আপনার কি অনেক অভিজ্ঞতা?
তা বলতে পারেন। তবে বিয়ের পর আমাকেও আপনার মতো জবুথুবু ঘরবন্দি করে রাখার একটা চেষ্টা হয়েছিল।
আপনার বিয়ে হয়েছে?
ধারা হাসিমুখে বলে, দু’বার। আমি টু-টাইম ডিভোর্সি।
এইটুকু বয়সে?
কী করব বলুন? কোনও বিয়েই এক বছরের বেশি টেকেনি।
কেন টিকল না?
খুব সহজভাবে, যেন অন্য কারও গল্প বলছে, এমন সরল গলায় ধারা বলল, প্রথম যার সঙ্গে বিয়ে হয়েছিল হি পারহ্যাপস হ্যাড ইডিপাস কমপ্লেকস। মা ছাড়া আর কিছু বুঝতেই চাইত না। তার মা কেমন ছিল জানেন? ভেরি বিচি, ভেরি পজেসিভ। একদিন বরের সঙ্গে ড্রিংক করে ফিরেছিলাম বলে আমাকে উনি চড় মেরেছিলেন, কিন্তু নিজের ছেলেকে কিছু বলেননি।
তারপর?
তারপর আর কী? খুব ঝামেলা হতে শুরু করল। অ্যান্ড উই সেপারেটেড।
দ্বিতীয় জনও কি তাই?
না। চাঁদ ওয়াজ এ নাইস গায়। আমি কখনও ওকে ডিসলাইক করতে পারিনি। এখনও করি না।
তা হলে?
কী বলব! সামথিং ডিডনট ক্লিক। ওর সব ভাল, কিন্তু হাজব্যান্ড মাস্ট বি সামথিং ডিফারেন্ট। উই ওয়্যার রাদার ফ্রেন্ডস।
রেমির সামান্য একটু মজা লাগছিল। স্বামী-স্ত্রী সম্পর্কে তার ভিতরে যে একটা বদ্ধমূল ধারণা প্রোথিত রয়েছে তা একটু নাড়া খাচ্ছিল মেয়েটির এসব আলগা কথায়। কিন্তু তবু মেয়েটাকে কিছুতেই সে খুব অপছন্দ করতে পারছিল না। তাই একটু রাগ হচ্ছিল নিজের ওপর। মেয়েটা বড্ড সরল, বড় অকপট।
রেমি বলল, এখন?
এখন! ওঃ, এখন আমি ভেরি মাচ ফ্রি অ্যান্ড ভেরি মাচ হ্যাপি।
বিয়ে করবেন না?
কী দরকার? আপনি খুব ঘর-সংসার পছন্দ করেন?
রেমি চুপ করে কিছুক্ষণ ভাবল। সে ধারার মতো অভিজ্ঞ নয়। ইংলিশ মিডিয়ামে পড়া, কিছু উচ্চকিত পোশাক পরা, কয়েকজন ছেলেবন্ধুর সঙ্গে নিরামিষ মেলামেশা এবং সামান্য কিছু বিদেশি নৃত্যগীত ছাড়া তার আধুনিকতার তেমন কোনও দীক্ষা হয়নি। আধুনিকতা তো কেবল আচরণ নয়, ও একটা বিশেষ মনোভঙ্গি। ধারা জিনস পরেনি, চোখ-মুখের ভাবে বা অঙ্গভঙ্গিতেও ভারী শিষ্ট ভাব, কিন্তু ওর মনটাই অন্য রকম। এ পৃথিবীকে, এই জীবনকে রেমি যে-চোখে দেখে, ও মোটেই সেরকম দেখে না। রেমি অনেকক্ষণ ভেবে বলল, কী জানি। বোধহয় ঘর-সংসার বলে নয়, ভালবাসি একজন বা দু’জন মানুষকে। তাদের ছাড়তে ইচ্ছে করে না।
ইচ্ছে না করলে ছাড়বেন কেন? সেকথা বলছি না। কিন্তু ধরুন, কখনও আপনার নিজের মতো করে থাকতে ইচ্ছে করে না? আর-একটু ফ্রিডম পেতে ইচ্ছে করে না?
করে। খুব করে। —রেমি খুব আকুল গলায় বলে।
ধারা চমৎকার হাসিটা হেসেই যাচ্ছে। বলল, আমাদের দেশের মেয়েদের কী মুশকিল জানেন? তাদের ইচ্ছেটাই মরে যায়। ছেলেবেলা থেকে এমন সব শেখানো হয় যে, মাথাটাই তাদের অবসেসড। ঘর-সংসার পেলেই তাদের আর সব ইচ্ছে মরে যায়। আর না হলে চুরি করে গোপনে কোনও লাভারের সঙ্গে ভয়ে ভয়ে মেলামেশা করে। কিন্তু এটা তো ঠিক নয়। আমার যদি কাউকে ভাল লাগে তবে প্রকাশ্যেই মিশব, নিজেকে তো বাঁধা দিইনি। বলুন ঠিক কি না!
রেমি বলল, ঠিকই তো।
ধ্রুব বলে আপনি ভীষণ সেকেলে।
রেমি এই প্রথম একটু হাসতে পারল। মাথা নেড়ে বলল, আমি ঠিক কেমন তা ও জানেই না।
কেন জানবে না?
