ধ্রুব মৃদুস্বরে বলল, আমি রেমির বিরুদ্ধে কিছু বলছি না।
লালটু চাপা হিসহিসে গলায় বলে, তবে কী বলছিস? তুই কখন কী বলিস তা খেয়াল করে বলিস? তোর সেই কাণ্ডজ্ঞান আছে? রাজার সঙ্গে রেমিকে কে ভিড়িয়েছিল তাও সবাই জানে। ইউ রাসক্যাল, ইউ!
লালটু ব্রেক চাপে। গাড়িটা হোঁচট খেয়ে দাঁড়িয়ে দুলতে থাকে।
ধ্রুবর শরীরটা জোর টাল খেয়েছিল। সামলাতে একটু সময় নিল সে। তারপর বলল, তুমি এত রেগে যাও কেন কথায় কথায়?
লালটু হয়তো মারত। কিন্তু অতি কষ্টে নিজেকে সামলে নিল সে। ধ্রুবর দিকে বাঘা চোখে চেয়ে বলে, দ্যাখ কুট্টি, আমাদের বংশে যদি সত্যিকারের কলঙ্ক কেউ থাকে তবে সেই ব্ল্যাক স্পট হচ্ছিস তুই। কাকার উচিত ছিল বহুদিন আগে তোকে গুলি করে মেরে ফেলা।
ধ্রুব খুব অসহায় গলায় বলে, আমার যে সিয়োর হওয়া দরকার।
কীসের সিয়োর? বাচ্চাটা সম্পর্কে।
লালটু তেমনি বাঘা চোখে চেয়ে থেকে বলে, ঠিক আছে। তোর সন্দেহের কারণটা কী আমাকে বল।
রেমি রাজার সঙ্গে মিশত। সবাই জানে।
তুই রেমির গায়ে কাদা মাখাতে চাস?
না। আমি সত্যি কথাটা জানতে চাই।
ইস! ধর্মপুত্তুর!—বলে লালটু আবার গাড়ি স্টার্ট দেয়। বলে, অন্য কেউ হলে আমি কিছু মনে করতাম না। কিন্তু রেমি সম্পর্কে তোর মুখে ওসব কথা শুনলেও পাপ হয়, বুঝলি রাসক্যাল!
রেমি কি তোমাদের কাছে রমণী-রত্ন?
আলবাত তাই। তোর মতো লুম্পেনের সঙ্গে বিয়ে হয়েছিল বলে আজ ওর এই দশা। মরেও বেচারার শান্তি নেই। শেষ সময়টাতেও তুই চেষ্টা করছিস যাতে ওর ইমেজটা নষ্ট করে দেওয়া যায়। তোর মতো হারামজাদা দুনিয়ায় আর একটাও বোধহয় নেই রে, কুট্টি।
ধ্রুব আপন মনে একটু হাসল।
লালটু সামনের দিকে চেয়ে গাড়ি চালাতে চালাতে স্বাগত ভাষণের মতো বলতে লাগল, আরে মদ আমরাও খাই। তোর চেয়ে বেশিই টানতে পারি। তা বলে নর্দমায় পড়ে থাকি না, বেহেডও হই না। ঘরসংসার করি, চাকরি করি, পরোপকারও করি। সব বজায় রেখে তবে ভদ্রলোকেরা ফুর্তিফাৰ্তা করে। তোর মতো আমাদের বংশে কে আছে বল তো! কাকা পিছনে আছেন বলে খুঁটোর জোরে তোর মতো মেড়া লাফায়। নইলে কবে ফুটে যেতি। বংশের নাম ডোবালি, কাকার নাম ডোবালি, তার ওপর রেমির এই স্যাড এন্ড। সভ্য দেশ হলে তোক মার্ডার চার্জে ফাঁসি দিত।
গাড়িটা ল্যান্সডাউন দিয়ে ঘুরিয়ে তীব্র গতিতে চালায় লালটু। চোখের পলকে ফের নার্সিংহোমের সামনে এনে দাড় করিয়ে দেয়। দরজা খুলতে খুলতে বলে, আমাকে যা বলেছিস বলেছিস। আই শ্যাল ফরগেট। কিন্তু যদি আর কারও কাছে রেমি সম্পর্কে ওসব বলিস আমি জানে খেয়ে নেব।
লালটু ইগনিশন থেকে চাবিটা খুলে নিয়ে পকেটে রাখে।
নার্সিংহোম তেমনই নিশ্চুপ। লবিতে এক নিঃশব্দ ভিড়। সোফায় মাথায় হাত দিয়ে বসে আছেন কৃষ্ণকান্ত।
লালটু ভিড় কেটে এগিয়ে গিয়ে কৃষ্ণকান্তর পাশে জায়গা করে নিয়ে বসে।
কাকা!
