বিশাখা প্রথমটায় যেন বিশ্বাস হচ্ছে না এভাবে চেয়ে রইল। তারপর কুষ্ঠিত হাত বাড়িয়ে চিঠিটা নিয়ে বলে, কখন এসেছিল?
এইমাত্র। ঘণ্টাখানেক আগে।
এত সকালে আসে না তো!
চিঠিটা বিশাখা খুলল না। হাতে নিয়ে বসে রইল। চোখটা অল্প বোজা। কিছুক্ষণ যেন স্পর্শের একটা আনন্দ অনুভব করল। তারপর ভাইয়ের দিকে চেয়ে বলল, কাশী যাওয়ার কথা কী বলছিল? সত্যি নাকি?
সত্যি। শচীনদা কাল কাশী যাচ্ছে। তবে ফিরবে।
বিশাখা একটা শ্বাস ছাড়ল। বালিশের তলায় খামটা রেখে দিয়ে বলল, একবার সুফলাকে ডেকে আনতে পারবি?
সুফলাদি! কেন?
দরকার আছে।
একটু ভাবল কৃষ্ণকান্ত। তারপর বলল, বিকেলে।
তা হলেই হবে।
কৃষ্ণকান্ত চলে যাওয়ার পর বিশাখা খুব সাবধানে খামের মুখ ছিড়ল। নীল রঙের বিলিতি মসৃণ কাগজে লেখা:
সুচরিতাসু, তোমাকে কোন মুখে এই চিঠি লিখিতেছি তাহা জানি না। কিন্তু না লিখিয়া শান্তি পাইতেছি না। আমাকে তোমাব নিশ্চয়ই রাক্ষস বলিয়া বোধ হইতেছে। অতি হীন চরিত্রের, অতি কাপুরুষ বলিয়া বোধ হইতেছে। এইরূপ হওয়াই স্বাভাবিক।
সেদিন আমার মাথার মধ্যে কী যে হইয়া গেল! ক্রোধ মানুষের কত বড় রিপু তাহা সেদিন বুঝিলাম। আমার অপরাধের ক্ষমা নাই। তোমার নিকট ক্ষমা চাহিব না। কারণ, আমি নিজেও যে নিজেকে ক্ষমা করিতে পারিতেছি না। তবে তোমাকে একটা কথা বলি। পুরুষমানুষের অভিমানে বড় আঘাত দিয়াছিলে। অন্য কেহ হইলে আমার ওইরূপ উত্তেজনা হইত না। তোমার মুখ হইতে ওইসব কথা শুনিয়া যেন আমার ভিতরে এক বিস্ফোরণ ঘটিয়া গেল।
কেন এইরূপ হইল তাহা লইয়া অনেক ভাবিয়াছি। নিজেকে ইচ্ছামতো শাস্তি দিয়াছি। কিন্তু ভিতরের গ্লানি আজও মরে নাই। যখন তোমাকে ধরিয়া দোতলায় তুলিতেছিলাম তখন তোমার দেহ স্পর্শ করিয়া আমার মনে হইতেছিল, এই পবিত্রা দেবীদেহ স্পর্শ করিবার অধিকার আমার মতো কাপুরুষের নাই। এই কলঙ্কিত হাতে তোমাকে স্পর্শ করাও যে পাপ।
এ সকল আবেগের কথা ভাবিয়া উড়াইয়া দিয়ো না। একদা আমাকে এবং আমার পরিবারকে তুমি ঘৃণা করিতে। তাহা আমি ভুলি নাই। তোমার উপর আমার কিছু আক্রোশ থাকিবারই কথা। কিন্তু সেদিন সব আক্রোশ দূর হইয়া গেল। আক্রোশ আসিল নিজের উপর।
কিছুদিন যাবৎ আমি কেবল তোমার কথাই ভাবিতেছি। ভাবিতেছি, তুমি এখন আমাকে আরও কত ঘৃণা করিতেছ, আরও কত হীন চক্ষুতে দেখিতেছ। এই জন্মে আর তোমার কাছে নিজেকে পুরুষ বলিয়া পরিচয় দেওয়ার কোনও উপায় রহিল না।
কিছুদিনের জন্য আমি তীর্থভ্রমণে বাহির হইতেছি। সঙ্গে আমার মা-বাবাও যাইবেন। ফিরিয়া আসিয়া হেমকান্তবাবুর কাছে আমার সকল অপরাধই স্বীকার করিব। তোমাদের এস্টেটের কাজটিও ছাড়িয়া দিব। আর কোনও কারণেই তোমাকে এই কলঙ্কিত মুখশ্রী দেখাইতে পারিব না।
