হেমকান্ত একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, সে চিন্তা কি সহজে ছাড়ে, মনু? বুড়ো হচ্ছিই তো, মরতেও হবে।
আবার ওসব কথা!
ভয় পেয়ো না। সেবার আচমকা কুয়োর বালতি জলে পড়ে যাওয়ায় একটা কেমন লেগেছিল। আজ আর সেরকম নয়। আসলে এই যে এতকাল বেঁচে রইলাম, একদিন মরেও যাব, এর অর্থটা ঠিক বুঝতে পারলাম না। কেন জন্ম হল, কেন বেঁচে থাকা, এর একটা অর্থ থাকবে তো!
সেসব ভাববার লোক আছে। তোমাকে ভাবতে হবে না।
খুব হাসলেন হেমকান্ত। তারপর মাথা নেড়ে বললেন, ভালবাসা কি এরকমই যুক্তিহীন?
কাল থেকে আর ওই ডাকাতটার সঙ্গে লাঠি খেলো না কিন্তু। বলে গেলাম।
এখুনি যেয়ো না, মনু। তোমার সঙ্গে কথা আছে।
কী কথা? তাড়াতাড়ি বলো।
অত তাড়া কেন?
বড়বউ কালীবাড়ি গেছে পুজো দিতে। এসে পড়বে।
কথাটা কৃষ্ণকে নিয়ে। তোমার কি মনে হয় ও একটু অস্বাভাবিক?
রঙ্গময়ী ভ্রু কুঁচকে বলে, ও আবার কী অলুক্ষনে কথা? অস্বাভাবিক হবে কেন?
একটু অন্যরকম মনে হয় না?
না তো! অন্যরকম কেন হবে?
ও যে একা থাকে, ব্রহ্মচর্য করে, এক বেলা খায় এসব তুমি জানো?
জানব না কেন? আমিই তো বলেছি।
তুমি বলেছ? আশ্চর্য! কেন?
তোমার আর সব ছেলে যেরকম সেরকমই ও হোক তা আমি চাইনি। তাই।
এরকম করে লাভ কী?
সহ্যশক্তি বাড়বে। মনটা ঝরঝরে হবে।
তাই বলো! আমি ভাবছিলাম, ওর মাথায় এসব পোকা ঢোকাল কে! গোপনে গোপনে স্বদেশি করছে নাকি তাই বা কে জানে! স্বদেশিওলাদের তো কাণ্ডজ্ঞান নেই। এইটুকু ছেলেকেও হয়তো হাতে বোমা দিয়ে সাহেব মারতে পাঠাবে।
রঙ্গময়ীর মুখটা সামান্য বিমর্ষ হয়ে গেল। গলাটা এক পর্দা নামিয়ে বলল, ও যদি নিজে থেকে স্বদেশি করতে চায় তবে কি তুমি বাধা দেবে?
দেব না? কী সব বলছ?
রঙ্গময়ী একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, সব কিছু কি তোমার আর আমার ইচ্ছেয় চলবে গো! এ যা যুগ পড়েছে, এর হাওয়া বাতাস গায়ে লাগবেই। কৃষ্ণ তোমার অন্য ছেলেদের মতো আঁচলধরা নয়। হয় মায়ের আঁচল, নয় তো বউয়ের আঁচল ধরে যারা টিকে আছে তাদের থেকে ওর ধাত আলাদা। স্বদেশির হাওয়া থেকে ওকে বাঁচাতে হলে তোমাকে ছেলে নিয়ে কাশীবাসী হতে হয়।
হেমকান্ত চিন্তিত মুখে রঙ্গময়ীর দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বললেন, তোমার ভিতরেও একটু স্বদেশি পোকা আছে মনু, আমি অনেকদিন আগেই টের পেয়েছি।
থাকলে আছে। কী করব বলো।
হেমকান্ত একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, আমি পৃথিবীর ঘটনা নিয়ন্ত্রণ করতে পারি না, মনু। যা হওয়ার তা তো হবেই। শুধু তোমাকে বলি, কৃষ্ণ তোমার খুব বাধ্যের ছেলে। ওকে নিজের ছেলে বলে ভেবে ওর ভালমন্দ যা হয় ঠিক কোরো।
একথার মানে কী? আমি ওকে ছেলে বলে ভাবি না নাকি?
