কার পাপ?
এ বাড়ির। এই তো শুনছি বাড়ির বউয়ের সঙ্গে নাকি উকিলবাবুর কী একটা কেলেঙ্কারি।
কারা বলছে?
সবাই। কে না জানে! শহরে ছি ছি পড়ে গেছে। সেই ভয়েই ছেলের বউকে নিয়ে কর্তাবাবু পালালেন নাকি?
হতে পারে।
ভাল। খুব ভাল।
রঙ্গময়ী গিয়ে বাড়ির কর্তৃত্ব নিল। এ ব্যাপারে তার অধিকার যে প্রশ্নাতীত তা সবাই জানে। রঙ্গময়ীকে এ বাড়ির দাসদাসী কর্মচারী সবাই মানে এবং যথেষ্ট ভয় খায়। ঘরে ঘরে তালা লাগানো ছিলই। তবু রঙ্গময়ী সব টেনেটুনে দেখল। বিশাখার ঘরে আর-একটা চৌকি আনিয়ে নিজের বিছানা করাল।
বিশাখা শুয়ে একটা গল্পের বই পড়ছিল। বলল, কৃষ্ণকে আনাবে নাকি বার-বাড়ি থেকে?
হ্যাঁ, ছেলেটা বড় পর-পর ভাব করছে আজকাল।
তুমিই তো পোকা ঢুকিয়েছ।
তাই হবে।–বলে রঙ্গময়ী অভিযোগটা মেনে নিল।
কিন্তু বিশাখার মুখ-চোখে রাগ বা বিরক্তি নেই। বরং একটু কৌতুক ঝিকমিক করছে। বইটা মুড়ে রেখে সে উঠে বসে বলল, আমার মাথাতেও পোকাটা ঢোকাবে, পিসি?
কীসের পোকা! কী যা তা যে বলিস!
ঢং কোরো না, পিসি। গোপনে-গোপনে তুমি যে স্বদেশিদের দলে তা আমি জানি।
স্বদেশি করতে তুই আবার আমাকে কবে দেখলি? মরণ!
সব জানি, পিসি। আমাকেও ওই দলে ঢুকিয়ে দাও।
দলের খোঁজ আমি রাখি না।
মাকালু গদাই ওরা সব তবে ঘুরঘুর করে কেন তোমার কাছে?
ওরে চুপ, চুপ! ওসব উচ্চারণ করতে নেই।
তবে যে বললে খোঁজ রাখো না!
আর জ্বালানি। ওরা আসে কে বলল তোকে?
আমি বারান্দার কোণ থেকে দেখতে পাই।
খবরদার, বাপের কানে কথাটা তুলিস না। একে তো শশীর ব্যাপারে জড়িয়ে পড়ায় চিন্তায় অস্থির, এসব শুনলে শয্যা নেবে।
বাবাকে বলব আমি অত বোকা নাকি? কিন্তু তোমারও সাহস কম নয়। এসব করছ কেন বলো তো!
এমনি কি করি? ছেলেগুলো মাঝেমধ্যে দিদি বলে এসে দাঁড়ায়।
কী বলল তুমি ওদের?
কিছু বলি না। এমনি খোঁজ খবর নিই, কোথায় কী হচ্ছে।
ওরা তোমাকে স্বদেশি বলে চিনল কী করে?
ফের স্বদেশি বলছিস, মুখপুড়ি?
আচ্ছা বলল, চিনল কী করে?
শশী আসার পর থেকেই। ওরা ধরে নিয়েছে ওদের দলে।
ধরা যখন পড়বে তখন টেরটি পাবে তুমি।
রঙ্গময়ী তার ধারালো মুখে একটু হেসে বলল, আমার আর কীসের ভয় রে!
ওসব করো কেন? করতে ভাল লাগে?
সময়টা তো কাটাতে হবে। বড় লম্বা পরমায়ু আমার। সহজে ফুরোবে বলে মনে হয় না।
আমাকেও একটু স্বদেশি করতে দাও না!
কেন? তোর আবার এসব শখের কী হল?
আমারও যে লম্বা পরমায়ু কাটাতে হবে। কিছু করেই সময়টা কাটাই।
তার দরকার নেই। ভাল পাত্র দেখে বাপ বিয়ে দিয়ে দিক।
বিয়ে! খেপেছ পিসি?
কেন? করবি না?
মাথা নেড়ে বিশাখা বলল, কক্ষনও নয়। তোমার মতো থাকব।
তা কেন? আমার জীবনটা কি খুব সুখের?
খুব সুখের, পিসি। বেশ আছ তুমি।
দূর পাগল! রাগ থেকে ওসব বলছিস।
মোটেই নয়। মাঝে মাঝে রাগ করি তোমার ওপর সে অন্য কারণে, কিন্তু তোমাকে ভালবাসি না? বলো!
রঙ্গময়ীর চোখে জল এল এ কথায়। কিন্তু দুর্বলতাটা প্রকাশ হতে দিল না। মুখে হাসি টেনে বলল, তা বাসবি না কেন? কিন্তু বিয়েতে অনিচ্ছেটা তো ভাল কথা নয়।
বিশাখা ঠোঁট উলটে বলল, যা সব দেখছি তাতে আর বিয়ের কথা ভাবতেও ইচ্ছে করে না।
কী দেখলি আবার?
