কীসের আনন্দ?
এই যে বাবা হবে।
ধ্রুব একটু হাসল। বলল, হয়। কিন্তু সে তোমার আনন্দের মতো নয়।
তুমি কি মঙ্গলগ্রহের মানুষ? কিছুই আমাদের মতো নয়?
বোধহয় তাই। এই পৃথিবীতে বহু গ্রহান্তরের লোক বসবাস করে। তারাই একদিন সংস্কার ও গোঁড়ামিমুক্ত, বুদ্ধি ও যুক্তিগ্রাহ্য একটি সমাজ ব্যবস্থা চালু করবে। সেদিন তুমি আর তোমার শ্বশুরের মতো লোক যাবে নির্বাসনে।
আঃ, ফের বড় বড় কথা। ছেলে হবে, আনন্দ হচ্ছে কি না সেইটে বলো।
বললাম তো, হচ্ছে।
তোমার মুখ দেখে কিন্তু বোঝা যায় না। কেমন গোমড়া হয়ে থাকো।
বাচ্চা হওয়া কি একটা সাংঘাতিক ঘটনা নাকি? ভিখিরিদেরও হচ্ছে তো।
তোমার তো বলতে গেলে প্রথম। একটাকে তো খুন করেছ।
ধ্রুব চুপ করে গেল। তারপর রেমিকে বুকের মধ্যে টেনে নিয়ে খুব ভালবাসল কিছুক্ষণ। তারপর বলল, এখনও সেজন্য দুঃখ পাও, না?
পাব না! কী নিষ্ঠুর তুমি!
বাচ্চাটা কি আমারই ছিল, রেমি?
তোমার নয় তো কার? কী করে যে সমীরকে তোমার সন্দেহ হল! ছিঃ!
ধ্রুব মাথা নাড়ল, আমার নয়। সন্দেহ ছিল তোমার শ্বশুরের। আমি নিমিত্ত মাত্র।
তখন কেন রুখে দাঁড়াওনি? এত যে তুমি মুক্তমনা মানুষ তখন সাহসটা কোথায় ছিল?
সাহস আজও নেই। সেকথা থাক। আমি নিজে উদ্যোগী হয়ে বাচ্চাটা নষ্ট না করলে কী হত জানো?
কী হত?
তোমার শ্বশুর কিছুতেই তোমাকে বাচ্চা নষ্ট করার প্রস্তাব দিতে পারত না। শ্বশুর হয়ে সেটা তো সম্ভব নয়। অথচ তার সন্দেহ ছিল বাচ্চাটা তার বংশের নয়। সেক্ষেত্রে উনি আরও ক্রুড কোনও পস্থা নিতেন। সেকথা তোমার না শোনাই ভাল। হয়তো বিশ্বাসও করবে না।
করব। বলো।
হয়তো একদিন জগাদা বা তোমার শ্বশুরের বশংবদ আর কেউ সিঁড়িতে তোমাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিত অসাবধানতার ভান করে। কিংবা তোমার বাথরুমে তেল ঢেলে পিছল করে রাখা হত। কিংবা তোমার খাবারে মিশিয়ে দেওয়া হত কোনও ওষুধ। তোমার নিরাপত্তার কথা ভেবে আমিই অগ্রণী হয়ে নিরাপদে ব্যাপারটা করে ফেলি।
এতটা?–খুব অবাক হয়ে রেমি বড় বড় চোখ করে ধ্রুবর দিকে চেয়ে থাকে। চোখে ভয়।
ধ্রুব খুব নিবিড়ভাবে বুকে আরও চেপে ধরে রেমিকে। বলে, আমাকে বিশ্বাস করবে না তুমি, জানি। শ্বশুরমশাই তোমাকে প্রাণাধিক ভালবাসেন এও সত্য রেমি, কিন্তু বংশমর্যাদা ওঁর কাছে আরও অনেক বড়। আমার মাকে মরতে হয়েছিল শুধু ওই জেদি লোকটার অদ্ভুত কিছু ধারণার জন্য।
বলল, আমি শুনব।
না, একদিনে এত নয়। তোমার মাথা দুর্বল। এত নিতে পারবে না। পেটে বাচ্চা রয়েছে, এ সময়ে এসব বিষন্ন কাহিনি তোমার পক্ষে ভালও নয়।
আমাকে যদি জগাদা ধাক্কাই দিত তা হলে নয় পড়ে মরতামই, তুমি কেন আমাকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছিলে? তুমি তো আর আমাকে ভালবাসো না।
আমি তোমাকে এক রকম ভালবাসি, রেমি। রকমটা আলাদা। তোমাকে অনেকবার বলেছি, তুমি বুঝতে পারেনি। আমি তোমাকে একজন পৃথিবীবাসী হিসেবেই ভালবাসি।
আর কিচ্ছু নয়?
