ভেজানো দরজা ঠেলে ঢুকে সে দেখতে পায়, কৃষ্ণ বিছানায় শিরদাঁড়া সোজা করে আসনপিড়ি হয়ে বসে একটা বই পড়ছে। তাকে দেখে অবাক হয়ে চেয়ে থেকে বলে, ছোড়দি।
কী করছিস শুনি!
গীতাটা পড়ছিলাম।
খুব পড়ুয়া হয়েছ, না!
কৃষ্ণকান্ত ভারী সুন্দর করে হাসল, কী চাস বল তো!
বাবা বরিশাল গেছে জানিস তো!
জানি।
তুই আমার সঙ্গে থাকবি চল।
তোর সঙ্গে? কেন? ভূতের ভয়?
তোর মাথা! ভূতের ভয় তো কী, মনুপিসি আছে না!
তা হলে আবার আমাকে কেন?
এমনি। চল, আর ঝগড়া করব না।
কৃষ্ণকান্ত একটু হাসল। বলল, আমি যে ব্রহ্মচর্য করছি।
তাতে কী? আমাদের সঙ্গে থাকলে কি ব্রহ্মচর্য নষ্ট হবে?
শুধু মা ছাড়া আর কোনও মেয়ের মুখই দেখতে নেই।
এই যে আমার দিকে তাকালি।
তা কী করা যাবে? এসে পড়লি হঠাৎ, তাই।
রোজ যে মনুপিসির কাছে সংস্কৃত পড়িস, তখন মুখ দেখিস না?
মনুপিসি তো মায়ের মতোই। তুই কিন্তু একটু ঝগড়া করছিস।
কখন আবার ঝগড়া করলাম?
এই তো করছিস।
আর করব না। চল।
না রে। আমার একা থাকতেই ভাল লাগে আজকাল।
তুই একটা কী রে? ভূতের ভয়ও পাস না?
না। ভয় কীসের? আমি তো রোজ ওঁদের দেখি।
যাঃ। রাম রাম।
আমি যেখানে থাকব সেখানেই রোজ কাকা দেখা দেবেন, জানিস?
ফের ওসব কথা?
তুই ভীষণ ভিতু।
বিশাখা তার ভাইয়ের মাথায় একটু হাত বুলিয়ে দিল। মা-মরা ভাই। বলল, রোগা হয়ে গেছিস। রোগা? কী যে বলিস। ইরফানদাদার কাছে রোজ লাঠি শিখি, মুগুর ঘোরাই, জানিস?
সব জানি। তবু রোগা হয়ে গেছিস।
এটা রোগা ভাব নয়। চর্বি মরলে এরকম চেহারা হয়।
বাজে বকিস না। হ্যাঁ রে, আমার সঙ্গে আর এক পাতে খাবি না কোনওদিন?
না। এক পাতে খেতে নেই।
কী হয় খেলে?
স্বাস্থ্যের পক্ষে খারাপ।
কী যে সব মাথায় ঢুকেছে তোর!
গীতা শুনবি?
আমি সংস্কৃত বুঝি না তো।
না বুঝলেও শুনতে ভাল লাগবে। শোন না।
পড় তা হলে।
বিশাখা শুনল। ভারী সুন্দর উচ্চারণ আর কণ্ঠস্বরে কিছুক্ষণ পড়ল কৃষ্ণকান্ত। বিশাখা কিছু না বুঝলেও মুগ্ধ হয়ে গেল। বলল, বেশ তো পড়িস।
খুব লাজুক হাসি হাসল। কৃষ্ণকান্ত। বলল, আমার যখন ফাসি হবে তখন গীতার শ্লোক মুখস্থ বলতে বলতে গলায় দড়ি পরব।
ওমা!–বলে চমকে ওঠে বিশাখা, ফাঁসি হবে মানে!
হবেই তো একদিন।
বিশাখা বিবর্ণ মুখে বাক্যহারা হয়ে চেয়ে থাকে ভাইয়ের দিকে। তারপর বলে, ফাসি হবে কেন?
স্বদেশি করলে তো হয়।
তুই কি পাগল? ছিঃ ওসব কথা বলতে নেই।
তুই কাঁদবি খুব। না?
কাঁদব মানে! মরেই যাব তা হলে।
হি হি। খুব মজা হবে। বাবা কী করবে তখন?
এইসব বুঝি ভাবিস বসে বসে?
খুব ভাবি। আর ভীষণ মজা লাগে। কৃষ্ণকান্তর কঁসি হচ্ছে আর তাব বাবা কঁদছে দিদিরা কাঁদছে দাদারা কঁদছে মনুপিসি কাঁদছে, হি হি হি হি..
