ঠিকানাটা দাও।
আমি নিয়ে যাব।
তুমি ওর সঙ্গে শুয়েছ?
কী হবে জেনে? পুরুষদের তো সতীত্ব নষ্ট হয় না।
আমি জানতে চাই। বলো।
এইরকম রুদ্ধশ্বাস কথাবার্তার মধ্যেই ধ্রুব রেমিকে বিছানায় নিয়েছে। তাদের রাগ, উত্তেজনা, আক্রোশ আর ঘৃণা সব কিছুই একটা রন্ধ্র খুঁজছিল। বেরোবার পথ না পেলে দু’জনেরই ভিতরে তা টগবগ টগবগ করে ফুটতে থাকত অনেকক্ষণ। দু’জনেই সেই পথ পেয়ে গেল দু’জনের শরীরে।
এমন আদর, এত ভালবাসাবাসি বহুকাল হয়নি তাদের। উম্মত্তের মতো, জ্বালাময় তীব্রতার সঙ্গে তারা আঁকড়ে ধরল পরস্পরকে। অথচ বোঝা যাচ্ছিল, শরীরের এই মিলন দুজনের মধ্যে সেতুবন্ধ তৈরি করছে না। একটু ফাঁক থেকে যাচ্ছে কোথাও।
আনন্দের একটা ক্ষণস্থায়ী শিখর থেকে নেমে এসে অবসন্ন দুটি শরীর যখন পড়ে ছিল পাশাপাশি তখন রেমি হাত বাড়িয়ে ধ্রুবর চুলের মুঠি নরম হাতে ধরে নিজের দিকে টেনে আনল।
বলো। শুয়েছ?
সত্যি কথা সইতে পারবে?
সেটা আমি বুঝব। তুমি বলো।
একটু রহস্য থাক না।
না, থাকবে না।
তোমাকে সব কথা বলতে হবে এমন প্রতিজ্ঞা কি বিয়ের সময় করেছি?
না করলেও আমি তোমার বউ তো! আমার কিছু অধিকার আছে তোমার ওপর। আমি জানতাম তোমার সবটুকুই আমার। হয়তো ভুল জানতাম। কিন্তু তবু আমার সম্পত্তিতে কেউ ভাগ বসিয়েছে কি না সেটা না জানলে আমার শান্তি নেই।
জানলে কি শান্তি হবে? যদি জ্বালা আরও বাড়ে?
তবু জানতে চাই।
শোনো, রেমি! তোমাকে তো বোঝনোর চেষ্টা করলাম যে, শরীরের দোষ নেই। যেসব মেয়েরা রেপড় হয় তারা তো নিজের ইচ্ছেয় হয় না। সমাজও তাদের প্রতি সিমপ্যাথেটিক। তুমি বরং খোজ নিয়ে দেখো, আমার মন আর কেউ দখল করেছে কি না। সেটা অনেক বেশি বিপজ্জনক।
ওর আগে শরীরের কথাটাই বলো।
শুনবেই?
শুনবই।
তা হলে বলি, হ্যাঁ। কয়েকবার।
রেমি কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে রইল। তারপর ঠান্ডা স্বরে বলল, তোমার ঘেন্না করল না?
তোমার করে?
আমার!—রেমি অবাক হয়ে তাকায়।
রাজা যখন–!
রেমি লজ্জায় রাঙা হয়। তারপর বলে, তুমি আমাকে বিশ্বাস করো?
করি। কারণ তুমি খুব ভাল মিথ্যেবাদী নও।
আমাকে রাজা কয়েকবার চুমু খেয়েছে কিংবা বলা ভাল খাওয়ার চেষ্টা করেছে। আমি জানি তুমি জেলাস নও। তবু বলি, আমার কিন্তু ঘেন্না হয়েছে। ভীষণ।
আর আজ?
আজ তোমার ওপর রাগ করে আমি একটা যাচ্ছেতাই কাণ্ড করতে যাচ্ছিলাম ঠিকই। কিন্তু যদি ঘটনাটা ঘটত তবে নিশ্চয়ই আমি গলায় দড়ি দিতাম।
ধ্রুব একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তারপর খুব ধীরে ধীরে রেমির নগ্ন শরীরে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলল, একথাটা তোমার কাছে সত্যি বলে মনে হয়?
কোন কথাটা?
এই যে রাজার ওপর তোমার ঘেন্না?
সত্যি নয়! তুমি আমাকে কেন বিশ্বাস করো না বলল তো!
