“আজকাল নিজেকে বড়ই স্বজনহীন মনে হয়।…”
কোকাবাবুর শ্রাদ্ধের নিমন্ত্রণ রক্ষা করে এসে হেমকান্ত সচ্চিদানন্দকে এই চিঠি লিখলেন।
বাড়ির মধ্যেই বাঁধানো পুকুর। চারধারে মস্ত মস্ত পাম গাছ। ৩ার ছায়া জলে এত দীর্ঘ হয়ে পড়ে যে, পুকুরটিকে অতল গভীর বলে মনে হয়। বাস্তবিক পুকুরটি গভীরও। জলে ঘোর গভীরতার একটি কৃষ্ণ রং আভাসিত হয়। বাঁধানো সিঁড়ির ধাপ বহু দূর নেমে সেই কালো জলে কোথায় হারিয়ে গেছে।
পুকুরের ধারেই বাঁধা থাকে দুটি হরিণ। অনেকখানি দড়ির ছাড় দেওয়া থাকে। তারা ইচ্ছেমতো চরে। সিঁড়ি দিয়ে নেমে এসে জল খায়। কখনও গাছের তলায় বিশ্রাম করে।
এ বাড়ির বড় বউয়ের বাবা মস্ত শিকারী। মেয়ের বিয়ের সময় কথা দিয়েছিলেন, একজোড়া হরিণ আর হরিণী কোনও সময় উপহার পাঠাবেন। অবশেষে কিছুকাল আগে এই দুটি চিত্রল হরিণ আর হরিণী এসে পৌঁছেছে।
বিশাখা এই দুটি অবোধ জীবকে বড় ভালবাসে! প্রথমে ওরা ভয় পেত তাকে। আজকাল পায়। বিশাখা তাদের কমলালেবুর খোসা ও রেয়া, লেবু গাতা, ভেজানো আতপচাল, ছোলা খাওয়ায়। হরিণের চেহারা যত সুন্দর, ডাক এত সুন্দর নয়। কিন্তু পৃথিবীতে সব তো একসঙ্গে পাওয়া যায় না। হরিণ দুটিকে দেখেই বিশাখার চোখ জুড়িয়ে যায়। আর-একটা ব্যাপারও হয়। তার গা কেমন করে।
কেমন করে?
রাজেন মোক্তারের মেয়ে সুফলাকে সে একদিন জিজ্ঞেস করল, হরিণ দুটো দেখে তোর কেমন মনে হয় রে?
খুব সুন্দর। কী সরু সরু পা! অথচ কোন দৌড়োয়!
সে তো জানি। কিন্তু আর কিছু মনে হয় না?
সুফলা অবাক হয়ে বলে, আর কী মনে হবে?
তোর গা কেমন করে না?
কেমন করবে?
কেমন যেন শিরশির শিরশির। আমার করে কিন্তু।
না বাবা, আমার সাপ দেখলে গা শিরশির করে। আর কেঁচো।
সে তো আমারও করে। এ তা নয়। অন্যরকম শিরশির।
কীরকম শিরশির?
তোর কেবল প্রশ্ন। তাকিয়ে তাকিয়ে অনেকক্ষণ ধরে দেখ, তোরও করবে।
দোতলার বারান্দা থেকে পুকুরের পাড়ে বাঁধা হরিণদুটোকে অনেকক্ষণ ধরে দেখল সুফলা। তারপর বলল, যাঃ।
কিন্তু বিশাখা অন্যরকম জানে। দিঘল চেহারার ছিমছাম দুটি হরিণ তার ভিতরে এক অনুভূতির কম্পন তোলে। একটা অস্ফুট কিছু যেন তার ভিতর থেকে বেরিয়ে আসতে চায়।
বিশাখা লেখাপড়া করেছে সামান্য। খানিকটা বিনোদচন্দ্রের কাছে, আর খানিকটা রঙ্গময়ির কাছে। ইস্কুলে ভর্তি হয়েছিল, কিন্তু ছাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এখন অপেক্ষা বিয়ের।
এই বাড়ি ছেড়ে পরের বাড়িতে চলে যেতে বিশাখার যে খুব কষ্ট হবে, তা নয়। এ বাড়িতে তার সত্যিকারের আপনজন কেউ নেই।
দুপুরে বিশাখা স্নান করতে এসেছিল ঘাটে। সঙ্গে তেল, গামছা, শাড়ি নিয়ে দাসী। স্নানে কোনও বাধা নেই। উঁচু দেয়াল দিয়ে চারদিক ঘেরা। ঘাটের পাটায় বসে কিশোরী বিশাখা তেল মাখল। গায়ে ঝঝঅলা সর্ষের তেল। মাথায় ফুলেল।
