কেন বলুন তো!
দরকার আছে। একটু এক জায়গায় আসতে পারবেন?
রেমি অস্বস্তিতে পড়ে বলে, না, সেটা সম্ভব নয়।
কেন? বাড়ির রেস্ট্রিকশন আছে?
তাও আছে। আমার শরীরও ভাল নয়।
আপনি যে প্রেগন্যান্ট তা আমি জানি। কিন্তু বেশি দূর নয়।
আপনিই আসতে পারেন তো! আমার শ্বশুরমশাই আমাকে বেরোতে নিষেধ করে গেছেন।
আমি আসব?–মেয়েটা যেন অবাক হয়ে বলে, সেটা কি ভাল দেখাবে?
আপনি কে বলুন তো! ধারা নামে কাউকে আমার মনে পড়ছে না তো!
আপনার সঙ্গে আমার পরিচয় নেই। ধ্রুব কি আপনাকে কিছু বলেনি?
ও কী বলবে?
আমার পরিচয়।
না। ও কি চেনে আপনাকে?
মেয়েটি একটু হাসল, চেনে। তা হলে আমিই কি আসব?
আপনার ইচ্ছে।
ধ্রুব বলছিল আপনি আমাকে দেখতে চান।
একথায় রেমি হঠাৎ চমকে ওঠে। তারপর স্তব্ধ হয়ে যায়।
মেয়েটি আবার বলে, আমি কি সত্যি আসব?
রেমির মাথাটায় গণ্ডগোল লাগতে থাকে। ধ্রুব কথা রেখেছে, কিন্তু সে নিজে কেন মাঝখানে নেই? এখন কী বলবে রেমি? তার পা কাঁপছে। বুক কাঁপছে।
রেমি অত্যন্ত বিতৃষ্ণার সঙ্গে বলে, আপনার ইচ্ছে।
আমার তো ইচ্ছে নেই। আপনার ইচ্ছে বলেই যাওয়া।
ঠিক আছে, আসুন।
এখন গেলে আপনার কোনও অসুবিধে নেই তো।
না, অসুবিধে কীসের?
তা হলে উইদিন ফিফটিন মিনিটস! কেমন?
ঠিক আছে।
পনেরোটা মিনিট কী করে যে কাটল রেমির তা আজ আর সে বলতে পারবে না। ওই পনেরো মিনিট তার কাছে পৃথিবীটা একদম শূন্য হয়ে গিয়েছিল। কোনও অনুভূতি, রাগ, হিংসে, জ্বালা কিছুই বোধ করেনি সে। বোধ করেনি শীত বা তাপ। যা সন্দেহের মধ্যে ছিল, অনুমানের রাজ্যে ছিল, যা ছিল চোখের আড়াল এবং যাকে শেষ পর্যন্ত চোখমুখ বুজে ভুলে থাকা যেত সেটা এমন রূঢ় বাস্তব হয়ে আসছে দেখে বড় অসহায় হয়ে গিয়েছিল রেমি। দু’চোখ দিয়ে অজস্র ধারায় শুধু জল বেয়ে পড়ল কোলের ওপর। পায়ের তলা থেকে বাস্তবিকই মাটি সরে যাচ্ছে।
একজন চাকর এসে বলল, আপনার সঙ্গে একজন দেখা করতে এসেছেন। ড্রয়িংরুমে বসিয়েছি।
রেমি আর চমকাল না। উঠে ড্রেসিং টেবিলের সামনে গেল। চোখ মুছে একটু পাউডার দিল মুখে। চুলটি আঁচড়ে নিল। তারপর কলিং বেল টিপে চাকরকে ডেকে বলল, মেয়েটাকে এ ঘরে নিয়ে আয়।
মেয়েটি ঘরে ঢুকতেই ঘরটা যেন ভরে গেল স্নিগ্ধ রূপে। রেমি আশা করেছিল, ধ্রুব যেমন বলেছে তেমনই হবে বোধ হয় মেয়েটা। কালোটালো, কুচ্ছিত, তা মোটেই নয়। আদ্দিকালে যেমন পানপাতার মতো মুখের কথা শোনা যেত এর মুখটাও তেমনি ভরাট, নিটোল, চোখের মণি একটু খয়েরি, কিন্তু মস্ত মস্ত দুটো চোখা ঠোঁট পুরন্ত। ডগমগ করছে শরীর। চোখের দৃষ্টি অতি উজ্জ্বল। মুখে মিষ্টি ভদ্র হাসি। পরনে মণিপুরি কাজ করা তাঁতের দারুণ শাড়ি। রেমি একটু হতভম্ব হয়ে গিয়েছিল দেখে।
০৬৭. আজ শচীনের চেহারার মধ্যে
আজ শচীনের চেহারার মধ্যে একটা দুর্যোগের পূর্বাভাস ছিল। ফরসা মুখ লাল টকটক করছে কোনও অভ্যন্তরীণ উত্তেজনায়। চুল অবিন্যস্ত। চোখের দৃষ্টিতে নীরব হুংকার। কৃষ্ণকান্ত আর বিশাখা পরস্পর মুখ তাকাতাকি করে বসে রইল। শচীন সাইকেলটা স্ট্যান্ডে তুলল একটা হিংস্র ঝটকায়। তারপর অতি দ্রুত পায়ে ভিতর বাড়ির দিকে চলে গেল।
কৃষ্ণকান্ত দিদির দিকে তাকিয়ে ভ্রু কুঁচকে বলল, কোথায় গেল বল তো!
