রঙ্গময়ী সবই জানে। কিন্তু সে উচ্চবাচ্য করে না। শুধু লক্ষ রাখে আর বাড়ির অন্যান্যদের ইশারায় তফাত থাকার নির্দেশ দেয়। বিশাখা তিনটে দিন চলল পুতুলের মতো রঙ্গময়ীর নির্দেশে। খেতে বললে খেল, স্নান করতে বললে করল। যেনবা ঠিক বুঝতে পারছে না সে আসলে কী করছে। কথা প্রায় ছিলই না তার মুখে।
তিন দিনের দিন ভোরবেলা উঠে রঙ্গময়ী লক্ষ করল, বিশাখাব মুখ-চোখ একটু স্বাভাবিক। রাতে ঘুম হয়েছে। চোখের কোল ভরাট।
রঙ্গময়ী একটা স্বস্তির শ্বাস ফেলল।
দুপুরবেলা খেতে বসে একটু ঠাট্টা-তামাসাও করল বিশাখা রঙ্গময়ীর সঙ্গে। তারপর দুজনে ঘরে এসে মুখোমুখি বসল।
বিশাখা হঠাৎ বলল, কী গো মনুপিসি, কী ভাবছ?
কই, কিছু তো ভাবছি না।
ভাবছ না কেন? একটু ভাবো।
কী ভাবব?
আমার কী করা উচিত একটু ভেবে বলো তো! গলায় দড়ি দিয়ে ঝুলে পড়ব, না কি বিষ খাব?
বালাই ষাট। তুই ওসব করতে যাবি কেন?
অপমানটা তো দেখলে।
নিজের চোখে দেখিনি, তবে শুনেছি।
এর পরেও বেঁচে থাকতে বলো!
বেঁচে থাকবি না কেন? পাগল নাকি?
পাঁচজনকে মুখ দেখাব কী করে?
সে যদি দেখায় তোর দেখাতে দোষ কী?
সে তো ছেলে। ছেলেদের তো সবই মানায়, মনুপিসি।
তোকে বলেছে! পুরুষমানুষ হয়ে একটা মেয়ের গায়ে হাত তুলেছে লোকে তাকে দুয়ো দেবে? তার নিজেরও কি কম লজ্জা!
ওর কি লজ্জা বলে কিছু আছে!
রঙ্গময়ী কথাটার জবাব চটজলদি দেয় না। একটু চুপ করে থেকে বলে, শুনেছি, তিন দিন জলস্পর্শ করেনি।
বিশাখা কথাটা শুনে চুপ করে থাকে। বুকের মধ্যে কেমন এক অচেনা ব্যথা চিনচিন করতে থাকে। কেমন অদ্ভুত লাগে একটা সিরসিরে ভাব।
অনেকক্ষণ বাদে সে বলে, জলস্পর্শ করেনি কেন?
তা কী করে বলব? তবে মনে হয় প্রায়শ্চিত্ত করছে।
আর প্রায়শ্চিত্ত করে কী হবে? যা হওয়ার তা তো হয়েই গেছে। শহরে ঢি ঢি পড়ে যায়নি এতক্ষণে?
রঙ্গময়ী মাথা নেড়ে বলে, দূর বোকা! দাস-দাসীরা কানাকানি করবে সে তত ঠেকানোর উপায় নেই। তবে লোক জানাজানি হয়নি। হবেও না। শহরে এখন অন্য সব সাংঘাতিক কাণ্ড হচ্ছে। কে কাকে চড় মারল তা নিয়ে কে মাথা ঘামাবে?
কী কাণ্ড, মনুপিসি?
রেললাইনের ধারে গুদাম থেকে বিদেশি কাপড় বের করে আগুন লাগানো হল সেদিন। গুলিগোলা চলেছে। ধরপাকড় হল কত। আহা!
কিন্তু স্বদেশি আন্দোলনের ঘটনা মোটেই স্পর্শ করল না বিশাখাকে। সে আনমনা হয়ে রইল। একটা হাই আসছিল, সেটা চেপে বন্ধ করে বলল, আমার বড় ঘেন্না হচ্ছে নিজের ওপর।
কেন হবে? দোষ তো শচীনের। তুই তো অন্যায় কিছু বলিসনি।
ঠিক বলেছি বলছ?
নিশ্চয়ই। এই সত্যি কথাগুলো কারও মুখ থেকে বেরুনো দরকার ছিল।
বিশাখা একথা শুনে একটু উজ্জ্বল হল। বলল, ঠিক বলছ?