আর কী চাও, রেমি?
আমি যে কী চাই জানি না। কিন্তু তোমার চোখ দেখে মনে হচ্ছে তুমি মিথ্যে কথা বলছ। তুমি আমাকে তার চেয়ে একটু বেশি ভালবাসো।
না, রেমি। আমি ভাল না বাসার চেষ্টা করছি। আমি চেষ্টা করছি আমার ভালবাসাকে ব্যক্তিবিশেষে সীমাবদ্ধ না রেখে সকলের প্রতি সমানভাবে ছড়িয়ে দিতে। তোমার প্রতি তাই আমার বিশেষ দুর্বলতা থাকতে নেই।
সেটা তো থিয়োরেটিক্যাল কথা। আসল কথাটা?
আসল কথা!–ধ্রুব একটু ভাবল। তারপর রেমিকে ছেড়ে দিয়ে নিরুত্তাপভাবে চিত হয়ে শুয়ে মশারির চালের দিকে চেয়ে থেকে বলল, তোমার প্রতি আমার একটু আসক্তি ছিল। কবে কেমন করে সেটা হল তা বলতে পারব না। হয়তো আমার প্রতি তোমার টান দেখেই রেসিপ্রোকাল একটু টান আমারও হয়েছিল। সেটা ভাঙতেই আমি আর-একটা মেয়েকে আমদানি করেছে। সে তোমার। প্রতিপক্ষ নয়। সে আসলে আমাকে একটা ভারসাম্য রক্ষায় সাহায্য করছে। তাই বলছিলাম তাকে তোমার হিংসে করার কিছু নেই।
রেমি বড় অবাক হল। ধ্রুবর পাগলামি কোথায় পৌঁছেছে তা ভেবে একটু ভয়ও পেল সে। গাঢ়স্বরে বলল, ওগো, পায়ে পড়ি। আমাকে বরং ভালবেসো না। কিন্তু ভারসাম্য আনতে গিয়ে তুমিই যে ব্যালান্স হারিয়ে ফেলছ! এসব কী হচ্ছে বলো তো!
খুব অদ্ভুত! না?
ভীষণ অদ্ভুত। এ যে পাগলামি!
এর চেয়ে নরম্যাল আর কী হতে পারে, রেমি? আজ পাগলামি বলে মনে হলেও ভবিষ্যতের মানুষ যদি কখনও আমার এক্সপেরিমেন্টের কথা জানতে পারে তা হলে বলবে বিংশ শতাব্দীতে এই একটা সত্যিকারের নরম্যাল লোক ছিল।
ওই মেয়েটাও কি তোমার মতো পাগল?
মেয়েটা! ওঃ, মেয়েটার কথা যে তুমি কেন ভুলতে পারছ না!
ভুলব? কী সর্বনেশে সব কাণ্ড করছ তুমি, এ কি ভোলা যায়?
তোমাকে অনেকবার বলেছি রেমি, মেয়েটা কোনও ফ্যাক্টর নয়। মেয়েটা অ্যাকচুয়ালি নন-এনটিটি।
কেন নন-এনটিটি হবে? সেও তো একটা মানুষ?
মানুষ তো বটেই। কিন্তু তোমার প্রতিপক্ষ নয়। আবার বলছি আমি তার প্রেমে পড়িনি। আমি একটা সার্বজনীন ভালবাসা আয়ত্ত করার চেষ্টা করছি।
তুমি পাগল।
এই বলে রেমি অনেকক্ষণ কাঁদল। ধ্রুব বাধা দিল না। চুপ করে শুয়ে রইল।
এই ঘটনার কিছুদিন পরে এক দুপুরে একটি মেয়ে টেলিফোনে রেমিকে চাইল। রেমি গিয়ে ফোন ধরতেই ওপাশ থেকে মেয়েটি বলল, আমি ধারা।
ধারা! কে ধারা?
আমি আপনার সঙ্গে একটু দেখা করতে চাই।
