কৃষ্ণকান্ত ছোড়দির দিকে একদৃষ্টে খানিকক্ষণ চেয়ে থেকে বলল, তুই তো খুব ঝগড়ুটে। এখন গিয়ে ঝগড়া করতে পারিস না?
ঝগড়া! বিশাখা অবাক হয়ে বলে, কার সঙ্গে?
কেন, শচীনদার সঙ্গে।
ঝগড়া করব কেন?
তুই তো ঝগড়ার কথাই বলছিস এতক্ষণ। এখন যা না গিয়ে ঝগড়া করে আয়।
আমার বয়ে গেছে। যে যার কর্মফল ঠিক ভুগবে। ভগবান তো আছেন।–এই বলে বিশাখা উঠে গেল।
শচীনের মুখোমুখি হওয়ার কোনও ইচ্ছা ছিল না বিশাখার। তবু একবার শচীনের রাগে গনগনে মুখটা দেখতে ইচ্ছে করছিল। বুকের জ্বালা খানিকটা জুড়োয় তা হলে।
দোতলায় উঠবার সিড়ির গোড়ায় যখন বিশাখা প্রথম ধাপটায় পা তুলেছে তখন শচীন নেমে এল ঝড়ের বেগে। সামনে বিশাখাকে দেখেই একটু থমকে গেল।
বিশাখা দেখল, শচীনকে একদম অস্বাভাবিক দেখাচ্ছে। যেন-বা উন্মাদেরই দৃষ্টি তার চোখে।
শচীন তাকে ধমকের স্বরে জিজ্ঞেস করে, চপলা কোথায়?
বিশাখার আপাদমস্তক এই প্রশ্নে জ্বলে যায়। এই পুরুষটির প্রতি তার কিছু দুর্বলতা দেখা দিয়েছিল বটে, কিন্তু তার আর কিছুই এখন অবশিষ্ট নেই। উপরন্তু লোকটার বেহায়া নির্লজ্জপনা দেখে তার ভিতরটা আরও গরম হয়ে গেল।
বিশাখা পালটা প্রশ্ন করে, আপনি কার হুকুমে ওপরে গিয়েছিলেন?
তার মানে? হুকুমটা আবার কার কাছ থেকে নিতে হবে? তোমার কাছ থেকে নাকি?
বাইরের লোক হয়ে আপনি যখন-তখন ভিতরবাড়িতে ঢুকবেন কেন?
আমার দরকার ছিল।
কী দরকার তা আমার জানার প্রয়োজন নেই। কিন্তু আপনি পুরুষমানুষ, একটু লজ্জাবোধ থাকলে কখনওই আপনি মেয়েদের অন্দরমহলে ঢুকতেন না।
ছোট মুখে বড় কথা মানায় না, বিশাখা। যাক, এ তর্ক হেমকান্তবাবু ফিরলেই হবে। আমি জানতে চাই চপলা বরিশাল গেল কেন। তুমি বলতে পারো?
আমার বউদিকে নাম ধরে ডাকার সাহস করে থেকে হল?
যবে থেকেই হোক, জবাবটা তোমার জানা আছে?
জানলেও বলব কেন? আপনি কে?
কথা কাটাকাটি বেশ উচ্চগ্রামে উঠে যাওয়ায় সিঁড়ির মুখে দাস-দাসীদের উকিঝুকি শুরু হয়ে গেল। বিশাখা যথেষ্ট তপ্ত বোধ করছে ভিতরে-ভিতরে।
শচীন বরং কিছু অপ্রস্তুত। এ বাড়ির মেরুদণ্ডহীন কর্তার আমলে সে-ই প্রকৃতপক্ষে এস্টেটের কর্ণধার হয়ে দাড়িয়েছে। তার দৌলতেই জমিদারির ডুবুডুবু নৌকো এখনও কোনওক্রমে টিকে আছে। এ বাড়ির কেউ তার মুখের ওপর কথা বলবে এটা ভাবাই যায় না। কিন্তু বলছে। এবং খুব অন্যায্য কথাও বলছে না। কিন্তু শচীনের ন্যায্য-অন্যায্য বিচারবোধ ক্রিয়াশীল নয়। তার মাথায় এখন ঝড়। চপলা ছাড়া তার পৃথিবী অন্ধকার। বিশাখার মুখে এরকম ন্যায্য কথাবার্তা শুনে সে দিশা হারিয়ে ফেলে বলে, আমি কে তা জানো না? আমি নইলে তোমাদের ভিটেয় ঘুঘু চরত তা জানো?
জানি। আপনি উকিল। বাবা আপনাকে এস্টেটের কাজ দেখার জন্য মাইনে দিয়ে রেখেছেন। সোজা কথায় আপনি আমাদের কর্মচারী। আপনার কী অধিকার বাড়ির বউ কোথায় গেছে তা আমার কাছে জানতে চাওয়ার?
