কৃষ্ণকান্ত মাথা নেড়ে বলেন, না।
জগা ভিড়ের ভিতর থেকে মাথা তুলে বলল, কর্তার প্রেশারের ওষুধ আমার কাছে আছে। দেব?
লালটু বলে, দে।
কৃষ্ণকান্ত বিনা প্রতিবাদে বড়িটা গিলে চোখ বুজে হেলান দিয়ে থাকেন সোফায়।
দোতলার অপারেশন থিয়েটার থেকে একজন সিনিয়র নার্স নেমে আসে। ভিড়টা তার দিকে নীরব প্রশ্ন তুলে চেয়ে থাকে।
লালটু এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করে, এনি নিউজ?
স্টিল নাথিং।
তার মানে?
ব্লাড চলছে।
অপারেশন?
এখনও শুরু হয়নি।
রুগির অবস্থা কীরকম?
একইরকম। ডাক্তাররা কনসাল্ট করছেন।
লালটু একটু অসন্তোষের গলায় বলে, এখানে কিছু না হলে আমরা পেশেন্টকে বেটার কোনও নার্সিংহোমে রিমুভ করতে পারি। ওঁরা সেকথা বলছেন না কেন? আমাদের ফাইনাল কিছু জানা দরকার।
নার্সটি একটু থতমত খায়। এরা যে ভি আই পি-র আত্মীয় তা সে জানে। বিনীত স্বরে বলে, পেশেন্টের অবস্থা রিমুভ করার মতো নয়।
হেমারেজটা কি চলছে?
চলছে। তবে আমার মনে হয় রেট অফ ব্লিডিং একটু কম।
তার মানে কী? ইজ শি ইমপ্রুভিং?
এখনও কিছু বলা সম্ভব নয়। ডাক্তার বলতে পারেন।
আপনি তো ওটি-তেই ছিলেন?
হ্যাঁ।
আপনি কী দেখলেন বলুন।
নার্সটি খুবই অস্বস্তি বোধ করতে থাকে। অনিশ্চিত গলায় বলে, পেশেন্টের এখনও জ্ঞান নেই।
কোমা কি?
অনেকটা তাই। তবে খুব ডিপ কোমা নয়। মাঝে মাঝে কনশাস হয়ে উঠছেন। তবে কাউকে চিনতে পারছেন না।
কারও নাম করছে?
নার্স একটু চিন্তা করে বলে, বোধহয় ওঁর হাজব্যান্ডের কথা বলছেন। স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে না।
কী বলছে?
ডিলিরিয়ামের মতো। স্পষ্ট কিছু বোঝা যাচ্ছে না।
পেশেন্ট কি তার হাজব্যান্ডকে দেখতে চাইছে?
নার্স মাথা নাড়ল, না। শি ইজ স্পিকিং টু হিম ইন হার ডিলিরিয়াম।
লালটু খুব বিরক্ত গলায় বলে, ডাক্তারদের জানাবেন যে, পেশেন্টের আত্মীয়রা অত্যন্ত উদ্বেগের মধ্যে আছেন। তারা মাঝে মাঝে পজিটিভ কোনও খবর যেন দেন। একদম সায়লেন্ট থাকলে আমাদের উদ্বেগ কীরকম হয় বুঝতেই পারছেন। পেশেন্টের শ্বশুর হাই প্রেশারের রুগি।
নার্স মাথা নেড়ে বলে, ঠিক আছে। আমি বলব।
মেক ইট এ পয়েন্ট। সাইলেন্ট থাকলে এদিকেও এক-আধজন রুগি হয়ে পড়তে পারেন।
নার্সটি চলে গেলে লালটু এসে কৃষ্ণকান্তর পাশে বসে বলল, ব্লিডিংটা কম।
তাই বলল?
হ্যাঁ।
ঠিক শুনেছিস?
ঠিক শুনেছি। আপনি ভাববেন না।
আর কী বলল?
কৃষ্ণকান্ত সবই শুনেছেন, তবু আবার শুনতে চান। লালটু নার্সের কথার সঙ্গে আরও কিছু যোগ করে রেমির অবস্থার উন্নতি সম্পর্কে তাঁকে নিঃসন্দেহ করতে লাগল।
রেমি বাস্তবিকই খুঁজছিল তার একমাত্র পুরুষকে। পুরুষ? না স্বামী?