ঠিক বলছি না তো কী? আমি পরস্য পর, নইলে ক্যাট ক্যাট করে কিছু কথা ওর মুখের ওপর বলতে আমারও ইচ্ছে করেছে কতবার।
বিশাখা বলে, আমি ভাবছিলাম কাজটা হয়তো ভীষণ অন্যায় হয়ে গেল। বাবা হয়তো ফিরে এসে সব শুনে আমার ওপর রাগ করবে।
রাগ করলেই হল? সে নিজে তো কিছু পারেনি করতে। মুখচোরা মানুষ, চোখের ওপর এসব ঘটনা দেখেও চোখ বুজে থেকেছে। দোষ তো তারই।
বিশাখা চুপ করে থেকে কিছুক্ষণ ভেবে বলল, শচীনবাবু বোধহয় আর আমাদের কাজ করবেন , না?
না করলেই মঙ্গল। এইভাবেই যদি ভালয়-ভালয় ব্যাপারটা মিটে যায় তবে খুব ভাল।
বিপাশা মাথা নেড়ে বলল, না মনুপিসি, তাতে ভাল হয় না।
কেন হয় না?
আমার একটা কলঙ্ক থেকে যায়। লোকে বলবে, আমি ঝগড়া করে শচীনকে তাড়িয়েছি।
লোকের আর খেয়ে বসে কাজ নেই। তুই রাখ তো।
বিশাখা মাথা নেড়ে বলে, না মনুপিসি, আমার লজ্জা করছে।
ওমা! লজ্জা কীসের?
ঝগড়া করেছি যে! সেই লজ্জা। আমি চাই না উনি এভাবে কাজ ছাড়ুন।
রঙ্গময়ী একটু চুপ করে থেকে বলে, কথাটা খুব মন্দ বলিসনি। শচীনের ইদানীংকার ব্যবহার দেখে রাগ হয় বটে, কিন্তু ছেলেটা খারাপ ছিল না। তোর বাবার জমিদারি যেতেই তো বসেছিল। ছেলেটা প্রাণপাত করে কিছু সামাল দিয়েছে। ওকে তাড়ানোটা ঠিক নয়। কিন্তু কী আর করবি?
শচীনবাবু কি এখনও আমার ওপর রেগে আছেন?
রঙ্গময়ী হেসে ফেলে। তারপর বলে, রেগে আছে বলে তো মনে হয় না। চড় মেরে সে-ই তো কোলে করে তোকে দোতলায় তুলে নিয়ে এসেছিল। রাগের লক্ষণ তো নয়।
ধ্যাৎ! কী যে বলো না! যাও—
রঙ্গময়ী হেসে বলে, কথাটা তো সত্যি। তুই যত নিজের ঘাড়ে অপমান নিচ্ছিস সে নিয়েছে তার দশগুণ। তাই তো বলছিলাম, তুই গলায় দড়ি দিবি কেন?
সারাটা দুপুর বিশাখার কাটল ফের অন্যরকম এক ঘোরের মধ্যে। চড় খাওয়ার অপমান বুক থেকে নেমে গেছে। এখন সে ভাবছে শচীন তাকে কোলে করে দোতলায় তুলেছিল। শচীন তিন দিন জলস্পর্শ করেনি। যত ভাবছে তত বুকের চিনচিন ব্যথাটা নাড়া খাচ্ছে। অস্ফুট এক ব্যথা। বড় অদ্ভুত। বড় সুখদায়ক।
চারদিনের দিন হেমকান্ত বরিশাল থেকে একা ফিরলেন।
একা যে বাবা? বউদি কোথায়? বিশাখা বাবাকে প্রায় হাত ধরে গাড়ি থেকে নামাতে নামাতে প্রশ্ন করে।
বউমা কলকাতা চলে গেল।
সে কী! ওখান থেকেই?
হ্যাঁ। কিছুতেই ফিরতে চাইল না।
কেন বলো তো!
বলছিল ছেলেমেয়েদের ইস্কুল খুলে গেছে। কনকেরও অসুবিধে হচ্ছে।
বিশাখা সহর্ষ বিস্ময়ে চেয়ে রইল বাবার মুখের দিকে। বুকটা দুরদুর করছে। বউদি যে অতিশয় বুদ্ধিমতী সে বিষয়ে তার সন্দেহ ছিল না। কিন্তু সেই বুদ্ধি যে প্রলয় ঘটায়নি, সংসারে আনেনি ভাঙচুর এবং কলঙ্ক তাইতে ভারী হালকা বোধ করল বিশাখা। তার মনে হল, এবার সব ঠিক হয়ে যাবে।
