ধ্রুব আর সে আজকাল একসঙ্গে থাকে নীচের ঘরে। ধ্রুব যে তাকে আগের চেয়ে কিছু বেশি ভালবেসেছে তা নয়। তবু পেটে বাচ্চাটা আসার পর থেকে আর দূর-দূরও করছে না আগের মতো। মায়া! হবেও বা।
ধ্রুব নিজেই একদিন রেমিকে বলল, আটকে গেলে, রেমি। বাঁধা পড়ে গেলে।
তার মানে?
এই যে ছেলের মা হতে চলেছ, খুব জটিল হয়ে গেল সবকিছু।
তাই নাকি? আমার তো কিছু জটিল মনে হচ্ছে না! এরকমই তো হওয়ার কথা।
স্বাভাবিক নিয়মে হওয়ারই কথা বটে, কিন্তু আমি তো সাধারণ নিয়মে চলি না।
তা হলে তুমি তোমার নিয়মেই চলল। আমি চলি আমার নিয়মে।
খুব চ্যাটাং চ্যাটাং কথা শিখেছ দেখছি।
সবকিছুর মধ্যে অত জটিলতা দেখো কেন?
জটিল বলেই জটিল দেখি। তোমার মতো বোকা তো নয়।
তুমিও একরকম বোকা। স্বাভাবিক কিছুই তোমার ভাল লাগে না।
শোনো খুকি, তুমি বাস করো কৃষ্ণকান্তর পুরনো মূল্যবোধের জগতে। ওই লোকটাও যুগেব সঙ্গে নিজেকে তেমন বদলে নিতে পারেনি। পারেনি বলেই মন্ত্রিত্ব গেছে, রাজনীতিতে প্রভাব কমে যাচ্ছে, কেউ তেমন পাত্তা দিচ্ছে না। কিন্তু তোমরা শ্বশুর-পুত্রবধু যে জগতে বাস করো তা তত আর বাস্তবিকই নেই। সমাজ একটা স্থাণু জিনিস নয়। বারবার নানা চাপে পড়ে, নানা নতুন চিন্তাভাবনার ফলে তার বিবর্তন হয়। ব্যক্তিগত ধ্যান-ধারণাও পালটে যায়।
বাইরের সমাজে কী হচ্ছে তা দিয়ে আমার কী?
তোমার কিছুই নয়?
না। আমি বেশ আছি।
ধ্রুব হেসে মাথা নেড়ে বলে, না, তুমি বেশ নেই। আমি তোমাকে এত নিশ্চিন্ত থাকতে দেবও না।
কেন দেবে না?
তোমাকে আমার মতো করে জগৎটাকে দেখতে হবে, কৃষ্ণকান্তর মতো করে নয়।
বাবার নাম ধরছ?
ধরার জন্যই নাম। এতে যে চমকে উঠলে ওটাও সংস্কার। জানো, বিদেশে আজকাল মা বাপের নাম ধরে ডাকাটাই রেওয়াজ?
মা গো! ভাবতেও পারি না।
পারো। অভ্যাসে মানুষ সব পারে। পুরনো ধ্যান-ধারণা ছেড়ে একটু ঝরঝরে মন নিয়ে ভাবতে শেখো। তোমার বাস্তবিকই ব্রেনওয়াশ হয়ে গেছে।
মোটেই না। ব্রেনওয়াশ হয়ে থাকলে তোমারই হয়েছে। এমন সব কিস্তৃত কথা বলো যে পিত্তি জ্বলে যায়।
ধ্রুব একটু হেসে বলে, তুমি তো খুব ঘর-সংসার সম্পর্ক সতীত্ব ইত্যাদিকে মানো। তুমি কি জানো যে আমাদের পূর্বপুরুষরা যখন জঙ্গলে বাস করতেন তখন বিয়ে-টিয়ে ছিল না, সম্পর্ক মানা হত না, ঠিক পশুসমাজের মতোই যে-কোনও নারী-পুরুষ মিলিত হত। আমরা তাদেরই বংশাবতংস নানারকম কৃত্রিম নিয়ম-কানুন বানিয়ে ব্যাপারটাকে ছেলেমানুষি করে তুলেছি। জানো এসব?
জানি। তোমাকে আর বক্তৃতা দিতে হবে না। আমি তোমার পছন্দমতো নিজেকে বদলাতে পারব না।
ধ্রুব একটু হতাশার ভাব প্রকাশ করল। তবে হাসলও। বলল, তুমি ইংলিশ মিডিয়ামে পড়তে না?