শচীন এটা সহ্য করতে পারল না। একদম বেহেড হয়ে গিয়ে সে বলল, সরিয়েছ! তোমরাই চপলাকে সরিয়েছ! কিন্তু পারবে বাঁচাতে? চপলা আমার। আমি যেমন করে পারি তাকে দখল করবই। দেখি তোমরা কী করতে পারো।
যে রাগ ও হতাশা বহুকাল ধরে বিশাখার ভিতরে মাথা কুটে কুটে একটা বেরোবার পথ খুঁজছিল আজ সে পথ পেয়ে গেছে। বিশাখা ফুসে উঠে বলল, খুব আসকারা পেয়ে গেছেন তাই না? কিন্তু এর ফল আপনাকে ভোগ করতে হবে। হেমকান্ত চৌধুরীকে আপনি যত নিরীহ ভাবেন তত নিরীহ যে তিনি নন সেটা আমিই বুঝিয়ে দেব আপনাকে। বাবা বরিশাল থেকে ফিরুন, তারপর বুঝবেন।
কী বুঝব? কী করবে তোমরা আমার?
লেঠেল দিয়ে ঘরবাড়ি ভেঙে দেব। ভিটেছাড়া করব। আর কখনও এ বাড়িতে ঢুকবেন না। যান!
এর জবাবে উকিল শচীনের মুখে কোনও কথা এল না। কিন্তু তার ডান হাতটা নিজের অজান্তেই ওপরে উঠে গেল…
তারপর সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত আচমকা একটা চড় এসে ফেটে পড়ল বিশাখার বাঁ গালে।
অবিশ্বাস, দুর্বোধ্যতা এবং মানসিক বিকলতার দরুন চড়টাকে আসতে দেখেও বিশাখা নড়েনি। চড়টা বাঁ গালে পড়তেই সে চোখে অন্ধকার দেখল। দুলে উঠল শরীর। বিশাখা উবু হয়ে বসে পড়ল মেঝের ওপর।
মাগো!
যে-কোনও কাপুরুষের পক্ষে এ সময়ে পালিয়ে যাওয়াটাই ছিল স্বাভাবিক। কিন্তু শচীন পালাল । খুব অবিশ্বাসের সঙ্গে সে কিছুক্ষণ নিজের ডান হাতের চেটোটার দিকে চেয়ে রইল। তারপর তাকাল কুঁজো হয়ে থাকা বিশাখার দিকে।
দাস-দাসীরা ছুটে আসছিল বিশাখাকে ধরে তুলতে।
তাদের অবাক করে দিয়ে শচীন নিজেই শেষ ধাপটায় নেমে নিচু হয়ে পাঁজাকোলায় তুলে নেয় বিশাখাকে। নিঃশব্দে সিঁড়ি ভেঙে ওপরে উঠে আসে। ঘরে নিয়ে শুইয়ে দেয় বিছানায়।
বিশাখার তেমন কিছু হয়নি। একটা চড় আর কতটাই বা মারাত্মক? তবে তার দুই চোখে বিশ্বের বিস্ময়। তার নিজের মা-বাবাই তাকে কখনও মারেনি। পিঠোপিঠি ভাই কৃষ্ণকান্ত কখনও-সখনও কিলটা চড়টা দিলেও সে নিতান্তই খুনসুটি। সত্যিকারের মার জীবনে সে এই প্রথম খেল। তাও এক পরপুরুষের হাতে।
দু’জনেই ভীষণ অবাক হয়ে চেয়ে থাকে দু’জনের দিকে। ঘরে লোকজনের ভিড় হয়ে যাচ্ছিল। শচীন একটু চমকাল কেন যেন।
তারপর বিশাখার দিকে চেয়ে বলল, আমারই ভুল হয়েছিল।
শুধু এইটুকু বলেই শচীন ঘর থেকে বেরিয়ে নীচে এসে সাইকেলে উঠে চলে গেল।
তিন দিন শচীন আর এমুখো হল না।
তিন দিন বিশাখারও কাটল এক অদ্ভুত ঘোরের মধ্যে। বাঁ গালটা ফুলে লাল হয়ে ছিল অনেকক্ষণ। কিন্তু সে জ্বালা জুড়োতে দেরি হয়নি। জ্বালা মনের মধ্যে। তিন দিন ভাল করে দিনরাত ঠাহর করতে পারল না সে। অনুভব করতে পারল না তার চারদিককার বাস্তবতা। টের পেল না সে ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখছে, না কি জেগে আছে। এত অপমান সয়ে মানুষ বেঁচে থাকে কী করে? এত অপমান একজনকে করতেই বা পারে কী করে আর-একজন?
