ধ্রুবকে সন্ধেবেলা একটা বড় চড় মেরেছিল লালটুদা। এখনও কি চড়ের জায়গাটা চিনচিন করছে? নিজের গালে একটু হাত বোলায় ধ্রুব।
গাড়িটা কাদের তা বুঝতে ধ্রুবর একটু সময় লাগল। মদ খাওয়ার পর হঠাৎ কোনও ধাক্কায় নেশা কেটে গেলে বোধশক্তি খুব ভাল কাজ করতে চায় না। পারসেপশন বড় কমে যায়। তবু কিছুক্ষণ গাড়ির গদি এবং ড্যাশবোর্ডের চাকতিগুলো নজর করে ধ্রুবর মনে হল, এটা তাদেরই গাড়ি। ইগনিশনে চাবি ঝুলছে। মৃত্যুহিম এই রাতের নিস্তেজ, ঘুমন্ত ভাবটা তার সহ্য হচ্ছে না। কিছু একটা করা দরকার। রেমি যদি মরে যায় তা হলে বিস্তর জবাবদিহি করতে হবে তাকে। লোকে বলে, রেমি খুব ভাল মেয়ে ছিল। ওকে নাকি মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছে ধ্রুবই। রেমি সত্যিই মরে গেলে কথাটা ফের উঠবে। ধ্রুবর এইসব আত্মীয়স্বজন ঝাপিয়ে পড়বে তার ওপর। শোধ নেওয়ার চেষ্টা করবে। রেমির বাপের বাড়ির লোকেরাও ছেড়ে কথা কইবে না। কিন্তু শালারা বুঝবে না, ধ্রুব নিজেই মরতে চেয়েছিল বরাবর, রেমিকে বাঁচিয়ে।
রেমির মরার এই সময়টায় এখানে সেঁটে বসে থাকতে ইচ্ছে করছে না ধ্রুবর। তার পালানো উচিত। পৃথিবীটা তো একজন রেমির মৃত্যু ঘটছে বলে থেমে নেই। কালও সূর্য উঠবে। উঁ্যা করে কেঁদে উঠবে নবজাতকেরা। লোকে খাবে, ঘুমোবে, রতিক্রিয়া এবং ধান্দাবাজি করে যাবে, যেমন করত বরাবর।
ধ্রুব হামাগুড়ি দিয়ে সামনের সিটে এসে বসল। গাড়িটা স্টার্ট দিয়ে ঘুরিয়ে নিয়ে এল ফটকের সামনে।
লালটু তাকিয়ে ছিল। ধ্রুব গলা বাড়িয়ে বলল, বেড়াতে যাবে? চলো একটু ঘুরে আসি।
লালটু অবাক হয়ে চেযে বলে, বেড়াতে যাবি মানে? এটা কি বেড়ানোর সময়?
আমার আর বসে থাকতে ভাল লাগছে না। একটু ঘুরে আসি।
লালটু এক পা এগিয়ে এসে জানালায় ঝুঁকে তীক্ষ্ণ চোখে ধ্রুবকে দেখে নিয়ে বলে, তোর কী হয়েছে?
খুব অস্থির লাগছে।
গাড়ির ড্রাইভার কোথায়?
জানি না।
তুই এই অবস্থায় গাড়ি চালাবি না। ড্রাইভারকে ডাক, সে ঘুরিয়ে আনবে।
আমি পারব।
লালটুদা নীরবে ধ্রুবকে আর-একবার জরিপ করে। তারপর ঘুরে এসে ড্রাইভারের দরজা খুলে ধ্রুবকে একটু ঠেলে সরিয়ে দিয়ে নিজে স্টিয়ারিং হুইল ধরে বসে।
কোথায় যাবি?
ধ্রুব লালটুকে বাধা দেয় না। সে জানে, লালটুদা একটু মস্তান টাইপের। ধ্রুবর যেসব গুন্ডা বদমাশ বন্ধু আছে তারাও লালটুদাকে সমঝে চলে।
লালটু গাড়ি চালাতে থাকে দক্ষিণের চওড়া গড়িয়াহাট রোড ধরে। চালাতে চালাতে বলে, কাকা একদম ব্রেকডাউন।
ধ্রুব একটা বড় শ্বাস ছেড়ে বলে, জানি।
ইউ আর রেসপনসিবল ফর এভরিথিং।
এটা প্রশ্ন নয়, ঘোষণা। ধ্রুব চুপ করে থাকে।
লালটু বলে, এত ভাল একটা মেয়ে, আমাদের বংশে এরকম একটা বউ আর আসেনি, তাকে রাখতে পারলি না। ডিসগাস্টিং। ওর বদলে তুই মরলি না কেন?
