকা অবশ হয়ে ঝিনঝিন করতে লাগল। ছপাৎ করে ছিটকে বেরোল গরম রক্ত।
ঘটনাটা বিশ্বাস করতে পারছিলেন না হেমকান্ত। কী হচ্ছে এসব? কেন হচ্ছে? এরকম কিছু প্রশ্ন তার ঠোঁটে খেলা করল, কিন্তু উচ্চারণ করার মতো অবকাশ হল না। আততায়ি তার ব্যর্থতা বুঝতে পেরে ছোরাটা টেনে নিল এবং আবার একবার হাতটা আঘাতে উদ্যত হল।
হেমকান্ত এবার নিজের সর্বনাশ বুঝতে পারলেন। তিনি ভিতু, নিরীহ, নির্বিরোধী বটে, কিন্তু অচল অথর্ব নন। এখনও তার শরীরে মত্ত হাতির বল। এখনও তিনি যথেষ্ট গতিবেগসম্পন্ন। ডান হাতটা বাড়িয়ে তিনি ছোরাসুদ্ধ হাতটা চেপে ধরলেন। ঠিক এই সময়ে ঘোড়ার গাড়ির মাথা থেকে তার গাড়োয়ান গাজী মিঞা সপাটে চাবুকটা চালাল আততায়ির পিঠে।
হেমকান্ত অবশ্য হাতটা ধরে রাখতে পারলেন না। বরং অত্যন্ত ধারালো সেই দোধার ছোরায়। তার হাতের তেলো চড়াৎ করে ফেড়ে গেল। ফোয়ারার মতো রক্ত ঝরতে লাগল হাত দিয়ে।
কিন্তু আততায়ি আর দ্বিতীয় চেষ্টা করল না। গাড়িতে একটা দুলুনি তুলে বেড়ালের মতো লাফিয়ে পড়ে এক দৌড়ে মিলিয়ে গেল পরকালের আবছায়ায়।
গাজী নেমে এল নীচে, হেমকান্তর অবস্থা দেখে ড়ুকরে উঠল, কর্তা! কী হল কর্তা?
হেমকান্ত অস্ফুট স্বরে বললেন, তাড়াতাড়ি কর! খুব তাড়াতাড়ি। আমাকে মনুর কাছে পৌঁছে দে।
গাজী এক মুহূর্ত দেরি করল না। নিজের আসনে উঠে ঘোড়াদুটোকে প্রায় নিংড়ে যতদূর সম্ভব দ্রুত গতিতে এবড়োখেবড়ো রাস্তায় গাড়ি ছুটিয়ে দিল।
যখন বাড়ির দেউড়িতে গাড়ি পৌঁছোল তখনও হেমকান্ত জ্ঞান হারাননি বটে, কিন্তু অত্যধিক রক্তপাতে অবসন্ন হয়ে পড়েছেন। চোখ আধবোজা, ঠোঁট সাদা, রক্তে ভেসে যাচ্ছেন। বিড়বিড় করে শুধু বলছেন, মনু। কৃষ্ণকে দেখো! আমার কৃষ্ণকে দেখো।
খবরটা ছড়িয়ে পড়তে দেরি হল না। বাড়ি ভিড়ে ভিড়াকার হয়ে গেল দেখতে না দেখতে। তিনজন ডাক্তার হেমকান্তর পরিচর্যা করতে লাগলেন। দারোগা রামকান্ত রায় অন্তত দশ বারোজন কনস্টেবলকে নিয়ে এসে হাজির হলেন।
হেমকান্ত মারা গেছেন এরকম একটা গুজব ছড়িয়ে পড়ায় পাড়া-প্রতিবেশীদের মধ্যে কান্নার রোল পড়ে গেল। প্রজারা বিলাপ করে কাঁদতে লাগল বারবাড়ির উঠোনে জড়ো হয়ে। দাঙ্গাবাজ কিছু লোক লাঠি, বল্লম আর মশাল নিয়ে বিভিন্ন দিকে ধাওয়া করে গেল।
রামকান্ত রায় গাড়োয়ানের জবানবন্দি নিতে নিতে চারদিককার উত্তেজনা ও শোক লক্ষ করে মৃদু একটু হাসলেন। হেমকান্তর ওপর এই আক্রমণে তিনি অখুশি হয়েছেন বলে মনে হল না।
গাজী তার জবানবন্দিতে বলল, কালীবাড়ি ছেড়ে এসে পড়তেই নির্জন রাস্তায় আচমকা একটা লোক লাফিয়ে পড়ে ঘোড়ার বলগা টেনে ধরে। কাজটা খুবই বিপজ্জনক। কারণ জমিদারবাবুর গাড়ির দুটো ঘোড়াই ওয়েলার এবং শক্তিশালী। তবে গাজী লোকটাকে পাগল ভেবে নিজেই লাগাম টেনে গাড়ি থামায়। কিন্তু গাড়ি থামবার আগেই আর-একজন পাদানিতে উঠে দরজা খুলে কর্তাবাবুকে ছোরা মারে। লোকদুটোর মুখে কালো কাপড় বাঁধা ছিল, রাতটাও ছিল অন্ধকার, ফলে তাদের চেনা যায়নি। তবে দুজনেরই বয়স কম। হোকরা বলেই মনে হয়।
জবানবন্দি নিয়ে রামকান্ত রায় তার ঘোড়ায় চেপে রওনা হয়ে গেলেন। কিছু লোক তাঁর দিকে বিষাক্ত চোখে চেয়ে রইল।
প্রচুর রক্তপাতের ফলে হেমকান্ত সংজ্ঞা হারিয়ে ফেলেছিলেন। আঘাত খুবই গুরুতর। তবে মৃত্যু যে নিশ্চিত এমন কথা বলা যায় না। চারজন ডাক্তার রোগীকে ভালভাবে পরীক্ষা করার পর নিজেদের মধ্যে পরামর্শ করতে লাগলেন।
