তা হলে?
ওকে সঙ্গে নিয়ে তুমি নিজে যাও। আমি?
হ্যাঁ। তুমি গেলে হয়তো চক্ষুলজ্জায় আপত্তি করবে না। ওর ওপর ছেড়ে দিলে যাব-যাচ্ছি করে সময় কাটাবে, অজুহাত দেবে।
কিন্তু শশিভূষণ আমাদের কে বলল!
এমনিতে কেউ নয়। কিন্তু তোমার বাড়িতে ছিল। পুলিশ তো তোমাকে ছাড়বে না।
হেমকান্ত অনেকক্ষণ ভাবলেন। তারপর দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন, তোমার বাস্তববুদ্ধি আমার চেয়ে বেশি। আমি তোমার প্রস্তাব মেনে নিলাম। যাব।
গেলে দেরি কোরো না।
কেন? এত তাড়া কীসের?
তুমি যখন থাকবে না তখন আমি বড়বউকে কলকাতায় পাঠাননার চেষ্টা করব। এখন পাঠালে গণ্ডগোল হবে। আমার বিশ্বাস, বড়বউ কলকাতায় গেলে শচীন তার পিছু নেবে।
না, আমি কালই যাব। শচীনকে ডেকে পাঠাচ্ছি আজ বিকেলে।
তবে আমি যাই?
এসো গিয়ে।
রঙ্গময়ী চলে গেলে হেমকান্ত অনেকটা সময় কাটালেন প্রচণ্ড অস্থিরতার মধ্যে। বিকেলে শচীন কাছারিতে এলে ডেকে পাঠালেন।
শচীন, শশিভূষণের কেসটার জন্য আমাদের একবার বরিশাল যাওয়া দরকার।
শচীন ভ্রু কুঁচকে বলল, বরিশাল! কিন্তু আমার যে এখানে অনেকগুলো মামলা হাতে রয়েছে।
শশিভূষণের মামলায় উকিল তো দিতেই হবে।
শচীন একটু ভেবে বলে, আমি আর-একজনকে ঠিক করে দেব।
আর একজন! সেটা কি ভাল হবে?
কেন হবে না? ভাল উকিলের কি অভাব আছে?
হেমকান্ত কী বলবেন ভেবে পেলেন না। খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, তোমার সঙ্গে আমার কথা হয়েছিল, শশীর মামলা তুমিই লড়বে। নতুন উকিলকে ব্যাপারটা বোঝাননা সময়সাপেক্ষ। একটু ভেবে দেখো যদি সম্ভব হয়। কালই আমার যাওয়ার ইচ্ছে।
আমি আপনাকে কাল জানাব। মনে হচ্ছে যাওয়া সম্ভব হবে না।
হেমকান্ত অসন্তুষ্ট হলেন। কিন্তু কিছু করারও তো নেই! বললেন, ঠিক আছে। যাও।
শচীন চলে গেল।
হেমকান্ত বুঝলেন, ব্যাপারটা সহজ হবে না। রঙ্গময়ী যত বুদ্ধিমতীই হোক, ব্যাপারটা এত সহজ সরল নয়।
০৬৪. আজ আর নেই
আজ আর নেই! আজ আর তার কোনও জোর নেই ধ্রুবর ওপর! কথাটার মানে কী? রেমি যেমন বাগে আক্রোশে আবেগে ঝাপিয়ে পড়েছিল ধ্রুবর ওপর তেমনি হঠাৎ নিবে গেল। অবশ হয়ে পড়ল।
আজ আর নেই কেন?—জল-টলটলে চোখে ধ্রুবর দিকে চেয়ে সে আকুল গলায় প্রশ্নটা করে।
ধ্রুব তার দিকে চেয়ে খুব মনোযোগ দিয়ে দেখছিল তাকে। তারপর বলল, কখনও কখনও মানুষ অধিকার হারায়। তুমিও হারিয়েছ।
কেন সেটা ব্যাখ্যা করে বলো।
অত কথা বলতে গেলে আমার নেশা ছুটে যাবে।
আমি তোমার মাথায় এক্ষুনি ঠান্ডা জল ঢেলে দেব না বললে।
ধ্রুব অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে মৃদু গলায় বলে, দু’ নৌকোয় পা দিয়ে চলার চেষ্টা করছ কেন, রেমি? আজ দুপুরের পর থেকে আমার সঙ্গে তোমার সব সম্পর্ক শেষ হওয়া উচিত।
কেন? দুপুরে কী এমন হল?