কারণ ঘেন্না যে যুক্তিসিদ্ধ নয়, রেমি। যে-কোনও মেয়েকেই আকর্ষণ করার মতো গুণ আছে রাজার। হি ইজ হ্যান্ডসাম, ভাল গায়, স্মার্ট।
সব ঠিক। তবু আমার ওরকম হয়।
হয়? আমাকে ছুঁয়ে বলো।
একটু দ্বিধা করে রেমি। বলে, ছুঁয়ে কেন?
দিব্যি দেওয়ায় আমার বিশ্বাস নেই, কিন্তু তোমার আছে। তাই দিব্যি দিচ্ছি। আমার দিব্যি, সত্যি বলো।
রেমি কুণ্ঠিত হাত বাড়িয়ে তার গলাটা জড়িয়ে ধরল। তারপর গভীর চুমু দিল ঠোঁটে। সঁতের দাগ বসিয়ে দিল। দিতে দিতে কাঁদতে লাগল ফুলে ফুলে।
কাঁদছ কেন?
তুমি আমার এমন সর্বনাশ করতে গেলে কেন? আমাকে দু’ভাগ করে দিয়ে তোমার কী লাভ?
এটাও এক্সপেরিমেন্ট, রেমি।
কীসের এক্সপেরিমেন্ট?
আমি বিয়েতে বিশ্বাস করি না, সতীত্বে বিশ্বাস করি না, কোনও পুরনো প্রথাকেই মানি না। আমি তোমার মধ্যে কিছু সেকেলে পতিপরায়ণতা লক্ষ করেছিলাম। মনে হয়েছিল, এটা একটা সংস্কার মাত্র। কিন্তু ভাঙা যায়। তাই তোমাকে রাজার দিকে ঠেলে দিয়েছিলাম, রেমি। শুধু দেখতে চেয়েছি কতক্ষণ তুমি রেজিস্ট করতে পারো।
শুধু এক্সপেরিমেন্ট? আমি তোমার গিনিপিগ?
গিনিপিগ কে নয়?
ঠিক আছে। এক্সপেরিমেন্টের ফলটা কী হল?
দেখলাম, তুমিও রেজিস্ট করতে পারলে না।
পেরেছি।
ধ্রুব মাথা নেড়ে বলে, পারোনি। রাজার ভাগনি আর দিদি ছিল বলে বেঁচে গেছ। নিজের ইচ্ছেয় প্রতিরোধ করোনি। পারতেও না, রেমি।
রেমির কান্নার বেগ বাড়ল।
ধ্রুব তাকে বুকে টেনে নিল। খুব খুব আদর করল তাকে। বলল, শোনো রেমি, তুমি মানুষ। মানুষ কখনও কি বিগ্রহ হয়? পাথর তো নয় সে।
এসব কী বলছ আমি যে বুঝতে পারছি না।
পারার দরকার নেই। এসো।
এই বলে ধ্রুব রেমিকে প্রায় পিষে ফেলতে লাগল নিজের শরীরের সঙ্গে।
এখন এক কুয়াশাচ্ছন্ন উপত্যকায় দাড়িয়ে রেমি যখন চারদিককার মায়াবী হলুদ আললাটির উৎস খুঁজছে তখন একটা কালো পাখি উড়ে গেল মাথার ওপর দিয়ে আর তীব্র কর্কশ স্বরে বলে গেল, খাঃ! খাঃ!
কী সর্বনেশে ডাক! ও বাবা।
ওগো!-রেমি ডাকল।
চারদিককার ন্যাড়া পাথুরে পাহাড়ের অবরোধ। কে যেন প্রতিধ্বনির মতো জবাব দিল, কী বলছ?
পাখিটা কী বলে গেল!
কী বলে গেল?
খা! কী খেতে চায় ও?
তোমার ভয় কীসের?
আমার পেটে যে বাচ্চা! ভয় করে।
বাচ্চা!
হ্যাঁ গো! সেই যে আমাদের ভালবাসাবাসি হয়েছিল একদিন! মনে নেই?
কবে?
অনেকদিন আগে। আমার তো ভালবাসার কপাল নয়! তবু একদিন হয়েছিল। কাঙালের মতো শুষে নিয়েছিলাম একদিনের সেই ভালবাসা। সেইটেই পেটের মধ্যে আমার বাচ্চা হয়ে এসেছে যে।
পাখিটা কী বলে গেল তোমাকে?
খা! আমার ভীষণ ভয় করে। আমার যে একটা নষ্ট হয়ে গেছে।
