তোমার পেটে এখন কোনও বাচ্চা নেই, রেমি। শুনতে পাচ্ছ না?
কী শুনব?
হেঁড়া নাড়ি দিয়ে রক্তের স্রোত বয়ে যাচ্ছে! শুনছ?
হ্যাঁ। ও, তাই তো! বাচ্চাটা ! সে কি আছে?
০৬৫. শশিভূষণের মামলা
এমনিতে শশিভূষণের মামলায় জড়িয়ে পড়ার ইচ্ছে তো হেমকান্তর ছিল না। গ্রহদোষই হবে। ছোরা তাঁর বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিল। পুলিশ ধরেই নিয়েছে, হেমকান্ত এই বিপজ্জনক খুনিকে পুলিশের হাত থেকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছিলেন। কথাটা সত্য না হলেও বিশ্বাস করবে কে? দারোগা রামকান্ত রায় আর শশিভূষণের ব্যাপারে হেমকান্তর লিখিত বিবৃতির জন্য চাপাচাপি করেনি। এ লক্ষণটাও ভাল নয়। পুলিশ চুপচাপ তার মানে তলায় তলায় জল ঘোলা হচ্ছে। শশিভূষণের মামলায় সম্ভবত হেমকান্তকে টানা হবে। আর সেইজন্যই তাঁর বরিশাল যাওয়া। বিচক্ষণ ও করিকর্মা শচীন সঙ্গে থাকলে হেমকান্ত অনেকটা নিশ্চিন্ত থাকতে পারতেন। শচীন যদি না যায় তবে সঙ্গে কাকে নেবেন তাও হেমকান্ত স্থির করতে পারছেন না। একা বরিশাল গিয়ে অনভিজ্ঞ তিনি কীই-বা করতে পারেন?
এইসব চিন্তা তাকে অস্থির করে তুলছিল। পুত্রবধু এবং শচীনের কুৎসিত সম্পর্কটাও তার এক কঠিন সমস্যা। এ সময়ে সুনয়নীর অভাব তিনি বড় বেশি টের পাচ্ছেন। সে যে খুব বুদ্ধিমতী ছিল এমন নয়, তবে এসব ক্ষেত্রে মেয়েদের একটা নির্দিষ্ট ভূমিকা আছে। মনু বুদ্ধিমতী ঠিকই, কিন্তু হেমকান্তর অন্দরমহলে তো তার অধিকার নেই। সে কতটুকুই বা করতে পারে?
রাত্রিতে খেতে বসে কিছুই তেমন খেতে পারছিলেন না। ভারী অন্যমনস্ক।
রোজকার মতোই চপলা সামনে বসে আছে। অনেকক্ষণ শ্বশুরের অন্যমনস্কতা লক্ষ করে হঠাৎ জিজ্ঞেস করল, কী নিয়ে এত ভাবছেন, বাবা?
ভাবছি কাল বরিশাল যেতে হবে, কিন্তু কোনও প্রস্তুতি নেই।
বরিশাল! কালই কেন? কোনও জরুরি দরকার?
কাল না গেলেও হত। কিন্তু শশিভূষণের মামলা উঠল বলে। বেশি দেরি করা ঠিক হবে না। এখন থেকে উকিল-মোক্তারের ব্যবস্থা না করলে বিপদ। পুলিশ তো আমাদেরও জড়াবে।
চপলা বিস্মিত হয়ে বলে, উকিল তো আছেই। শুনেছিলাম শচীনবাবুই নাকি কেস নেবেন।
চপলার মুখে শচীনবাবু শুনে হেমকান্ত এক ঝলক চপলার মুখের দিকে চেয়ে দেখলেন। না, কোনওরকম বৈলক্ষণ্য নেই। হৃদয়গত দুর্বলতা থাকলে এত সহজে নামটা উচ্চারণ করতে পারত না। হৃদয়দৌর্বল্যের ব্যাপারটা হেমকান্ত ভালই বুঝতে পারেন আজকাল। হেমকান্ত মাথা নেড়ে বললেন, কথা তো ছিল, কিন্তু সে আজ বলে দিয়েছে, যেতে পারবে না। হাতে নাকি অনেক মামলা।
চপলা চুপ করে রইল কিছুক্ষণ। তারপর বলল, বরিশালে আমার বাবার এক বন্ধু থাকেন। সুধাকাকা। ভাল উকিল। তাকে দিয়ে কি হবে?
