কৃষ্ণকান্ত তাঁর উপস্থিতি টের পেয়ে তাকাল এবং উঠে দাঁড়াল। সঙ্গে প্রতুল। প্রতুল খুব মেধাবী এবং দরিদ্র। সে বি এ পড়ে। হেমকান্তর সাহায্য না পেলে সেটুকুও পারত না। কৃষ্ণকান্ত ও প্রতুল দুজনেই জিজ্ঞাসু চোখে চেয়ে থাকে তার দিকে। হেমকান্ত একটু লজ্জা পান। মাথা নেড়ে বলেন, কিছু নয়। পড়ো তোমরা, পড়ো।
ধীরে ধীরে চাকরের লণ্ঠনের আলোয় পথ দেখে দেখে তিনি নিজের ঘরে আসেন। সেখানে অবশ্য উজ্জ্বল সেজবাতি জ্বলছে।
আর-একজন চাকর তার পোশাক ছাড়িয়ে দেয়। ধুতি, মোজা ও বালাপোষের কোট পরে তিনি মস্ত খাটের বিছানায় একটা শাল জড়িয়ে বসেন। আজ তার মনে হয় একটা কোনও নেশা থাকলে বেশ হত। এখন একটু বেশি মাত্রায় হুইস্কি বা ব্র্যান্ডি খেয়ে শুয়ে পড়লে গাঢ় ঘুম হত তার।
এ কী? তুমি ঘরে যে!—-রঙ্গময়ি হঠাৎ আবির্ভূত হয়ে বলে।
কেন, কী হয়েছে?
মড়ার ঘরে ঢুকেছিলে। চানটান করোনি! আগুন ছোওনি! কী অশুচি কাণ্ড! ওঠো, ওঠো! বিছানাপত্তর সব ফেলতে হবে। মশারিশুদ্ধ। ঘরে গঙ্গাজল দিক। ওঠো শিগগির।
হেমকান্ত ওঠেন। কিছু তটস্থ, কিছু অপ্রতিভ।
“কত আদরের এই দেহ। তবু যখন দেহ মরে তখন তাহা অশুচি হইয়া যায়। প্রিয়জন যতক্ষণ জীবিত থাকে, ততক্ষণ কত সমাদর, কত আদর ও সোহাগ। সেই প্রিয়জন যখন মৃতদেহে পর্যবসিত হইল তখনই তাহা অস্পৃশ্য। দেহ পোড়াও, গোর দাও, যত শীঘ্র পারো তাহা বিনাশ করিয়া ফেলল। তাহার সংস্পর্শে যত কিছু ছিল তাহা কাচিয়া, গঙ্গাজল, গোবরছড়া দিয়া শুদ্ধ করিয়া লও। এরূপ নিয়ম আমার ভাল লাগে না, কিন্তু বুঝি ইহার কিছু প্রয়োজন আছে। মৃতদেহ রোগজীর্ণ, জীবাণুযুক্ত, পচনশীল। কিন্তু যতক্ষণ প্রাণ থাকে ততক্ষণ তাহার আদর।
“এই চিন্তা হইতে আমি প্রাণের প্রশ্নে উদ্বেলিত হইলাম। প্রাণ কী? আত্মা কী? দেহের সঙ্গে প্রাণ বা আত্মার যোগসূত্রই বা কী? দেহমুক্ত আত্মার অবলম্বনই বা কী?
