ধ্রুব তার মাথায় সস্নেহে একটু হাত বুলিয়ে দিয়ে বলে, চালাকি করছ?
কীসের চালাকি?
ছলে-ছুতোয় আমার সঙ্গে লেগে থাকতে চাও!
ছল-ছুতো কেন হবে? প্রোপোজালটা তুমি দিয়েছিলে।
দিয়েছিলাম। কিন্তু এখন দেখছি তোমার দ্বারা লিভিং টুগেদার সম্ভব নয়। ও একটা আলাদা দৃষ্টিভঙ্গি, আলাদা দর্শন। নিজের প্রাক্তন স্ত্রীর সঙ্গে লিভিং টুগেদার হয় না।
আমি পাগল হয়ে যাব। আমাকে ছেড়ো না।
তুমি কী করে ওরকম সম্পর্ক অ্যাকসেপ্ট করবে বলে তো! তুমি তো আজ পর্যন্ত আমাকে নাম ধরেও ডাকতে পারোনি। পারবে?
তোমার জন্য আমি সব পারি।
আচ্ছা, ডাকো তো!
নাম ধরে? ধ্রুব!
ও কি ডাকা হল? শুধু উচ্চারণ করলে।
আস্তে আস্তে হবে। দেখো।
হবে না। কিছুতেই তোমার হবে না। তোমার সেই মানসিকতা নেই।
সেটাও হবে। তুমি শিখিয়ে নিয়ে।
শেখানোর কিছু নেই। বললাম তো ওটা একটা মানসিক গঠন।
তুমি কি ওই মেয়েটাকে ভালবাসো?
কোন মেয়েটাকে?
ওই যে, আমি চলে গেলে যাকে নিয়ে তুমি থাকতে চাও।
ধ্রুব রেমিকে কেন যে একটু গাঢ় করে চেপে ধরল একথা শুনে তা বলা মুশকিল। কিন্তু ধরল। তারপর বলল, ওটাও আমার একটা এক্সপেরিমেন্ট, রেমি। তুমি ঠিক বুঝবে না।
আমি ওকে একবার দেখব। কতবার বলেছি। একটু দেখাবে?
এই প্রসঙ্গটায় ধ্রুব ভারী অস্বস্তি বোধ করে, লক্ষ করেছে রেমি। ধ্রুব তাকে তেমনি কটকটে করে চেপে ধরে থেকে বলে, না। দরকার নেই।
কেন নেই?
তোমার সঙ্গে ওর তুলনা করার কিছু নেই!
ও কেমন?
ওর মতো।
রেমির ফের রাগ হল। হিংসে হল। সে জানে ধ্রুবকে সে পায়নি। সেটা মেনে নেওয়া গিয়েছিল। কিন্তু আর-কেউ ধ্রুবকে পেয়েছে এটাও বা সে মানে কী করে? মাথাটা পাগল-পাগল হয়ে যায় তার। পায়ের তলা থেকে মাটি সরে যেতে থাকে। খুন করতে ইচ্ছে করে। আগুন লাগাতে ইচ্ছে করে।
রেমি আচমকাই ধ্রুবর আলিঙ্গন ভেঙে ফণা তুলল, আমি আর সহ্য করব না। বুঝলে! আর সহ্য করব না। ও কোথায় থাকে বলে! নাম কী?
ধ্রুব মাথা নেড়ে বলল, ওরকম প্রগম্ভ হোয়ো না। আমি তো কিছু লুকোইনি। লুকোবার কিছু নেইও।
তবে ওর ঠিকানা দাও।
কেন? গিয়ে হামলা করবে নাকি?
না। কিছু করব না। ভয় নেই। ঠিকানাটা দাও।
ওর কোনও দোষ নেই। ওর ঠিকানা দিয়ে কী হবে? দোষ তো আমার। যদি দোষ বলে মনে। করা যায়।
দোষ নয়?
আমার কাছে নয়। আমি অন্যভাবে ভাবতে শিখছি।
রেমি দর্শন বোঝে না। তার নিজস্ব কোনও দৃষ্টিভঙ্গি বা জীবনদর্শন নেইও। ধ্রুবর মানসিকতাও তার কাছে রহস্যময়। কিন্তু সে নিজস্ব অধিকারবোধ বোঝে। সে বুঝল, এখন যদি জোর খাটানো না যায় তবে সব হারিয়ে ফেলবে সে। শুধু কায়ায় তো হবে না।
রেমি তীব্র স্থির চোখে ধ্রুবর দিকে চেয়ে থাকে বলল, আমি মরলে তুমি খুশি হও? অনেক সমস্যার সমাধান হয়ে যায় তা হলে! তাই না?
