চতুর্থ দিন বিশীর্ণ শরীরে কাছারি-ঘরে বিকেলে এসে বসল শচীন। তার উজ্জ্বল কান্তি কিছুটা ম্লান। মুখ অসম্ভব গম্ভীর।
হেমকান্ত সন্ধের পর তাকে ডেকে পাঠালেন।
এই যে শচীন, এদিককার সব খবর ভাল তো!
ভালই। শশীর মামলায় উকিল দিতে পারলেন?
শশীর মামলা তার বাবা লড়বে। কলকাতা থেকে এক ব্যারিস্টারও আসবেন শুনেছি। আমাদের তরফের যা বক্তব্য তা পেশ করার জন্য একজন ভার নিয়েছেন। আমার বেহাইয়ের বন্ধু। সুতরাং চিন্তার কিছু নেই।
আমিও যাব একবার?
যাবে?
যাব বলেই তো ভাবছি।
ইচ্ছে হলে যেয়ো।
আমি একটা কথা ভাবছিলাম।
কী কথা? মামলা-মোকদ্দমা এখন অনেক বেড়েছে। এস্টেটের কাজ দেখার জন্য যদি একজন পাকা লোক দেখে নেন তো ভাল হয়।
তোমার বদলে? —হেমকান্ত কিছু বিস্মিত হয়ে উঠে বসেন।
হ্যাঁ। আমার একটু অবকাশ দরকার।
হেমকান্ত ফাঁপরে পড়ে বলেন, কথাটা কী জানো! লোক পাওয়া খুব সোজা নয়। এমনি যারা পাকা লোক তারা সৎ বড় একটা হয় না। আমার অবস্থা তো জানোই। নিজে কিছু দেখাশোনা করতে পারি না। তোমাকে পেয়ে ভেবেছিলাম আর সমস্যায় পড়তে হবে না।
আমি গোড়া বেঁধে দিয়ে যাচ্ছি। আপনিও একটু চোখ রাখবেন। হয়ে যাবে।
কেন শচীন, তোমার কি পোষাচ্ছে না?
শচীন জিব কেটে বলে, ছিঃ ছিঃ, তা নয়। পয়সার জন্যে আপনার কাজ করছিলাম না। স্নেহ করেন, তাই।
স্নেহ তো এখনও করি।
করেন?–বলে শচীন হঠাৎ হেমকান্তের চোখে চোখ রাখে।
হেমকান্ত মৃদু হেসে বলেন, না করার কারণ কী?
শচীন সঁতে ঠোঁট চেপে বলে, স্নেহ না করার অনেক কারণ আছে। তবু যদি করেন তবে বুঝি যে আপনি সত্যি অনেক উঁচুদরের মানুষ।
হেমকান্ত লজ্জা পেয়ে বলেন, আরে কী যে বলো! ছেলেমানুষ।
শচীন আবেগের সঙ্গে বলল, আমার অপরাধের সীমা নেই। কিন্তু সব তো বলা যাবে না। বুদ্ধিভ্রংশ তো মানুষেরই হয়।
তা হয় বটে। কিন্তু ব্যাপারটা কী বলবে?
আজ্ঞে বলব। তবে তার উপযুক্ত সময় আছে। এখন নয়।
তা হলে আমার এস্টেটের কাজটা করবে তো!
করব। তবে আমি কয়েক দিন ছুটি চাই।
কেন?
মা আর বাবাকে নিয়ে কাশী হরিদ্বার যাব।
বেশ তো, যাও।
বেশিদিন নয়। ততদিন কাজ চালিয়ে নিতে পারবেন?
পারা যাবে। এখন বর্ষা সবে শেষ হয়েছে। টিমে সময়। পারব। যাও।
শচীন হঠাৎ আজ হেমকান্তকে একটা প্রণাম করে বলল, আমার যেতে দু-তিন দিন দেরি আছে। রোজই আসব। আপনি কাছারিতে আমার সঙ্গে একটু যদি বসেন তো সব বুঝিয়ে দিয়ে যেতে পারি।
সে হবেন। তোমার শরীরটা তো ভাল দেখছি না।
ও কিছু নয়।
জ্বরজ্বারি হয়নি তো!
না। বেশ আছি।
হেমকান্ত খুশি হলেন। খুব খুশি। তার বউমা কলকাতা গেছে। শচীন যাচ্ছে হরিদ্বার আর কাশী। বেশ। লক্ষণ তো খুবই ভাল।
০৬৮. মেয়েটির হাসিটি অদ্ভুত সুন্দর
মেয়েটির হাসিটি অদ্ভুত সুন্দর। কোনও কায়দা নেই, একেবারে শিশুর মতো সরল ও সহজ হাসি। নম্র স্বরে বলল, আসব?