বৃন্দাবন লীলা। কেন, তুমিও কি দেখছ না? ঢং কোরো না, পিসি।
রঙ্গময়ী কথাটা ঘোরানোর জন্য বলে, স্বদেশি করার কেন শখ হল বল তো!
এমনি। কিছু নিয়ে থাকি।
কিন্তু শশিভূষণকে তো তুই সহ্যই করতে পারতি না। রোগা-ভোগা ছেলেটা দুদিন ছিল, তুই খুব রাগ করছিলি তার ওপর।
ভারী আনমনা হয়ে গেল বিশাখা। তারপর বলল, করতাম নাকি? তখন বোধহয় ব্যাপারটা বুঝতে পারতাম না।
আজ পারিস?
পারি।
ছাই পারিস। এখন থেকে রোজ খবরের কাগজ পড়বি। তাতে দেশের হালচাল কিছু বুঝতে পারবি। দেশকাল সম্পর্কে একটু ধারণা না হলে কি এমনি-এমনি স্বদেশি করা যায়?
বেশ তো। পড়ব।
রোজ কিন্তু।
হ্যাঁ গো। এখন একটা গল্প বলো।
ধাড়ি মেয়ে গল্প শুনতে চাস কেন? এখনও কি ছোট আছিস?
আছি। অন্তত তোমার কাছে।
বলব। রাত্রে। এখন যাই, গিয়ে ছেলেটাকে নিয়ে আসি।
নিয়ে এসো, পিসি। ও কেমনধারা যেন হয়ে গেল। আগের মতো ঝগড়া করে না, আদর খায়। । কেমন গম্ভীর বয়স্ক বয়স্ক ভাব। ওর দিকে তাকালে আমার কান্না পায়। কী হল বলল তো!
কিচ্ছু হয়নি। বড় তো হচ্ছে।
ধ্যুৎ, কী যে বলো তার ঠিক নেই। কত আর বয়স হয়েছে? এখনও গাল টিপলে দুধ বেরোয়। চলো ওকে ধরে আনি দু’জনে। কদিন তিনজনে মিলে এ ঘরে খুব আড্ডা হবে।
রঙ্গময়ী একটা শ্বাস ফেলে বলে, আড্ডা দেওয়ার ছেলেই কিনা! আসতেই চাইবে না হয়তো।
কেন আসবে না?
মেয়েদের সঙ্গ বর্জন করছে যে।
আমরা আবার মেয়ে নাকি! একজন দিদি, অন্যজন পিসি। দাঁড়াও ওর বায়ু আজ ছোটাব।
মা, ওসব জোর-জবরদস্তি ভাল নয়। ওর মধ্যে একটু আগুন আছে। সেটা নিবিয়ে দিস না। যদি আসতে না চায় তবে জোর করার দরকার নেই।
আমার যে ওর জন্য ভীষণ কষ্ট হচ্ছে।
হোক। কষ্টটা সহ্য কর। পিঠোপিঠি বড় হয়েছিস কষ্ট তো হবেই। বিয়ে হলেও তোতা ভাইকে ছেড়ে থাকতে হত!
বিশাখা প্রতিবাদ করল না। চুপ করে বসে রইল।
দুপুরে বিশাখার ঘরে রঙ্গময়ী একটু চোখ বুজেছে। বিশাখা ঘর থেকে বেরিয়ে এল। সিঁড়ি দিয়ে নেমে বার বাড়িমুখো হাঁটতে হাঁটতে সে নানা কথা ভাবছিল। তার জীবনটা শুধু দুঃখের নয়, ভারী অপমানেরও। এত অপমান সয়ে সে বেঁচে আছে কী করে? যে লোকটা তাকে বিয়ে করার জন্য আগ্রহী ছিল আজ সে মুখের ওপর জবাব দিচ্ছে! ভারী আশ্চর্য। সেই লোকটাই আবার সাতবুড়ির এক বুড়ি দুই ছেলেমেয়ের মা এক সধবার প্রেমে পড়ে হাবুডুবু খাচ্ছে। এসব ভাবলে পাগল পাগল। লাগে ভিতরটা। বিশাখা দিশাহারা হয়ে যায়। তার সমস্যা শুধু এটুকুই নয়। আজও বিশাখা বুঝতে পারছে না কোনও পুরুষের ঘর সে সত্যিই করতে পারবে কি না। কাউকে তার সত্যিই পছন্দ হবে কি না কোনওদিন। এক সময়ে হাড়-হাভাতে শশিভূষণকে সে দু’চোখে দেখতে পারত না। আজকাল তার কথা ভাবতে ভাল লাগে। শচীনকে এক সময়ে সইতে পারত না সে। আজকাল শচীনকে দেখলে বুক দুর দুর করে। কোকাবাবুর নাতিকে কি তার সত্যিই পছন্দ ছিল? এখন সে ঠিক করে বলতে পারবে না। বিশাখা মাঝে মাঝে ভাবে, সে বোধহয় সত্যিই পাগল।