হয়তো ভাবো। তবু বললাম। আজ কৃষ্ণ আমার কাছে জানতে চেয়েছিল কীভাবে চলবে। আমি বলতে পারিনি। যদি পারো তো তুমি বোলো।
কৃষ্ণকে নিয়ে তুমি অত ভেবো না। একটু শক্ত হও।
শক্ত হওয়া আর এ জন্মে হবে না, মনু। তাই আমি চেষ্টা করছি নিস্পৃহ হতে। কোনওরকমে চোখ কান বুজে যদি আয়ুটা পার করে দেওয়া যায়। তারপর যা হয় তোক।
বাঃ, বেশ বীরপুরুষের মতো কথা তো! সকালের সেই লাঠিয়াল কোথায় গেল? মালকোঁচা মেরে খুব যে বীরত্ব ফলাচ্ছিলে এখন সেই লোকটা কোথায়?
লাঠিবাজি কি সর্বত্র চলে, মনু? লাঠি এখন নিজের মাথায় মারতে ইচ্ছে করে মাঝে মাঝে।
আতঙ্কিত মনু বলে, কেন গো ! ও কী কথা?
হেমকান্ত অনুত্তেজিত কণ্ঠেই বলেন, আমার মনে বড় অশান্তি। চারদিকে কী যে সব হচ্ছে!
রঙ্গময়ী কিছুক্ষণ চুপ করে দাড়িয়ে থাকে। তারপর গাঢ় স্বরে বলে, তুমি ভেবো না। তোমার মনে অশান্তি হতে পারে এমন কিছু আমি হতে দেব না।
হেমকান্ত একটু হাসলেন। বললেন, আমি কি বাচ্চা ছেলে মনু, যে আমাকে ভোলাচ্ছ!
বাচ্চার বেশিও তো কিছু নও।
তাই নাকি?
তুমি সাবালক হলে আমার আর চিন্তা ছিল কী?
আমাকে নিয়ে যে ভাবছ তার তো প্রমাণ পাই না। আমার এমন অশান্তির সময়টায় দিব্যি হেঁয়াচ বাঁচিয়ে দূরে দূরে আছ।
তা হলে কী করব? অন্দরমহলে এসে খুঁটি গাড়ব নাকি?
তাই কি বলেছি?
বড়বউ কবে যাবে?
যাবে না বলছে। কৃষ্ণর পইতের পর যেতে চায়।
তার তত ঢের দেরি।
হুঁ। কী আর করা! শচীনের খবর-টবর রাখো নাকি?
নাঃ! সে আজকাল আমার সঙ্গে কথা বলে না। তবে বড়বউ কী কারণে জানি না তার ওপর খুশি নয়।
বলো কী? এটা তো মস্ত খবর!
তোমার কাছে মস্ত খবর বটে, আমার অন্য ভয়।
কীসের ভয়?
শচীনের মুখ-চোখে একটা হন্যে ভাব। বেহিসেবি কিছু করে না বসে। বড়বউ বুদ্ধিমতী বটে, কিন্তু পুরুষ পাগল হলে তাকে সামাল দিতে পারবে কি?
শচীন কী করবে?
ওর বাপ রাজেনবাবু সাংঘাতিক রাগী লোক। জানো বোধহয়।
জানি না। তবে জানলাম।
খুব অহংকারীও। শচীনের মধ্যেও সে ভাবটা আছে। বড়বউ এতদিন নাচিয়ে যদি আর পাত্তা দিতে না চায় তবে শচীন একদম বেহেড হয়ে যাবে। একদিন দোতলায় উঠে বড়বউয়ের ঘরে হানা দিয়েছিল সন্ধেবেলায়। জাপটে ধরারও চেষ্টা করে।
হেমকান্ত মেরুদণ্ডে হিমশীতল স্পর্শ অনুভব করে বিবর্ণ মুখে বলেন, তাই নাকি? তারপর কী হল?
কিছু হয়নি। বড়বউ সামলে নিয়েছিল বিপদটা। কিন্তু শচীনের মধ্যে আমি একটা পাগলামি দেখছি।
কী করব, মনু?
করার অনেক আছে। শশিভূষণের মামলা উঠতে দেরি নেই। শচীনকে বরিশালে পাঠানোর কথা ছিল। তার কী হল?
ভাল কথা মনে করেছ।
শোনো, কথা ভাল হলেও প্রস্তাবে শচীন মাথা নাও পাততে পারে। বললাম তো, ওর অবস্থা ভাল দেখছি না।
