কোকাবাবুর অস্বাভাবিক শ্বাসের শব্দ ক্রমেই ঘরখানা ভরে তুলছিল। এত বিশাল ও বিষণ্ণ শব্দ হেমকান্ত আর কখনও শোনেননি। তার পায়ের নীচে মৃদু একটা ভূমিকম্প টের পাচ্ছিলেন তিনি। আসল ভূমিকম্প নয়, তার নিজেরই শরীরের অপ্রতিরোধ্য আন্দোলন। তার শিথিল হাত থেকে কুয়োর বালতির দড়ি অন্তহীন নেমে যাচ্ছে। তিনি ঠেকাতে পারছেন না সেই নিম্নগতি।
হেমকান্ত যে ঘর থেকে বেরিয়ে যাবেন সেই শক্তিটুকু পর্যন্ত নেই। তিনি স্থবির ও প্রস্তরীভূত হয়ে গেছেন। কোকাবাবুর জড়বৎ দেহটি এক প্রবল সম্মোহনে তাকে আটকে রেখেছে। তিনি দৃশ্যটি দেখতে চাইছেন না, কিন্তু না দেখেও যেন উপায় নেই।
সূর্যকান্ত গিয়ে কোকাবাবুর হাতখানা তুলে নাড়ি দেখলেন। কিছু কুঞ্চিত, মুখে যথাযথ উদ্বেগ। কোকাবাবুর গলায় একটা ঘড়ঘড় শব্দ হচ্ছিল, সেটা আস্তে আস্তে স্তিমিত হয়ে এল। একটা হেঁচকি ওঠার মতো শব্দ হল কি? কিন্তু ঘরটা অকস্মাৎ শব্দহীন হয়ে গেল। সূর্যকান্ত কোকাবাবুর হাতখানা নামিয়ে রাখলেন। গগন মুখ তুলে তাকাল। সূর্যকান্ত ডাইনে বাঁয়ে মৃদু মাথা নাড়লেন।
এ সবই বুঝতে পারছেন হেমকান্ত। ইঙ্গিত স্পষ্ট ও প্রাঞ্জল। নিস্তব্ধ ঘরে ক্লান্ত কীর্তনীয়া হঠাৎ তার নামগান চৌদুনে তুলে দিল। একজন দাসী সরু স্বরে কেঁদে উঠে ভিতরবাড়িতে ছুটে গেল।
কতক্ষণ দাঁড়িয়ে আছেন তা সম্পূর্ণ বিস্মৃত হয়েছিলেন হেমকান্ত। ঘরখানা যখন আত্মীয়-পরিজন ও অতিথিতে ভরে উঠল তখন খুব আস্তে আস্তে তিনি বেরিয়ে এলেন।
ঘোড়ার গাড়িতে উদ্বিগ্ন মুখে বসে আছে রঙ্গময়ি। অপলক চোখে চেয়ে আছে হেমকান্তর আসা-পথের দিকে। হেমকান্ত গাড়ির কাছে আসতেই কোচোয়ান দবজা খুলে দেয় এবং রঙ্গময়ি হাত বাড়িয়ে তাকে ধরে।
হেমকান্ত তার দুদিকের জানালা তুলে দিলেন। গাড়ির ভিতরটা গভীর অন্ধকারে ড়ুবে গেল।
রঙ্গময়ি কোনও কথা বলল না। কিন্তু এই নিভৃত অন্ধকারে লোকচক্ষুর অগোচরে সে নির্লজ্জের মতো হেমকান্তর একখানা হাত ধরে রইল।
হেমকান্তর স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে আসছিল না। হাত থরথর করে কাঁপছে। গা বড় বেশি ঠান্ডা। স্বরভঙ্গ ঘটেছে। ভাঙা গলায় হেমকান্ত হঠাৎ জিজ্ঞেস করলেন, মনু, তুমি আছ তো?
থাকব না তো কোথায় যাব? বড় অন্ধকার। জানালা খুলে দিই?
না, জানালা খুলো না। আমার বড় শীত করছে। কাঁপছি।
বীজমন্ত্র জপ করো। আস্তে আস্তে ঠিক হয়ে যাবে।
হেমকান্ত ফিস ফিস করে বললেন, সুনয়নীকে আমি চোখের সামনে মরতে দেখিনি। তুমি দেখেছ, না?
সে কথা হঠাৎ আজ কেন?