“আমি এইসব প্রশ্ন লইয়া একজন জানবুঝওয়ালা লোকের সঙ্গে আলোচনা করিবার ফিকির খুঁজিতেছিলাম। তুমি কাছে নাই। বিজ্ঞ বয়স্যের একান্তই অভাব। অগত্যা আমাদের কুলপুরোহিত বিনোদচন্দ্রের শরণ লইতে হইল। বিনোদচন্দ্র পুরোহিত হিসাবে কেমন তাহা কখনও খোঁজ করি নাই। তিনি আবার বাবার নিযুক্ত পুরোহিত। কিন্তু হা হতোস্মি! বিনোদচন্দ্র আমাকে যাহা বুঝাইবার চেষ্টা করিল তাহা বাসাংসি জীর্ণানির অধিক কিছু নহে। আমি তাহাকে বলিলাম, জীর্ণ বাস পরিত্যাগ করে যে শরীর তাহা তো একটি বস্তু। কিন্তু শরীর ছাড়িয়া যে বাহির হয়, যাহাকে প্রাণ আখ্যা দেওয়া হইয়া থাকে তাহা কোন বস্তুতে নির্মিত? আত্মার পদার্থই বা কীরূপ? উনি বলিলেন, বায়ু জাতীয় পদার্থ।
“আমি তাঁহাকে পুনরায় জিজ্ঞাসা করিলাম, আপনি আত্মাকে প্রত্যক্ষ করিয়াছেন কি না। উনি জবাবে বলিলেন, বহু আত্মা দেখিয়াছি। পরিষ্কার জলে ক্ষুদ্র মাছেরা যেরূপ সন্তরণ করে আমাদের চতুর্দিকে সেরূপ বহু আত্মা সন্তরণ করিতেছে। তবে দেখিবার জন্য চক্ষু ও মনকে প্রস্তুত করিতে হয়।
“আমি চক্ষু ও মনকে প্রস্তুত করিতে রাজি। বিনোদচন্দ্র তখন ফাঁপরে পড়িলেন। বলিলেন, এখন কিছুদিন শুদ্ধাচারে জপতপ করুন, পরে পদ্ধতি শিখাইব। কিন্তু তাহার হাবভাব দেখিয়া মনে হইল, পদ্ধতি তিনিও বড় একটা জানেন না।
“কোকাবাবু গত হইলেন। তাঁহার দেহ পঞ্চভূতে মিশিয়াছে। আমার দেহও মিশিবে। সেইজন্য বড় একটা চিন্তিত নহি। আমি মৃত্যুর স্বরূপকে জানিতে চাই। এই আকাঙ্ক্ষা নিতান্ত তত্ত্বগত নহে। এই আকাঙ্ক্ষা আমার অন্তরে নিরন্তর রক্তক্ষরণ ঘটাইতেছে।
“মানুষের সহিত এই পৃথিবীর একটা সম্পর্ক তাহার জীবৎকালে রচিত হয়। আমাদের আয়ুষ্কাল মহাকালের তুলনায় পদ্মপত্রে নীরবৎ ক্ষণস্থায়ি। এত জানি বুঝি, তথাপি এই পৃথিবীর সহিত নিজেকে আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধিবার আয়োজন বড় কম করি না। কিন্তু এই দৃশ্যমান জগৎ ও জীবনের অতিরিক্ত আর একটি নীরব প্রবাহ আছে। তাহার কথা কি কখনও তোমার মনে হয়?
“আমার প্রিয় কুঞ্জবনটির কথা তুমি নিশ্চয়ই ভুলিয়া যাও নাই। আজকাল রোজ অপরাহে, সেইখানে বসিয়া কত কথা ভাবি। সেই যে একদিন স্খলিত হাত হইতে কুয়ার বালতি পড়িয়া গেল সেই হইতেই এই আন্দোলনের সূত্রপাত। তোমার মতো আমি কাজের মানুষ নহি। বলিতে কী, সারাটি জীবন আমি নিজেকে লইয়াই আছি। বড় জোর নিজের কাজটুকু নিজে করিয়া লই। কিন্তু বৃহৎ জগৎ ও জীবনের সহিত আমার সম্পর্ক নাই। তাই বোধ হয় আমার মনটিও কিছু নিষ্কর্মা। এইসব চিন্তা করিবার অবকাশ পাই।
“কিন্তু ভায়া সচ্চিদানন্দ, চিন্তা বড় সুখের নহে। আমার দাদা কেন সংসারত্যাগী হইয়াছিল তাহা আমার সঠিক জানা নাই। সংসার ছাড়িয়া সে কোন পরমার্থ লাভ করিয়াছে তাহারও সংবাদ পাই নাই। আমার তো সন্ন্যাস গ্রহণেরও দরকার নাই। সংসারে আমি তো সন্ন্যাসীর মতোই বসবাস করিতেছি। আজকাল সেই বৈরাগ্য তীব্রতর হইয়াছে। কিন্তু ভাই, আমি সংসার ছাড়িয়া বনেজঙ্গলে যাইতে পারিব না। আমার সেই সাহস নাই।
“আমার এই অসময়ে তোমাকেই আমার সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। তুমি কাছে থাকিলে হয়তো। দু-একটি কথার ফুঙ্কারে আমার অন্তরের জ্বালা নিবারণ করিতে পারিতে। তোমার সাহচর্যই হয়তো আমার বহু জটিল প্রশ্নের মীমাংসা করিয়া দিত। কিন্তু তুমি ব্যস্ত মানুষ, আমার পূর্ব পত্রের জবাবটাই এখনও দিয়া উঠিতে পারো নাই।
