রেমি বলল, অবশ্য আপত্তি থাকলে শুনতে চাই না।
ধারা মাথা নেড়ে বলল, আমার লুকোনোর কিছু নেই। আপনাকে ফ্র্যাংকলি বলতে পারি, সারা জীবনে এই একজন পুরুষ সম্পর্কেই আমি দুর্বল। সেন্টিমেন্টাল কোনও ব্যাপার আমার ছিল না। বান্ধবীর চেয়ে আমার ছেলে বন্ধু বেশি। তাই ইমোশন কমে গেছে। তবু ধ্রুব হ্যাজ ডান সামথিং টু মি। কিন্তু মেয়েদের যে আলাদা ইনস্টিংক্ট থাকে তা দিয়ে বুঝতে পারি, হি ইজ ইনভিসিবল।
তার মানে?
ও কোনও মেয়েকেই কানাকড়ি মূল্য দেয় না।
আপনার সঙ্গে ওর ঘনিষ্ঠতা হয়নি?
ধারা আবার হাসল। বলল, হয়েছে, আবার হয়নি। আমার মাঝে মাঝে মনে হয় ওর সবটাই প্লে-অ্যাকটিং। অনেক সুযোগ পাওয়া সত্ত্বেও হি নেভার স্লেপ্ট উইথ মি, নেভার কিসড মি।
রেমির মাথা ঘুরছিল। চোখ কিছুক্ষণ বন্ধ করে রইল সে। টের পেল, চোখের কোলে জল টলটল করছে।
ধারা হাত বাড়িয়ে তার একটা হাত ধরে বলল, আপনি একটু ইমোশনালি আপসেট। আজ বরং আমি যাই!
রেমি কিছু বলতে পারল না। থম মেরে বসে রইল।
বহুক্ষণ বাদে যখন চোখ খুলল তখন ঘরে ধারা নেই।
০৬৯. শচীন কাশী রওনা হওয়ার আগের দিন
শচীন কাশী রওনা হওয়ার আগের দিন চৌধুরী বাড়িতে এসেছিল বিদায় নিতে। শরৎকাল শুরু হয়েছে। ব্রহ্মপুত্রের ওপাড়টা কাশফুলে সাদা। আকাশ গভীর নীল। মাঝে মাঝে সাদা মেঘ এসে ক্ষণস্থায়ী বর্ষা দিয়ে যায়। ভারী মোলায়েম একটা হাওয়া বয়। নদীতে পালতোলা নৌকোর গতিতে লেগেছে এক খুশিয়াল চঞ্চলতা। শচীনের মন প্রকৃতির এই স্নিগ্ধতায় কিছু প্রসন্ন। ভিতরকার ক্ষত ও রক্তপাত সে ভুলে যাচ্ছে ধীরে ধীরে। কামনার বস্তু চোখের সামনে না থাকলে কামনা ধীরে ধীরে কমে যেতে থাকে। ইংরিজি একটা প্রবাদবাক্যও আছে না, আউট অফ সাইট আউট অফ মাইন্ড! চপলাকে যথার্থ ভোলেনি অবশ্য শচীন। কিন্তু কোথায় যেন একটা স্বপ্নভঙ্গও ঘটেছে তার।
ওই যে সেদিন চড় মেরেছিল বিশাখাকে, সেই থেকে তীব্র আত্মগ্লানি দিনরাত তাকে দগ্ধ করেছে। কয়েকটা দিন সে প্রায় পাগলের মতো বিড়বিড় করত। নিজের গলা টিপে ধরত। ডান হাতে আঁতি চেপে ধরেছে, পিন ফুটিয়েছে বহুবার। সে যে এত নীচ হতে পারে তা সে নিজেও জানত না।
আজ বড় সংকোচের সঙ্গে সে বার বাড়িতে সাইকেল থেকে নামল। তারপর সাইকেলটা দাড় করিয়ে রেখে সে বারান্দায় উঠে সোজা গিয়ে কৃষ্ণকান্তর দরজায় ধাক্কা দিল। দরজা ভেজানো ছিল, খুলে গেল।
কৃষ্ণকান্তকে প্রায় রোজই দেখে শচীন। কিন্তু এতদিন এক অবৈধ প্রেমের জ্বলন্ত আবেগ তাকে এমন অন্ধ করে রেখেছিল যে, দেখলেও কিছুই লক্ষ করেনি সে। আজ কৃষ্ণকান্তর চেহারার মধ্যে ঋষিবালকসুলভ উজ্জ্বলতা দেখে সে একটু অবাক হয়।
শচীন একটু হেসে বলল, ব্রহ্মচর্য করছ শুনলাম! সত্যি নাকি?