স্বামী কাকে বলে তা এখন আর রেমি বুঝতে পারছে না। তবে সে জানে, সমস্ত পৃথিবীর সব পুরুষ একদিকে, আর এই পুরুষটি অন্যদিকে। একে সে আর সকলের সঙ্গে মিশিয়ে দেখে না। এ শুধু তার। শুধু তার।
রেমি ডাকছিল, কোথায় তুমি?
বহু দুর থেকে অন্ধকার ভেদ করে ক্ষীণ জবাব এল, কেন রেমি?
কাছে এসো।
পারছি না, রেমি।
কেন?
এখানে এমন ব্যবস্থা যে ইচ্ছে করলেই যাওয়া যায় না। চেষ্টা করছি।
আমি এখানে। এই যে! ওগো!
তুমি অনেক ওপরে, রেমি। আমি যে উঠতে পারছি না।
কেন গো?
পারছি না। কিছুতেই পারছি না।
০৭১. বরিশালের জেলে সতীন্দ্রনাথ সেনের অনশন
বরিশালের জেলে সতীন্দ্রনাথ সেনের অনশন নিয়ে চারদিকে একটা তুমুল উত্তেজনা বয়ে যাচ্ছিল। একশো দিন পার করেও সতীন সেন খাদ্য, পানীয়, ওষুধ কিছুই গ্রহণ করছেন না। গায়ের তাপ ধীরে ধীরে নেমে আসছে। নাড়ির গতি ক্ষীণ হয়ে আসছে। খবরের কাগজে যে বিবরণ থাকে তা সাংঘাতিক। সতীন সেনের নিদারুণ শয্যাক্ষত হয়েছে, পেটে একটা মাংসের দলা পাকিয়ে উঠেছে, অসহ্য যন্ত্রণায় মরণোন্মুখ বিপ্লবী ছটফট করছেন। তবু কিছুতেই অনশন ভাঙছেন না। সতীন সেনের এই অনশনের ঘটনা এবং তার বিরুদ্ধে মামলা নিয়ে এত হইচই হচ্ছিল যে শশিভূষণের ঘটনাটা চাপা পড়ে গেল।
খবরের কাগজ এলেই প্রায় ঝাঁপিয়ে পড়ে কৃষ্ণকান্ত। সতীন সেনের খবরের পর সে সাগ্রহে পড়ে নেয় মীরাট ষড়যন্ত্রের মামলার খবর, সুভাষ বসু বা মহাত্মা গাঁধীর বক্তৃতা। তার ভিতরটা গমগম করতে থাকে এক অদ্ভুত উত্তেজনায়। এক বৃহৎ দেশের অগণিত দুঃখী মানুষের সঙ্গে সে নিজের এক গভীর আত্মীয়তা অনুভব করতে থাকে। একদিন সে গিয়ে জনসভায় আলম সাহেবের বক্তৃতাও শুনে এল।
রঙ্গময়ি সংস্কৃত পড়াতে বসে একদিন বলল, তোর কী হয়েছে বল তো! সব সময় কী যেন ভাবিস।
কিছু হয়নি, পিসি।-বলে কৃষ্ণকান্ত একটু চুপ করে থেকে বলে, সতীন সেন কি মারা যাবেন?
কৃষ্ণকান্ত কেন অন্যমনস্ক তা এই কথা শুনে রঙ্গময়ি বুঝতে পেরে যায়। সতীন সেন কে তা। রঙ্গময়ি ভালই জানে। তবু না জানার ভান করে বলে, সতীন সেন কে রে?
তুমি খবরের কাগজ পড়ো না, পিসি? সেই যে বরিশালের জেলে যিনি অনশন করছেন! কয়েকদিন আগে সুখেন্দু দত্ত নামে কংগ্রেসের এক ভলান্টিয়ারকে চট্টগ্রামে খুন করা হয়েছিল। সুখেন্দুর বয়স ছিল মাত্র ষোলো বছর। কংগ্রেসের ভিতরকার দলাদলি আর গণ্ডগোলে পণ্ড হয়ে যাওয়া একটা মিটিং থেকে যখন সে ফিরছিল তখন তাকে ছুরি মারা হয়। দেশের বড় বড় নেতারা এই খুনের জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছেন। সেই থেকে রঙ্গময়ির মনটা খারাপ। সে বলল, শোন বোকা, স্বদেশি করতে চাইলেই হয় না। ওসব গণ্ডগোলে এখনই যাওয়ার দরকার নেই। বড় খুনোখুনি বাবা।
