শচীন একটু থমকে চেয়ে থাকে। তারপর আচমকাই তার মুখটা লাল হয়ে ওঠে। বিশাখাকে চড় মারার চেয়েও ঢের বেশি কেলেঙ্কারি সে ঘটাতে যাচ্ছিল। ফাঁড়াটা কেটেছে এমন নয়। চপলার কথা মনে পড়লেই তার বুক ব্যথিয়ে ওঠে, খাস দ্রুত হয়, আবার একটা তিক্ত হতাশায় খাঁ খাঁ করতে থাকে চারধার। তবে সেইসঙ্গে স্বাভাবিক বুদ্ধি, বিবেচনা ও বোধ ফিরে এসেছে শচীনের। দুই ছেলের মা, পরস্ত্রী একজনকে গ্রহণ করার যেসব অন্ধকারময় দিক আছে সেগুলোও তার মনে আসে।
শচীন মাথা নেড়ে বলে, ঠিকই বলেছ। তুমি খুব ঈশ্বর-বিশ্বাসী, তাই না?
কৃষ্ণকান্ত লজ্জায় মাথা নুইয়ে বলে, আমি ঈশ্বর বিশ্বাসী হতে চাই।
শচীন একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে, আমারও অনেক সাধ ছিল জীবনে। এক-এক বয়সে এক-একরকম। সবশেষে দেখো উকিল হয়ে জীবন কাটাতে হচ্ছে।
ওকালতি তো খুব ভাল। খুব বুদ্ধি লাগে।
তা লাগে। তবে বড় মিথ্যে কথা বলতে হয়।
কৃষ্ণকান্ত একটু হেসে বলে, তা হোক। আমিও কিন্তু আইন পড়ব।
পড়ো। আইন জানা থাকা ভাল।
শশীদার কী হবে শচীনদা? ফাঁসি?
কী করে বলি! অপরাধ তো বেশ গুরুতর। প্রমাণ হলে—
আপনি শশীদার হয়ে মামলা লড়বেন না?
লড়ে লাভ নেই। শশী সম্পর্কে আমি তেমন কিছু জানি না। তোমার বাবার সঙ্গে আমার কথা হয়েছিল অন্য ব্যাপারে। উনি আমাকে ওঁর ডিফেন্সে নামতে বলেছিলেন।
আমাদের বিরুদ্ধেও কি কেস হবে?
কে জানে! পুলিশ মুচলেকা চেয়েছিল, তোমার বাবা দেননি। সেই রাগে কেন্স করতেও পারে পুলিশ। রামকান্ত রায় নোক ভাল নন। স্বদেশিদের ওপর খুব রাগ।
ওকে কেউ মারতে পারে না?
শচীন একটু চমকে ওঠে। তারপর বলে, ওসব কথা মনেও স্থান দিয়ো না।
কিন্তু মারা তো উচিত। বাঙালি হয়ে উনি কেন স্বদেশিদের ধরিয়ে দেবেন?
সব বাঙালি যদি তোমার মতো ভাবতে পারত তা হলে ইংরেজ নিজে থেকেই পালাত। কিন্তু সেকথা থাক। রামকান্ত রায় কিন্তু ভয়ংকর লোক।
কৃষ্ণকান্ত চুপ করে থাকে।
শচীন খানিকক্ষণ বসে থাকে, তারপর উঠতে উঠতে বলে, কাল আমি কিছুদিনের জন্য কাশী যাচ্ছি। ফিরে এলে দেখা হবে। তোমার ছোড়দিকে চিঠিটা মনে করে দিয়ে কিন্তু।
দেব।
ইচ্ছে ছিল বিশাখার সঙ্গে দেখা করে মাপ চেয়ে নেব। কিন্তু ভেবে দেখলাম সেটা না করাই ভাল। রাগী মেয়ে, হয়তো চটে যাবে। তীর্থযাত্রার সময় মনটা খামোকা ভার হবে। তাই ওই চিঠি।
ছোড়দি কিন্তু রাগত না।
রাগত না?—শচীন অবাক হয়ে বলে, তুমি কী করে জানলে?
আমি জানি।
শচীন ক্ষীণ একটু হাসে, কিন্তু রাগের তো কারণ ছিল।
কৃষ্ণকান্ত মাথা নেড়ে বলে, তাও না। ছোড়দিটা বড্ড বোকা। ভীষণ আদুরে তো। একটু শাসনে ওর ভালই হয়।
শচীন খুব হাসল, তুমি তো খুব পাকা মাথার মানুষ! বাঃ! তোমার উন্নতি হোক। আজ আসি, হ্যাঁ?