থাপ্পড় খাবি এবার। চুপ কর তো।
আমি কিন্তু সাহেব মারবই।
মারা বের করছি তোমার। ঘরে তালা দিয়ে রাখব।
হঠাৎ জানালা দিয়ে বার বাড়ির মাঠের দিকে চেয়ে কৃষ্ণকান্ত চমকে উঠে বলে, এই ছোড়নি। ওই দেখ, শচীনদা আসছে। উস্কোখুস্কো চুল, রাগী মুখ। কী হয়েছে রে ওঁর?
০৬৬. যে সময়টায় রেমির পেটে ছেলেটা এল
যে সময়টায় রেমির পেটে ছেলেটা এল সেটা এক অদ্ভুত সময়। তার আর ধ্রুবর মধ্যে এক বিশ্বাস-অবিশ্বাস, ত্যাগ ও গ্রহণের টানাপোড়েন। ভারী অনিশ্চিত তাদের দাম্পত্য জীবনেব ভবিষ্যৎ। রাজা তখনও হানা দেয় টেলিফোনে, বলে, চলো রেমি, তোমাকে একটা ভদ্র জীবনযাপন করার পথ করে দিই। ও বাড়িতে আর থেকো না। ওরা তোমাকে মেরে ফেলবে।
এ প্রস্তাবের জবাবে রেমি তখন কিছুই স্থির করে বলতে পারে না। সে কিছুতেই তার পরিচিত ছক, তার চেনা গণ্ডি ছাড়তে সাহস পায় না আর।
লতু যদিও ভীষণ বাচ্চা মেয়ে এবং বাড়িতেও বেশিক্ষণ থাকে না তবু একদিন সে তার বউদিকে লক্ষ করল। বলল, তোমার কী হয়েছে বলো তো!
কী আবার হবে! কিছু না।
ছোড়দার সঙ্গে তোমার হ্যাকনিড সম্পর্কটার কথা জানি। সেটা তো নতুন কিছু নয়। কিন্তু তোমাকে খুব ফ্যাকাসে দেখাচ্ছে আজকাল। কী গো?
ভারী লজ্জা পায় রেমি। ননদকে লজ্জার কিছু নেই। তবু পায়।
লতুর মারফত কথাটা অতএব প্রচার হয়ে গেল।
আগের বার কৃষ্ণকান্ত পক্ষে ছিলেন না। সম্ভবত কূট সন্দেহবশে তারই আভাসে ইঙ্গিতে পেটের বাচ্চাটা নষ্ট করা হয়েছিল। কিন্তু এবার তিনি রেমির পক্ষ নিলেন। একদিন সস্নেহে ডেকে বললেন, কোথাও গিয়ে একটু ঘুরে-টুরে আসবে? স্বাস্থ্যকর কোনও জায়গায়?
রেমি অবাক হয়ে বলে, কেন বাবা? আমি তো এখানেই বেশ আছি।
রোগা হয়ে গেছ মা, তাই বলছিলাম। মনটাকে সর্বদা উঁচুতে রেখো। ঠাকুর-দেবতার কথা ভেবো। পবিত্র চিন্তা কোরো। এরকমই নিয়ম।
পবিত্র চিন্তা কীরকম তা জানে না রেমি। তবে সে কোনও অপবিত্র চিন্তাও করে বলে মনে পড়ল না। সে মাথা নেড়ে বলল, আচ্ছা।
এসব পুরনো প্রথার কোনও কার্যকারিতা আছে কি না আমি জানি না। তবে না জেনে কিছু ভেঙে ফেলতেও আমার মন সরে না। আমার এক বুড়ি মাসি আছে। তাকে খবর দিয়েছি। এখানে এসে কিছুদিন থাকবে। এ সময়ে বাড়িতে একজন বয়স্কা অভিভাবিকার দরকার।
সময়টা একরকম ভালই কাটছিল রেমির। কৃষ্ণকান্তর মাসি মানুষটি খুবই শুচিবায়ুপরায়ণা। তবে মানুষটা হাসিখুশি। রেমির তাকে খারাপ লাগল না। কৃষ্ণকান্ত একজন মেয়ে গায়েনাকোলজিস্টকে সাপ্তাহিক চুক্তিতে নিয়োগ করলেন, সে এসে প্রতি রবিবার রেমিকে দেখে যায়। পুষ্টিকর খাবার, ওষুধপত্র ইত্যাদির এক বেশ রাজসূয় আয়োজন হল! তাকে নিয়ে ছোটখাটো একটা হইচই!