হেমকান্ত মুখ তুলে বলেন, স্থানীয় লোক পেলে তো সুবিধেই হয়। তবে পরিচয় তো নেই। তাছাড়া শশিভুষণ আমার বাড়িতে ছিল, সুতরাং এখানকার সব ঘটনা না জানলে তো তিনি আমার হয়ে লড়তে পারবেন না।
আপনি কী চান, বাবা? শশিভূষণকে বাঁচাতে?
টেররিস্টদের আমি পছন্দ করি না। কিন্তু শশীকে বাঁচানো দরকার আমাদেরই স্বার্থে। হয় প্রমাণ করতে হবে যে আমরা না জেনে তাকে আশ্রয় দিয়েছি, নয় তো সে খুনের জন্য দায়ী নয়।
একটা কাজ করব?
কী করতে চাও?
আমি যদি আপনার সঙ্গে যাই?
তুমি!—বলে হেমকান্ত বিস্মিত চোখে তাকালেন। পথি নারী বিবর্জিতা আপ্তবাক্যও তার মনে পড়ে গেল। মেয়েদের নিয়ে চলাফেরার অভ্যাসও তার নেই। তবু চপলার এই প্রস্তাবটা হঠাৎ মন্দ লাগল না।
একটু দোনামোনা করছিলেন দেখে চপলা বলল, সুধাকাকা খুব বড় উকিল। তার চেয়েও বড় কথা উনি একটু স্বদেশি ঘেঁষা। আমরা তার বাড়িতেও উঠতে পারব।
হেমকান্ত ইতস্তত করে বলেন, তাঁর বাড়িতে? সঙ্গে দু’জন চাকর যাবে, দুটো বাচ্চা, তুমি আমি সব মিলিয়ে যে মেলা লোক।
চপলা একটু হেসে বলল, ও নিয়ে আপনি ভাববেন না, বাবা। সুধাকাকার বিরাট বাড়ি, খুব বড়লোক। আমরা গেলে খুশিই হবেন।
হেমকান্ত একটু হাসলেন। বললেন, আমি তো ভাবছিলাম সবিতার শ্বশুরকে শেষ অবধি গিয়ে ধরব। তবে মেয়ের বাড়িতে ওঠার ইচ্ছে ছিল না।
ওরা তো ঠিক শহরে থাকে না বাবা, আপনার সুবিধে হত না।
হেমকান্ত একটু নিশ্চিন্তের হাসি হেসে বললেন, তা হলে চলো। ভালই হবে। তবে এ সময়টা খাল নদী সব ভরভরন্ত, বর্ষাটাও জোর গেছে, বরিশালের রাস্তা কি নিরাপদ হবে মা তোমাদের পক্ষে?
অত ভাববেন না। বরিশালের লোকেরা তো যাতায়াত করছে।
তা বটে। তা হলে গোছগাছ করে নাও।
পরদিন প্রায় কাউকেই না জানিয়ে, একরকম চুপিসারেই হেমকান্ত বরিশাল রওনা হলেন। সঙ্গে চপলা, দুই ছেলেমেয়ে। দু’জন শক্তসমর্থ চাকর এবং একজন মুনশি।
বাড়ির আশ্রিত ও কর্মচারীরা সবাই হেমকান্তর এই সদলবলে রওনা হওয়ার দৃশ্যটা দেখল কিন্তু কেউ ভিতরকার ব্যাপারটা জানল না।
বিনোদচন্দ্র দুপুরবেলায় রঙ্গময়ীকে জিজ্ঞেস করলেন, ওঁরা গেলেন কোথায়?
তার আমি কী জানি!
তোকে বলেনি?
আমাকে বলবে কেন?
বিনোদচন্দ্র মেয়েকে ভয় করেন। রঙ্গময়ী বড় স্পষ্ট কথা বলে। তাছাড়া এই মেয়েটির কাছে তাঁর এক ধরনের অপরাধবোধও আছে। বিয়ে দিতে পারেননি বলে। তাই স্তিমিত স্বরে বললেন, তোকে তো কর্তা সবই জানান।
যদি জানিয়েই থাকে তবে তা রটানোর জন্য নয়।
রটানোর কী আছে?
কিছু আছে, বাবা। আপনি সব বিষয়ে মাথা ঘামাবেন না।
বিনোদচন্দ্র ভালই জানেন, রঙ্গময়ীর সঙ্গে হেমকান্তর একটু গোপন সম্পর্ক আছে। তাতে রক্ষা। নইলে এ বাড়ি থেকে এতদিনে উচ্ছেদ হতে হত। মাথা নেড়ে বিজ্ঞের মতো বললেন, রন্ধ্রে রন্ধ্রে পাপ, রন্ধ্রে রন্ধ্রে পাপ।