বিশাখার রূপ সাংঘাতিক! রং যেমন দুধে আলতায়, তেমনই তার লম্বা ডৌলের চমৎকার প্রতিমার মতো মুখ। মাথায় চুলের বন্যা। তবে কেঁকড়ানো বলে চুল খুব দীর্ঘ হয়ে পড়েনি। কোমর অবধি মেঘের মতো ঘনিয়ে থাকে। হেমকান্তর সন্তানদের মধ্যে বিশাখারই রূপ সবচেয়ে বেশি।
চুনী দাসী হলেও সখীর মতোই। বিশাখার কাছাকাছি বয়স। তেরো বা চোদ্দো। দুজনে একসঙ্গেই পুতুল খেলে, লুডো খেলে। একটু দূরত্ব থাকে মাত্র। অর্থাৎ বিশাখার সব কথাতেই চুনীকে সায় দিতে হয়। তার মাও এ বাড়ির দাসী। সেই মেয়েকে শিখিয়ে দিয়েছে, মনিবের মেয়ের মুখে মুখে কখনও জবাব দিবি না।
দুজনেরই পরনে ড়ুরে শাড়ি। বিশাখারটা কিছু দামি। চুনীরটা আটপৌরে। চুনী কিছু স্বাস্থ্যবতী। বিশাখা রোগার পর্যায়ে।
বিশাখা কালো জলে পাম গাছের লম্ববান প্রতিবিম্ব দেখছিল। গভীর নীল আকাশ। জল প্রায় নিথর। মাঝে মাঝে একটু হাওয়া এসে কাপিয়ে দেয় ছায়া। কখনও বড় বড় মাছ ঘাই দেয়। সেটুকু ছাড়া জল বড় স্তব্ধ ও গম্ভীর। পুকুরের বিপরীত ঘাটের কাছে কামিনী ঝোপের নীচে বসে আছে একটা হরিণ। আর-একটা চরছে একটু দূরে।
কী সুন্দর!–বিশাখা বিমুগ্ধভাবে বলো।
কী সুন্দর? কীসের কথা বলছ?—চুনী তার শাড়ির পাড়ে বাঁধা খোঁপা খুলতে খুলতে জিজ্ঞেস করল।
বিশাখা বলল, দেখছিস না, জলে কেমন ছায়া! আকাশটা! আর হরিণ!
হ্যাঁ গো, সত্যি ভারী সুন্দর। জল যা ঠান্ডা না! স্নান করলে বুঝবে। আজ আমার খুব কাঁপুনি হবে।
তোর এত কাঁপুনি হয় কেন আজকাল?
চুনী একটা লজ্জার হাসি হেসে বলে, সেই যে সেদিন স্নানের সময় ঢিল পড়েছিল সেই থেকে।
বিশাখা একটু ভ্রু কোঁচকায়। ঢিল পড়েছিল ঠিকই। সে বলল, কে ছুঁড়েছিল জানিস?
না, কী করে জানব? দেয়ালের ওপিঠ থেকে এসেছিল। কী বড় ঢিল!
লক্ষ্মণকে বলেছিলাম। সে খোঁজ করেছিল। কাউকে পায়নি।
দুপুরবেলা যারা ঢেলা ছেড়ে তারা তো আর মানুষ নয়।
তবে কি ভূত?
তা নয় তো কী?
বিশাখার বয়স এমন নয় যে, ভূতে বিশ্বাস করবে না। ভূতে তার অবিচল বিশ্বাস। তবু তার কেন যেন মনে হয় সেদিনকার সেই ঢিলটা কোনও ভূত ঘেঁড়েনি।
বিশাখা কিছু বলল না। তেল মাখা হয়ে গেছে। উদাস চোখে সে সামনের দিকে চেয়ে ছিল। ঠিক উদাসও নয়। তার চোখে মায়ার এক অঞ্জন মাখা। আজকাল সে যা দেখে তাই সুন্দর বলে প্রতিভাত হয়।
হঠাৎ চুনী চাপা গলায় বলে উঠল, ওই দেখ! ওই দেখ ছোড়দি! দেয়ালের ওপর ও কার মুণ্ডু!
০০৬. নার্সিংহোমে রক্তের অভাব নেই
নার্সিংহোমে রক্তের অভাব নেই। টাকা ফেললেই বোতল-বোতল রক্ত পাওয়া যায়। কিন্তু কৃষ্ণকান্তের সেইসব অজ্ঞাতকুলশীল রক্তে আস্থা নেই। সেইজন্য পরিবার এবং আত্মীয়স্বজন সবাইকে খবর দিয়ে রেখেছেন, বউমার অপারেশন, রক্ত দরকার, তোমরা এসো।