আহা, জানো না যেন।
জানি, কিন্তু তোমার হাবভাব দেখে বিশ্বাস হতে চায় না। তোমার শ্বশুর তোমাকে এরকম হিপনোটাইজ করল কী করে বলো তো! আমাকে তো পারেনি। ইন ফ্যাক্ট আমাদের তিন ভাইয়ের কেউই ওই বুড়োর দলে নই। দাদা একজন ডিভোর্সিকে বিয়ে করেছে, বুড়োর খোতা মুখ ভোতা করে দিয়েছে।
তুমি পারোনি বলে দুঃখ হচ্ছে?
আমি অন্যভাবে চেষ্টা করেছিলাম। এ বংশে যা আজও হয়নি সেই ডিভোর্স করে কৃষ্ণকান্তর মুখটাকে যথার্থ কৃষ্ণকান্ত করে দিতাম যদি তুমি একটু কো অপারেট করতে। রাজার সঙ্গে যদি বোম্বাই পালিয়ে যেতে রেমি, তবে সোনায় সোহাগা হত।
আর লিভিং টুগেদার! সেটার কথা বললে না! সেই যে মেয়েটা—
ধ্রুব একটু গম্ভীর হয়ে জিজ্ঞেস করে, ফিলিং জেলাস?
একটুও না। যাও না তার কাছে, যাও।
যাব?
এক্ষুনি যাও।
খুব যে তাড়া দেখছি! এত উদার হলে কবে থেকে?
কেন? আমি কি খুব পজেসিভ? যদি তাই হতাম তা হলে আমার কাছে তুমি অন্য মেয়ের কথা বলতে পারতে?
তা বলে তুমি উদারও নও।
সব উদারতাই কি ভাল? কতবার তো তোমাকে বলেছি আমাকে একবার মেয়েটাকে দেখতে দাও। কই, দেখাওনি তো! তুমিও তো নও তা হলে?
তুমি তো মেয়েটাকে পারলে খুন করবে!
না, করব না। তোমার পছন্দের মেয়েকে খুন করব কেন? এখন দেখাও। দেখি তুমি আমার চেয়ে কত বেশি উদার।
ঠিক আছে। দেখাব।
কবে?
দেখাব একদিন।
এখানে নিয়ে আসবে?
ধ্রুব একটুও হাসছিল না এখন। মাথা নেড়ে বলল, না। তবে ভেবো না, কথা যখন দিয়েছি ঠিকই রাখব।
একটু বিবর্ণ হয়ে যাচ্ছিল রেমি। ধ্রুব দেখাবে! সত্যি? কিন্তু তখন কি সহ্য করতে পারবে সে? একটু ঘন শ্বাস পড়ছিল তার। বুক ধড়ফড় করছিল।
ধ্রুব আনমনে অন্য দিকে চেয়ে বলল, কিন্তু কোনও সিন কোরো না। মেয়েটার প্রতি আমার কোনও দুর্বলতা নেই। একটুও না। আমি শুধু এক্সপেরিমেন্ট করছি একটা।
কীসের এক্সপেরিমেন্ট?
একজন নারী ও পুরুষের সম্পর্ক কতটা নির্বিকার হতে পারে। বিশেষ করে যেখানে প্রেম নেই, অধিকারবোধ নেই, আবেগ নেই, অথচ সম্পর্ক আছে।
রেমি বলল, তুমি একটা পাগল। পাগল। ওরকম কিছু হয় না। আর যদি হয়ই তবে আমার সঙ্গেই কেন ওরকম করো না। যা কিছু এক্সপেরিমেন্ট তা আমার ওপরেই হোক।
ধ্রুব মাথা নেড়ে বলল, না রেমি। এর জন্য দু’জনেরই মানসিক প্রস্তুতি চাই। ট্রেনিং চাই। তোমার তো নেই।
নেই আবার! এত উপেক্ষা এত অবহেলা আর নিষ্ঠুরতা সইলাম তবু কি ট্রেনিং হয়নি? আর কত চাও?
ধ্রুব একথার জবাব দিল না। কিন্তু আচমকা রেমিকে আদর করল। খুবই উষ্ণ, খুবই আন্তরিকভাবে। মিষ্টি অবসাদে যখন দু’জনেই শরীর এলিয়ে দিল তখন রেমি জিজ্ঞেস করল, তোমার আনন্দ হয় না? থ্রিল হয় না?