শচীন চলে গেলে কৃষ্ণকান্ত চিঠিটা নিয়ে ভিতর-বাড়িতে আসে।
দোতলার ঘরে চুপ করে বসে আছে বিশাখা। কিছু শীর্ণ হয়েছে ইদানীং। তবু সেই শীর্ণতায় তার সৌন্দর্য হয়েছে আরও ক্ষুরধার। আজকাল সে ঘর থেকে বড় একটা বেরোয় না। চুপচাপ বসে বসে ভাবে।
ছোড়ছি, কী করছিস?
আচমকা কৃষ্ণকান্তর ডাকে বিশাখা চমকে ওঠে। সে কিছু করছে না। ভিতরে, খুব গভীরে সে একটা গোপন ও গোলাপি স্বপ্ন দেখে। কিন্তু তার মনে হয়, স্বপ্নটা যে-কোনওদিন যে কারও কাছে ধরা পড়ে যাবে।
কী রে! আয়।বলে ভাইকে হাত বাড়িয়ে কাছে টেনে বসায় বিশাখা। আজকাল একটু তফাত হয়ে থাকে বলেই কৃষ্ণর ওপর তার প্রগাঢ় মায়া।
কৃষ্ণকান্ত দুষ্টুমির হাসি হেসে বলে, তোর বা গালে এখনও চড়ের দাগটা ফুটে আছে।
যাঃ।-বলে বিশাখা নিজের গালে হাত বোলায়, ফাজিল!
তোকে চড় মেরে শচীনদার যা অনুশোচনা হয়েছে বলার নয়।
বিশাখা লজ্জায় লালবর্ণ হয়ে বলে, ওসব কথা তোকে কে বলতে বলেছে!
বলবে কেন। জানি।
কী জানিস?
শচীনদা কাশী চলে যাচ্ছে।
কাশী!–বলে ক্ৰ কেঁচকায় বিশাখা, কাশী কেন?
কাশীবাসী হয় না তোক বুড়ো বয়সে!
সে কি বুড়ো হয়েছে?
না, তবে বৈরাগ্য এসেছে।
কবে এল?
সেই চড় মারার পর থেকে। কাশী গিয়ে শচীনদা সন্ন্যাস নেবে।
কৃষ্ণকান্ত এত গম্ভীর মুখে কথাগুলো বলে যে বিশাখা ধন্ধে পড়ে যায়। চারদিকে টালুমালু করে তাকিয়ে বলে, সত্যি কথা বলবি?
সব সত্যিই তো বলছি।
কী হয়েছে ওর?
বললাম তো, অনুশোচনা।
সুফলাটা অনেকদিন আসে না। এলে জিজ্ঞেস করতাম।—চিন্তিত মুখে বিশাখা বলে।
কী জিজ্ঞেস করতি? শচীনদার কথা?
হ্যাঁ।
কেন? শচীনদার খোঁজে তোর কী দরকার?
বিশাখা একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে, আমার জন্য কেউ কষ্ট পাক তা আমি চাই না। শুনেছি, সেই ঘটনার পর ও তিনদিন নাকি উপোস ছিল। জল অবধি খায়নি।
তোকে চড় মেরেছে বলে?
তাই তো শুনেছি। তবে রাগলে মানুষ অনেক কাণ্ড করে। সেগুলো ধরতে নেই।
তোর কিন্তু একটু ওরকম কিছু হওয়ার দরকার ছিল।
কেন রে দুষ্ট? ও আবার কী কথা?
খুব বাড় বেড়েছিল যে তোর।
কবে বাড় দেখেছিস! এমন থাপ্পড় মারব না!
যখন বিয়ের কথা হয়েছিল তখন কী বলতিস মনে নেই?
বিশাখা লাল হয়ে হাসতে লাগল। তারপর বাঁ গালে হাত বোলাতে বোলাতে বলল, বেশ করতাম বলতাম।
আর এখন?
এখন কী?
এখন বিয়ের কথা উঠলে কী বলবি?
তা জেনে তোর কী হবে?
শুনিই না।
ভাগ পাজি কোথাকার!
কৃষ্ণকান্ত ছোড়দির মুখের ভাব খুব মন দিয়ে লক্ষ করল। যা দেখল তাতে খুশিই হল সে। জামার পকেট থেকে চিঠিটা বের করে বলল, এই নে। শচীনদা দিয়ে গেছে।