জানে না, তার কারণ আমাকে ও লক্ষ করে না।
বাট ইউ আর চার্মিং। সিম্পলি চার্মিং।
হবে হয়তো। কিন্তু ও সেটাও লক্ষ করেনি কখনও। ওর সঙ্গে আপনার পরিচয় কবে থেকে?
বেশিদিন নয়।
কোথায় দেখা?
সেটা একটা অদ্ভুত ঘটনা। আমাদের দেখা খুব নরমাল সারকামস্ট্যানসে হয়নি।
কীরকম?
আমার মতো যারা একা এবং স্বাধীন জীবন যাপন করতে চায় সেইসব মেয়েদের পদে পদে বিপদ। আপনি ঠিক বুঝবেন না। যারা নিরাপদ ঘরে থাকে তাদের পক্ষে এ শহর সম্পর্কে ধারণা করা কঠিন। ধরুন সোনাগাছি, টেরিটিবাজার, চিনাপট্টি, খিদিরপুর ডক বা সন্ধ্যার এসপ্লানেডের গলিখুঁজি এসব মেয়েদের পক্ষে নিরাপদ জায়গা নয়। লোকে ডাকে, ইশারা করে, অফার দেয়, গাড়িতে তুলে নিতে চায়, আড়কাঠি পিছনে ঘুরঘুর করে, ছেলেরা দল বেঁধে পিছু নেয়, টিটকারি দেয়। এসব সহ্য করে এবং এড়িয়ে তবে চলাফেরা করতে হয়।
রেমি একটু শিউরে ওঠে। বলে, মা গো! আপনি ওসব জায়গায় একা যান?
না গেলে আর স্বাধীনতা কীসের? যখন যেমন খুশি ঘুরব ফিরব দেখব তবে না স্বাধীনতা! আমি অ্যাডজাস্টেড হওয়ার চেষ্টা করছি। মাঝে মাঝে অবশ্য বেশ বিপদে পড়ে যেতে হয়। এরকম একটা বিপদে পড়েই ধ্রুবর সঙ্গে আলাপ হয়ে গেল।
বলে হাসে ধারা। নিয়মরক্ষার খাতিরে রেমিও ঠোঁটটা রবারের মতো টেনে একটু হাসবার চেষ্টা করে। বলে, তাই নাকি?
ধারা বলে, যত রোম্যান্টিক শোনাচ্ছে তত রোম্যান্টিক কিন্তু নয় ব্যাপারটা। আপনি কি জানেন যে, ধ্রুবর এক দল অতান্ত ন্যাস্টি ফ্রেন্ডস আছে।
খানিকটা জানি।
ভীষণ ন্যাস্টি। ধ্রুব কী করে যে ওদের সঙ্গে মেশে! এ প্যাক অফ হেলহাউন্ডস। ওদের মধ্যে একজন হচ্ছে লালু। চেনেন?
রেমি মাথা নেড়ে বলে, না। ওর বন্ধুরা বড় একটা এ বাড়িতে আসে না।
ইউ আর লাকি। ওই লালুর একটা জুয়ার ব্যাবসা আছে টালিগঞ্জে। ব্যাবসাটা অবশ্য দু’নম্বরি। আমি আমার এক বয়ফ্রেন্ডের সঙ্গে একদিন জুয়া খেলতে গিয়েছিলাম।
আপনি?–রেমি চোখ কপালে তোলে।
কী আছে তাতে? একটা নতুন অভিজ্ঞতা হল। কিন্তু জয়েন্টটা যে এত খারাপ তা আগে জানতাম । আমার সঙ্গে শ-পাঁচেক টাকা ছিল। ঘণ্টা খানেকের মধ্যে আমি সব টাকা হেরে গেলাম। আমার বয়ফ্রেন্ড রাজু হারল দেড় হাজার টাকার মতো। আমাদের কারও কাছেই আর টাকা ছিল না। রাজু যখন শেষ রাউন্ড খেলছে তখন ওর বিড় করার মতো টাকা পকেটে নেই। এর আগেই ঘড়ি আংটি সব বিড দিয়ে হেরেছে। এমনকী আমার ঘড়িটা অবধি ধার নিয়ে খুইয়েছে। কিন্তু তবু মুখে মুখে বিভ দিয়ে যাচ্ছিল। শেষ বাজিতে ও আরও দেড় হাজার টাকা হারল। কিন্তু পেমেন্টের টাকা নেই। কী অবস্থা ভাবুন। লালু সঙ্গে সঙ্গে ওর কলার চেপে ধরল, টাকা না দিয়ে যেতে পারবে না। রাজুর তখন কঁদো কাদো অবস্থা। আমি জানতাম বেচারা মোটেই বড়লোক নয়। একটা বিদেশি ফার্মের অফিসার। মাইনে ভালই পায়, কিন্তু ঝপ করে দু’-আড়াই হাজার টাকা জুয়ায় হেরে যাওয়ার মতো ভাল অবস্থা তো নয়। রাজু অনেক কাকুতি মিনতি করছিল, কিন্তু লালু আব তার তিনটে রাফিয়ান বন্ধু ওকে চেয়ারে বসিয়ে রেখে দরজা বন্ধ করে দিল। বলল, যেতে দেব না, তবে ফোন করতে দেব। কল সামওয়ান হু উইল পে ফর ইউ।