আসুন। —রেমি ক্ষীণ কণ্ঠে বলো।
আমি ধারা। ধ্রুব আমাকে বলেছিল, আপনি আমাকে দেখতে চান।
বসুন।
ধারা খুব সহজভাবে বসল। একটুও সংকোচ নেই, অতিরিক্ত স্মার্ট হওয়ার চেষ্টাও নেই। কথাবার্তা টানটান এবং স্পষ্ট। গলার স্বরটির মধ্যে একটা আন্তরিকতা মাখানো নম্রভাব রয়েছে।
রেমি চেয়ে ছিল। কথা আসছিল না মুখে বা মনে। কী বলবে?
ধারা অবস্থাটা অনুমান করে নিল বোধহয়। শাড়ির কুঁচিটা অকারণে একটু ঠিকঠাক করে বলল, আমার আসল নাম কিন্তু ধারা নয়।
তবে কী?
রাধা। বড্ড সেকেলে নাম বলে আমি একটু বর্ণবিপর্যয় করে নিয়েছি।
তাই বুঝি! —রেমি এলানো গলায় বলে।
আপনার নামটা কিন্তু ভীষণ আধুনিক।
রেমি একটু নড়েচড়ে বসল। তারপর একটা গভীর শ্বাস ফেলে বলল, আমি কিন্তু বড্ড সেকেলে। খুব হাসল ধারা। ভদ্রতার হাসিই হবে। তারপর বলল, আপনি আমাকে দেখতে চেয়েছিলেন কেন বলুন তো?
এমনি।
দেখাদেখির ব্যাপারটি কিন্তু খুব অস্বস্তিকর। তাই না? আমার তো মনে হয়েছিল আপনি আমার সঙ্গে ঝগড়া করবেন।
ঝগড়া করব! রেমি ক্রু কুঁচকে বলল, না, ঝগড়া করব কেন? হেরে গেলে ছেলেবেলায় বন্ধুদের সঙ্গে ঝগড়া করতাম। এখন তো বড় হয়েছি।
আপনি সুন্দর কথা বলেন তো! ধ্রুব যা বলেছিল মোটেই তা নয়।
ও কী বলেছিল?
বলেছিল আপনি একটু প্রাচীনপন্থী, আর–
আর কী?
একটু অ্যাগ্রেসিভ।
আপনার কি তাই মনে হচ্ছে?
ধারার মুখে হাসিটি লেগেই ছিল। হাসিতে উজ্জ্বল মুখখানা এক অপরূপ ভঙ্গিতে নেড়ে বলল, এখনও নয়। তবে রেগে যাওয়ার কীই বা আছে বলুন! আমি কিন্তু ধ্রুবকে বলেছিলাম, তোমার বউ আমাকে দেখলে কিছুতেই রাগ করতে পারবে না। ধ্রুব বলেছে, না না, রেমি ভীষণ রাগী। তুমি একটু গার্ড নিয়ো।
বলেছে বুঝি?
হ্যাঁ। বোধহয় টিজ করছিল। তবু আমি একটুও ভয় পাইনি। ধ্রুবকে বললাম, উনি যখন দেখা করতে চান আমি দেখা করব। আই হ্যাভ নাথিং টু লুজ। অপমান করলেও আমার গায়ে লাগবে না।
লাগবে না! কেন?
আমি যে জীবনের শুধু ব্রাইট সাইডটা দেখি। একদম পেসিমিস্ট নই।–বলে ধারা আবার হাসতে থাকে।
রেমি একবারও হাসতে পারেনি। এবারেও পারল না। তবে মেয়েটার মধ্যে এমন একটা প্রাণপ্রাচুর্য ও খুশিয়াল ভাব আছে যে সেটা অজান্তে রেমির ভিতরকার আড়ষ্টতা কাটিয়ে দিচ্ছিল। সে স্বাভাবিক গলায় বলল, আমি ঠিক উলটো। ব্রাইট সাইড আমার চোখেই পড়ে না।
তার কারণটা কী জানেন?
কী?
আপনার নানারকম এক্সপেরিয়েনস হয়নি, তাই। জীবনে যাদের খুব একটা ঘটনা ঘটে না, নানারকম অভিজ্ঞতা হয় না, তারা সবসময় বিষন্ন থাকে আর ডার্ক সাইড নিয়ে ভাবে।