না। সব সমস্যাই থেকে যায়। বরং আরও জটিল হয় ব্যাপারটা। কিন্তু মরার কথা ভাবছ কেন?
তুমি কি জানো, যে অবস্থায় আমি আছি তাতে অনেক আগেই আমার মরা উচিত ছিল?
না। এরকম কোনও সিচুয়েশন তৈরি হয়নি।
হয়নি একজন মাত্র মানুষের জন্য। তিনি শ্বশুরমশাই। তিনি না থাকলে আমাকে মরতেই হত।
ধ্রুব একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, তিনি না থাকলে অনেক সমস্যা তৈরিই হত না, রেমি। এমনকী তোমার সঙ্গে আমার বিয়েটাই হত না।
সেটা হয়তো ঠিক। কিন্তু উনি আমার জন্য যা করেছেন তা বাবাও করেনি।
একজন মানুষকে আমরা দু’জন দুটো অ্যাঙ্গেল থেকে দেখছি, রেমি। তোমার সঙ্গে আমার মিলবে না। তবু বলি, যদি ওর জন্যই তোমার মরা না হয়ে থাকে তবে ওর জন্যেই বেঁচে থাকো। আমার কাছে কিছু প্রত্যাশা কোরো না।
তবে আমার বেঁচে থাকাটা চাইছ কেন?
মরাটাও তো মিনিংলেস। ওটা তো কোনও সমাধান নয়।
কেন সমাধান হবে না? আমি মরলে আমার সমস্যা মেটে। তোমারটা হয়তো মেটে না।
দাঁড়াও। আমার মাথায় এখন কোনও লজিক কাজ করছে না।
কোনওদিনই করে না। কিন্তু তুমি আমার মরাটা চাইছ।
কবে চেয়েছি?
রোজ চাইছ। নানাভাবে বুঝিয়ে দিচ্ছ যে, আমাকে তোমার প্রয়োজন নেই। বউকে অন্যের ঘরে পৌঁছে দিতে চাইছ আপদ বিদেয় করার জন্য, এত ঘেন্না আমাকে তোমার। কিন্তু কেন? ওই মেয়েটার জন্য? কতদিন ধরে ওর সঙ্গে সম্পর্ক তোমার?
আঃ, বাজে বোকো না।
আজকাল তুমি আমার শরীর ছুঁতে চাও না। কেন বলো তো! ঘেন্না?
রেমি! চুপ করো।
রেমি আঁচলটা ফেলে দেয়। খুব দ্রুত হাতে নিরাবরণ হতে হতে রুদ্ধশ্বাসে বলে, দেখো দেখো, আমি তার চেয়ে কতটা খারাপ। দেখো তো চেয়ে অন্ধ, শুধু শরীরও যদি তোমার চাহিদা হত তা হলেও কি আমি ফ্যালনা! দেখো।
ধ্রুব দেখল। মাথা নেড়ে বলল, আমি তো বলিনি তুমি খারাপ!
রেমি তেমনি রুদ্ধশ্বাস উত্তেজিত স্বরে বলে, সেক্স ছাড়া অনেক বেশি কিছু দিয়েছি তোমাকে। তুমি তা বুঝলে না। ও মেয়েটা কী পারে দিতে তোমাকে? শরীর তো! তাও কি আমার সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার মতো? বলো!
ধ্রুব রেমিকে ধরে টেনে আনে কাছে, পাগলি হয়ে যাচ্ছ নাকি?
আমার কি নরম্যাল হওয়ার কথা? এত কিছুর পরেও?
ধ্রুব একটা দীর্ঘ চুম্বন দিল তার ঠোঁটে। বলল, তোমার কি জ্বর হয়েছে? শরীরটা বড্ড গরম। শাস জোরে করো!
ছাড়ো আমাকে।–খুব ক্ষীণ গলায় বলে রেমি।
ছাড়ব? সত্যিই চাও ছেড়ে দিই?
চাই। তুমি বদমাশ।
সে তো পুরনো কথা। তবু তো ছাড়তে চাও না আমাকে।
ছাড়ো। আমি সেই মেয়েটার কাছে যাব।
যেয়ো। তাড়া কীসের?