বিশাখা খুব স্তিমিত গলায় বলে, বোধহয় বউদির খোঁজ করতে।
কৃষ্ণকান্ত খুবই বুদ্ধিমান। সে যতই ব্রহ্মচর্য করুক আর স্বেচ্ছা-নির্বাসনে বাস করুক, ঘটনার আঁচ সে ঠিকই পায়। তাই, প্রসঙ্গটা ঘুরিয়ে বলল, তুই বরং যা ছোড়দি। গিয়ে শচীনদাকে জিজ্ঞেস কর কাকে খুঁজছে।
দাসী-চাকররাই বলবে। আমার যাওয়ার কী?
বিশাখা বিবশ হয়ে কিছুক্ষণ বসে রইল। শচীন এই এস্টেটের উকিল হলেও বাইরের লোক। এ বাড়ির অন্দরমহলে হুটহাট ঢুকে যাওয়ার অধিকার তার নেই। তার ওপর শচীন কেন অসময়ে এসে হাজির হয়েছে তাও জানে বিশাখা। সব মিলিয়ে তার ভিতরেও একটা রাগের ঝাঁঝ উঠছিল। কিন্তু বেশি কিছু করার সাধ্য তার নেই। বাবা যদি একটু কঠিন ধাতের মানুষ হত তবে শচীনের এত বাড় হতে পারত না।
কৃষ্ণকান্ত এবার একটু চাপা গলায় বলে, শচীনদা একটু রেগে আছে মনে হচ্ছে।
কেন রেগে আছে তা বিশাখা অনুমান করতে পারে। ভিতরকার ঘটনা সে সবটা জানে না ঠিকই, কিন্তু বউদির এই যে হঠাৎ বরিশাল যাওয়া এটা যে এমনি নয়, ভিতরে যে আরও একটু কিছু আছে তা বুঝতে তার অসুবিধে হয় না। শচীনকে ফাঁকি দিয়েই গেছে বউদি। মুখের গ্রাস সরে যাওয়ার খবর পেয়ে এখন জখমি বাঘের মতো এসেছে শচীন। কী কেলেঙ্কারি হয় কে জানে! কৃষ্ণকান্তর কথার জবাবে শুধু বলে, হ্যাঁ, খুব তেজ হয়েছে। দারোয়ান দিয়ে গলাধাক্কা দেওয়ালে ঠিক হত।
কৃষ্ণকান্ত বলে, যাঃ, কী যে বলিস!
ঠিকই বলি। বাবা ওরকম মেনিমুখো বলেই এসব কেলেঙ্কারি হচ্ছে। অন্য কোনও জমিদারবাড়ি হলে ওকে ঘাড়ধাক্কা তো দিতই, বাড়ির বউকেও চুলে দড়ি বেঁধে ঝুলিয়ে রাখত।
কৃষ্ণকান্ত কোনও কথা বলল না। কৃষ্ণকান্ত যে চুপ করে রইল তার কারণ একটাই। ভিতরে ভিতরে সে নিজের বয়সকে ছাড়িয়ে একটু বেশি পরিণত হয়ে উঠেছে। সে তার ছোড়দির মতো সহজে উত্তেজিত হয় না। প্রতিক্রিয়ার বদলে তার ভিতরে শুরু হয় বিচার বিশ্লেষণ এবং সমাধানের চেষ্টা। বউদির সঙ্গে যে শচীনদার একটা সম্পর্ক তৈরি হয়েছে তা শোনা আছে তার। অনেক ভেবে সে এই সমস্যার কোনও সমাধান খুঁজে পায়নি। একথাও ঠিক যে, তার বাবা নিরীহ, বড়দা কনককান্তি ব্যক্তিত্বহীন এবং সে নিজে ছেলেমানুষ। সেই কারণেই এই প্রায় অভিভাবকহীন পরিবারের কোনও রক্ষাকবচ নেই।