কৃষ্ণকান্ত মুখ তুলে তাকান। যেন চিনতে পারছেন না। তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলেন, তোদের খুব কষ্ট হচ্ছে?
না কাকা, কষ্ট কী?
কফির কথা বলে দিয়েছি। একটু দেখ, হল কি না।
আপনি ব্যস্ত হবেন না। কফি তো দিচ্ছেই মাঝে মাঝে।
কৃষ্ণকান্ত আকুল চোখে চারদিকে চেয়ে দেখে বলেন, এখনও নাকি ব্লাড দেওয়া চলছে। কাজ হচ্ছে না তেমন।
হবে। চিন্তা করবেন না। শি উইল সারভাইভ।
কৃষ্ণকান্ত ভাষাহীন চোখে কিছুক্ষণ চেয়ে থাকেন লালটুর দিকে। তারপর মাথাটা আস্তে আস্তে নেড়ে বলেন, আমার অনেক পাপ ছিল। অনেক পাপ। কর্মফল ফলছে।
ওসব বলবেন না, কাকা। এ তো আপনার আমার হাতে নয়।
কৃষ্ণকান্ত বুকভাঙা একটা শ্বাস ছেড়ে বলে ওঠেন, মা! বুড়ো বয়সে এ কষ্টটা পেতে হল।
রেমির জন্য এই একজন মানুষের শোক কত গভীর ও কত ভেজালহীন তা দেখে ভারী আশ্চর্য হয়ে গেল লালটু। কৃষ্ণকান্তকে কেউ কখনও এত দুর্বল হতে দেখেনি। লালটুর মনে আছে উনিশশো তেতাল্লিশে জেলে থাকার সময় কৃষ্ণকান্তর একটি মেয়ে টাইফয়েডে মারা যায়। সে খবর জেলখানায় পৌঁছে দিতে হয়েছিল লালটুকেই। কৃষ্ণকান্ত একটু উদাস চোখে চেয়েছিলেন মাত্র। কয়েক ফোঁটা চোখের জল পড়েছিল। কিন্তু ভেঙে পড়েননি। লোহার মানুষ বলে খ্যাতি হয়েছিল তো এমনি নয়।
রাজনীতিতে বহু জল ঘোলা হয়েছে। বহুবার নানারকম বিপদে, বিপাকে পড়তে হয়েছে। কখনও উত্তেজিত হননি।
এই বয়সেও কৃষ্ণকান্তর মনোবল অসাধারণ। যত বিপদই আসুক তাকে কেউ ভেঙে পড়তে দেখেনি কখনও।
খুড়িমার মৃত্যু লালটুর মনে পড়ে যায়। অসাধারণ রূপসী সেই মহিলা সারাজীবন স্বামীর অবহেলা সহ্য করতে করতে একদিন আর পারেননি। গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন দিয়েছিলেন। একথাও ঠিক, মানসিক দিক দিয়ে ছিলেন ভীষণ দুর্বল। আত্মহত্যার আগে তার পাগলামির লক্ষণ দেখা গিয়েছিল। সেই পাগলামিরই কিছু উত্তরাধিকার সূত্রে বর্তেছে ধ্রুবর ভিতরেও। কিন্তু খুড়িমার মৃত্যুতেও অবিচল ছিলেন কৃষ্ণকান্ত। ছেলের উজ্জ্বলতাতেও তিনি বিচলিত নন। তাই কৃষ্ণকান্তর এই শোকার্ত চেহারা বড় অচেনা লাগে লালটুর।
লালটু কৃষ্ণকান্তর হাতখানা ধরে বলে, কাকা, আপনি বাড়ি যান। একটু রেস্ট নিন। চলুন আমি আপনাকে রেখে আসি।
কৃষ্ণকান্ত লালটুর দিকে চেয়ে বলেন, রেস্ট আমাকে দেবে কে? শরীরটা শুইয়ে রাখলেই কি রেস্ট হয়? রেস্টের সঙ্গে মনের সম্পর্ক নেই?
লালটু কৃষ্ণকান্তর কবজিটা আলতো হাতে চেপে ধরে নাড়িটা অনুভব করছিল। নাড়ির গতি স্বাভাবিক নয়। প্রেশার বেড়েছে সন্দেহ নেই। সে বলল, আপনার কাছে প্রেশারের ওষুধ নেই?