কৃষ্ণকান্ত স্মিত হেসে উঠে দাড়িয়ে বলল, ঠিক ব্রহ্মচর্য নয়।
তবে কী? স্বদেশি?
কৃষ্ণকান্ত একথার জবাব দিতে পারল না। মৃদু হাসল মাত্র।
শচীন একটু গম্ভীর হয়ে বলে, আমাদের দিয়ে তো কিছু হবে না। আমরা স্বার্থপর সংসারী হয়ে গেছি। তোমাদের মতো ছেলেরা যদি পারে।
কৃষ্ণকান্ত একথা শুনে একটু উজ্জ্বল হয়। তারপর বলে, বিপিনদার সঙ্গে আমার একটু যোগাযোগ করিয়ে দেবেন শচীনদা?
বিপিন এই অঞ্চলের চিহ্নিত স্বদেশি। কংগ্রেসের মস্ত পান্ডা। তবে আজকাল তাকে বড় একটা কেউ দেখতে পায় না। শোনা যায়, গ্রেফতারের ভয়ে সে পালিয়ে বেড়াচ্ছে।
শচীন কথাটা শুনে কৃষ্ণকান্তকে খুব স্থির চোখে অনেকক্ষণ লক্ষ করে বলে, তোমার বয়স এখনও খুব কম। এখনই কেন ওসব করতে চাইছ?
আমার যে ভীষণ ইচ্ছে।
তা আমি খানিকটা জানি। এই বুদ্ধিটা তোমাকে কে দিয়েছিল বলো তো!
তেমন কেউ নয়।
আরে আমি তো আর সরকারের স্পাই নই, আমাকে বলতে ভয়টা কী?
শশীদাকে দেখার পর থেকে–
শচীন হাসল। বলল, বুঝেছি। কিন্তু দেখলে তো পরাধীন দেশে বাস করলে দেশপ্রেমের কীরকম দণ্ড নিতে হয়! জেল, দ্বীপান্তর, ফাঁসি, গুলি।
জানি।
ভয় করে না?
কৃষ্ণকান্ত উজ্জ্বল মুখে বলল, একটুও না।
শচীন চিন্তিত মুখে বলে, তোমার ভিতরে একটা ব্রাইটনেস আছে। স্বদেশি করতে গিয়ে সেটা নষ্ট করবে কেন? বরং আরও তৈরি হও। লেখাপড়া শেখো, জ্ঞানার্জন করে। স্বদেশি করা মানে তো সবসময়ে সাহেব মারা নয়।
আর কীরকম স্বদেশি আছে?
দেশের সুসন্তান হয়ে উঠলে তাতেও দেশের কাজ হয়। যারা প্রতিভাবান তাদের উচিত প্রতিভার সম্পূর্ণ সদ্ব্যবহার করা। তাতে আমাদের আখেরে দেশের ভালই হয়।
বাবাও এরকম কী একটা বলেন।
ঠিকই বলেন। উনি জ্ঞানী মানুষ।
আমার খুব শশীদার মতো হতে ইচ্ছে করে।
কার মতো হবে সেটা কি এখনই স্থির করা উচিত? সেইজন্যই একটু বয়স হওয়া দরকার।
কত বয়স?
সময় হলে আমিই তোমাকে বলে দেব।
খুব বাধ্য ছেলের মতো কৃষ্ণকান্ত ঘাড় নেড়ে বলে, আচ্ছা।
শচীন একটু সংকোচ বোধ করছিল। ইতস্তত করে বলল, বিশাখা কেমন আছে?
ছোড়দি! ছোড়দি তো ভালই আছে।
শচীন খুব লজ্জা-লজ্জা ভাব করে পকেট থেকে একটা মুখ-আঁটা খাম বের করে বলল, বিশাখাকে এই চিঠিটা দিয়ে দেবে?
হ্যাঁ।–বলে হাত বাড়িয়ে চিঠিটা নেয় কৃষ্ণকান্ত।
শচীন মৃদুস্বরে বলে, রাগ জিনিসটা মানুষের মস্ত শত্রু। কত বড় শত্রু তা সেদিন বুঝেছি। কেলেঙ্কারির আর কিছু বাকি রাখিনি। ছিঃ ছিঃ।
কৃষ্ণকান্ত খুব লাজুক একটু হাসল। তারপর বলল, ভগবান যা করেন মঙ্গলের জন্যই করেন।