কী হয়েছে তার খবর কে রাখে বলো! কিন্তু তুমি তো তৈরি হয়েই বেরিয়েছিলে। তোমার মন ততা প্রস্তুত ছিল। শোননা রেমি, শরীরের কোনও দোষ হয় না। শরীর তো একটা নিরপেক্ষ জিনিস। মন যেভাবে চালায় সে সেইভাবে চলে। তোমার শরীরটা কী করেনি সেটা বড় কথা নয়। তোমার মন ভো টলেছে। সেটাই আসল কথা।
এ পাগলকে রেমি কী করে বোঝাবে যে, তার শরীর যদিও বা কখনও অবাধ্যতা করে, মন করতে চায় না। সে মাথার মধ্যে একটা পাগলামির মতো কিছু টের পাচ্ছিল। গলা দিয়ে স্বর বেরোতে চাইছে না। সে ফিসফিস করে বলল, আমার মন কখনও টলেনি। কখনও না। তুমি আমাকে জোর করে তাড়িয়ে দিচ্ছ। তুমি যে কিছুতেই আমাকে সহ্য করতে পারছ না! আমি কী করব?
তুমি কী করবে সে বিষয়ে তোমারই সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। সেটা আমি কেন স্থির করে দেব? কেনই বা এ যুগে একজন মেয়ে একজন পুরুষের ওপর এত নির্ভরশীল হবে? স্বাধীন হও রেমি, নিজের ওপর বিশ্বাস রাখতে শুরু করো। পারবে।
তুমি আমাকে বিশ্বাস করো না?
করি। কিন্তু আমার বিশ্বাসভাজন হয়ে তোমার লাভ কী? আমাকে এতটা গুরুত্বই বা দিচ্ছ কেন? আমি তোমাকে পরিপূর্ণ স্বাধীনতা দিতে চাই, বুঝছ না? বিয়ের বন্ধন নয়, ভালবাসা, বিশ্বাস, সততা এইসব কোনও শর্তই নয়। তুমি তোমার ইচ্ছেমতো চলবে, আমি চলব আমার মতো। কেউ কারও কাছে দায়বদ্ধ নই।
আমি ওরকম সম্পর্ক বুঝি না। তুমি আমার কে হবে তা হলে?
কেউ নয়। আমি একজন লোক, তুমি একজন মহিলা।
মাগো! আমি ওরকম ভাবতে পারব না।
দেখো না চেষ্টা করে। আদ্যিকালে তো এরকমই ছিল মেয়ে আর পুরুষের সম্পর্ক। তাছাড়া আমাকে নিয়ে তোমার প্রবলেমও তো নেই। তুমি রাজার সঙ্গে বম্বে চলে যাচ্ছ। তুমি যেরকম বর-বউ সম্পর্ক চাও সেটা হয়তো-বা রাজার সঙ্গে কোনওদিন গড়ে উঠবে। আমার সঙ্গে নয়।
আমি ভীষণ ঘাবড়ে যাচ্ছি। আমি পারব না।
এক্সপেরিমেন্ট করে দেখো।
রেমি শুকিয়ে যাচ্ছিল ভিতরে ভিতরে। আকণ্ঠ ভয়, পিপাসা, অনিশ্চয়তা। কাঁদতে পর্যন্ত ভুলে যাচ্ছিল সে। ধ্রুব এরকম সব আভাস অনেকদিন ধরেই দিচ্ছে বটে, কিন্তু এখন যেন তারা সত্যিই পৌঁছে গেছে পথের একেবারে শেষ মাথায়। সামনেই খাদ।
রেমি ধ্রুবর দুটো হাত ধরে টেনে নিল নিজের দিকে। নিজের শরীরে সেই হাতদুটোর বেষ্টনী দিয়ে বলল, একটু জড়িয়ে ধরে আমাকে। শক্ত করে। মনে হচ্ছে আমি অজ্ঞান হয়ে যাব। পাগল হয়ে যাব। মরে যাব।
ধ্রুব হতাশ গলায় বলে, কেন যে তোমার সংস্কারগুলো যাচ্ছে না!
রেমি ধ্রুবর বুকের মধ্যে মুখ গুঁজে শক্ত হয়ে রইল। বলল, শোনো, আমি রাজার সঙ্গে যাব না। তুমি যা চাও তাই হোক। আমাকে ডিভোর্স করো। তারপর আমরা একসঙ্গে থাকব।