আমার গ্লানির আরও কারণ আছে। একটি অতি অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে ভাগ্যের দোষে এবং নিজের দুর্বলতাবশে জড়াইয়া পড়িয়াছিলাম। সেই নাগপাশ আজও কাটে নাই। তবে আমি তোমাকে এইটুকু বলিতে পারি দায় সবটুকু আমারই ছিল না। অপরপক্ষেরও ছিল। সাফাই গাইতেছি না। আজ মনে হইতেছে আমার আর বাঁচিয়া থাকা বৃথা। এই জীবন লইয়া কী করিব? যখন মানুষ নিজের উপর শ্রদ্ধা হারায়, যখন আত্মবিশ্বাস চলিয়া যায় তখন আয়ু বড় দুর্বল বলিয়া বোধ হয়।
স্থানান্তরে গমন বা ভ্রমণ আমার এই অস্থিরতার কতক উপশম করিতে পারে বলিয়া বাহির হইতেছি। যদি হয় ভাল, নচেৎ অন্য উপায় চিন্তা করিব।
তোমার নিকট এই পত্র দেওয়ার আর একটি কারণ আছে। আমি তোমার কাছ হইতে একটি জবাব চাই। আমি জানি আমাকে তুমি ক্ষমা করিতে পারিবে না। ক্ষমা প্রার্থনা করিবার অধিকারও আমার নাই। আমি শুধু তোমার অকপট মনোভাবটুকু জানিতে চাই। যদি পত্রে আমাকে যথেচ্ছ ভর্ৎসনা করো তবে বোধহয় কিছু জ্বালা জুড়াইবে। কারণ আমি তোমাকে সেদিন যে চূড়ান্ত অপমান করিয়াছি তাহার প্রতিশোধ লইবার সুযোেগ তুমি পাও নাই।
এই পত্রে তোমাকে সেই সুযোেগ লইতে অনুরোধ করিতেছি।
একদা তুমি আমার নিকট দেবীদুর্লভ ছিলে। পরে পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটায় আমি তোমাকে প্রত্যাখ্যান করি। জীবন কী বিচিত্র ! ঘটনারও কী আকস্মিক পরিবর্তন! আজ আবার তুমি যেন স্পর্শাতীত এক দুর্লভ আসনে সমাসীনা মহামহিম দেবীমূর্তি! আমি আর তোমার নিকটবর্তী হইতে পারিব না।
যে প্রলাপ বকিলাম তাহাতে বিরক্ত হইয়ো না। আজ আমি বড় ভগ্নহৃদয়, বড় হতাশ, বড় যন্ত্রণাবিদ্ধ। তোমার ভর্ৎসনা আমার ভিতরে গ্লানির অবসান ঘটাইবে। আমাকে সঞ্জীবনী মন্ত্র দিবে। ঈশ্বর তোমার মঙ্গল করুন।
ভগ্নহৃদয়
শচীন
চিঠি পড়ে বিশাখা হাউহাউ করে কাঁদতে লাগল।
০৭০. গাড়ির ব্যাকসিটে বসে ধ্রুব
গাড়ির ব্যাকসিটে বসে ধ্রুব নার্সিংহোমের উজ্জ্বল দরজার দিকে চেয়ে ছিল। কিছুই ভাবছে না, মনে পড়ছে না। মাথায় আজকাল এরকম এক-একটা ফাঁকা ভাব, ব্ল্যাংকনেস আসে। মাঝে মাঝে তার মনে হয়, মগজটা শুকিয়ে যাচ্ছে না তো!
লালটুদা বেরিয়ে এসে বাইরে দাঁড়াল। সিগারেট ধরিয়ে চারদিকে তাকাচ্ছে। দেখার অবশ্য কিছু নেই। চারদিকে নিঝুম এবং জনশূন্য। লালটুদাকে বেশ স্বাস্থ্যবান দেখাচ্ছে। বড় বেশি স্বাস্থ্যবান। যখন খেলত তখন পেটানো ছিপছিপে শরীর ছিল। এখন রীতিমতো মুশকো, ভারী গুন্ডামির চেহারা। টাইট একটা ভুড়িও হয়েছে। ভাল কামায়, দেদার টানে। মনটা সাদামাটা এবং মেজাজ উগ্র।