ধ্রুব চুপ করে থাকে। তবে তার কোনও প্রতিক্রিয়া হয় না।
লালটু ধ্রুবর দিকে চকিতে একবার চেয়ে দেখে বলে, এখন টের পাচ্ছিস?
কী টের পাব?
রেমি কেমন মেয়ে ছিল।
ভালই তো!
শুধু ভাল নয়। শি হ্যাড বিন জেম অফ এ গার্ল। তোর মতো বানরের গলায় ও ছিল মুক্তোর মালা। জানিস?
ধ্রুব একথার জবাব দিল না। তবে ক্ষীণ কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল, তুমি পাস্ট টেনসে কথা বলছ কেন লালটুদা? ইজ শি ডেড?
লালটু মাথা নাড়ে, না। কিন্তু মরতে আর বাকি কী? ডাক্তাররা বলছে শি হ্যাজ নো
রেজিস্ট্যান্স। বাঁচার ইচ্ছেটাই তো মরে গেছে মেয়েটার। একটা ভাল মেয়েকে এনে ঘরে বন্দি করে রেখে তিলে তিলে মারলি তোরা। ও আর বেঁচে থেকে কী করবে? তোদের বংশধর দরকার ছিল, দিয়ে গেল।
ধ্রুব একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। না, রেমির জন্য তার শোক হচ্ছে না। অন্তত তেমন তীব্র কোনও শোক নয়। একটু দুঃখ হচ্ছে, একটু ভয়ও। তার বেশি কিছু নয়। সে ক্ষীণ স্বরেই বলে, বাচ্চাটা কেমন আছে জানো?
ভালই বোধহয়। কেন?
এমনি। রেমি যদি মরে যায় তবে ওটাও বোধহয় বেঁচে থাকবে না।
বেঁচেও থাকবে আর তোর মতো জানোয়ারের হাতে আর-একটা জানোয়ারও তৈরি হবে। ওটার জন্য ভাবতে হবে না।
লালটুর এইসব কথাবার্তার সামনে ধ্রুব একেবারেই প্রতিরোধহীন। সে লালটুকে ভয় পায়, এমন নয়। কিন্তু লালটুর এমন একটা সহজ সরল অকপট এবং ধারালো জিব আছে যা অপ্রিয় কথাকে তরোয়ালের মতো ব্যবহার করতে পারে। লোকটা ঘুষ খায়, মাতাল হয়, গুন্ডামি করে, আবার পরের দায়ে দফায় ঝাঁপিয়ে পড়ে, জান কবুল করে লোকের উপকার করে বেড়ায়। ব্যালান্সের অভাব আছে বটে, কিন্তু লালটুর অস্তিত্ব বিশেষ রকমের ঝাঝালো।
গড়িয়াহাটার মোড়ে ডানদিকে গাড়ি ঘুরিয়ে রাসবিহারী অ্যাভেনিউ ধরে গাড়ি চালাতে চালাতে লালটু বলল, এখন কেমন লাগছে?
অস্থির।
বমি করবি?
না।
লালটু বাঁ পকেটে হাত ঢুকিয়ে অ্যান্টাসিড ট্যাবলেটের একটা স্ট্রিপ বের করে ধ্রুবর দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলে, দুটো খেয়ে নে।
ধ্রুব একটা উদগার তোলে। ট্যাবলেট দুটো মুখে ফেলে চিবোতে থাকে। বিস্বাদে ভরে যায় মুখ।
লালটুদা!
কী?
তুমি কি ঠিক জানো যে, বাচ্চাটা আমার?
লালটু আর-একবার টেরিয়ে ধ্রুবর দিকে তাকিয়ে নিয়ে বলে, আমার জানার কথা নয়। কিন্তু তোর কি সন্দেহ আছে?
না, এমনি বলছিলাম।–-ধ্রুব হতাশ গলায় বলে।
লালটু বিষ গলায় বলে, রেমি কীরকম মেয়ে তা আমি জানি। তুই কেমন তাও জানি। নোংরামির লাইনে যাওয়ার চেষ্টা করিস না। একটা চড় খেয়েছিস, এবার গাড়ি থেকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেব।