আজ প্রথম একজন মানুষকে আমি নিজের চোখে মরতে দেখলাম।
তাতে কী হয়েছে? ডাক্তাররা তো অনবরত মানুষকে মরতে দেখছে। প্রথম-প্রথম হয়তো খারাপ লাগে, তারপর আর অস্বাভাবিক বলে মনে হয় না।
তুমি সুনয়নীকে মারা যেতে দেখেছ, মনু?
দেখেছি। আমি আরও মৃত্যু দেখেছি।
তোমার খারাপ লাগে না?
মৃত্যু মাত্রই খারাপ।
ওঃ মনু!-বলে হঠাৎ হেমকান্ত রঙ্গময়ির হাত চেপে ধরেন। তারপর আস্তে আস্তে বলেন, আমি কেন আজ এত একা, মনু? কেন আমার এত একা লাগছে? তোমরা কেউ কি নেই আমার কাছে?
রঙ্গময়ি এক হাত বাড়িয়ে জানালা খুলে দেয়। ব্রহ্মপুত্রের হিমশীতল বাতাস আসে হু-হু করে। সঙ্গে পচা মুলি বাঁশ আর পাটের গন্ধ।
হেমকান্ত আস্তে হাতটা টেনে নেন। তারপর বলেন, কাজটা তুমি ঠিক করোনি।
কোন কাজটা?
এই কোকাবাবুর কাছে আমাকে নিয়ে আসাটা।
তুমি পুরুষমানুষ, এত ভয় পেলে চলে?
হেমকান্ত মাথা নেড়ে বলেন, ভয় নয়। এ অন্য একরকম অনুভূতি। তুমি ঠিক বুঝবে না। শৈশব গেছে, কৈশোর গেছে, যৌবন গেছে, এখন এল বার্ধক্য। এই বার্ধক্যকে আমি সইতে পারছি না।
তোমার বার্ধক্য?–রঙ্গময়ি অবাক হয়।
তুমি জানো না। তুমি জানো না। রঙ্গময়ি চুপ করে থাকে।
গাড়ি একটা বাঁক ফেরে। তারপর খানিকটা ঢালু বেয়ে গড়িয়ে নামতে থাকে দেউড়ি পেরিয়ে বাড়ির চৌহদ্দির মধ্যে।
হেমকান্ত নামেন। বাড়ির সব ঘরে আজকাল আলো জ্বলে না। এক বৃহৎ অন্ধকারে ড়ুবে আছে তার পিতৃপুরুষের এই বাসস্থানটি। তিনি সেই অন্ধকারের দিকে চেয়ে থাকেন কিছুক্ষণ। মৃত্যু তার কাছে নতুন নয়। এ বাড়িতে তার মায়ের মৃত্যু ঘটেছে, বাবার মৃত্যু ঘটেছে। ব্রহ্মপুত্রের জলে ভেসে গেছে নলিনীর মৃতদেহ। সুনয়নী গেল এই তো সেদিন। কিন্তু সেদিনের হেমকান্ত আজ আর নেই।
রঙ্গময়ি নেমে হেমকান্তব পাশে দাঁড়িয়ে মৃদুস্বরে বলল, তুমি ঘরে যাও। আমি একটু বাদে আসব।
হেমকান্ত মাথা নাড়লেন। একজন চাকর লণ্ঠন হাতে সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে আছে সসম্রমে। হেমকান্ত আস্তে আস্তে সিঁড়ি ভেঙে উঠলেন। ঢুকবার মুখেই বাঁ ধারের ঘরখানায় কৃষ্ণকান্ত তার গৃহশিক্ষক প্রতুলের কাছে পড়াশুনো করছে। হেমকান্ত কদাচিৎ এই ঘরে ঢোকেন। আজও ঢুকলেন না। দরজায় কয়েক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে কৃষ্ণকান্তর দিকে চেয়ে রইলেন।
কৃষ্ণকান্ত বালক মাত্র। ভারী সুদর্শন। তার ছেলেদের মধ্যে এই কৃষ্ণকান্তর আদল কিছু আলাদা। অন্যদের চেহারায় জৌলুস আছে কিন্তু বুদ্ধির এত দীপ্তি নেই। দশ-এগারো বছর বয়সেই কৃষ্ণকান্তর মুখে ধারালো বুদ্ধি ও দৃঢ় আত্মপ্রত্যয়ের ছাপ। বলাবাহুল্য, কৃষ্ণকান্তর প্রতি হেমকান্তর দুর্বলতা কিছু বেশি। আর সেইজন্যই অন্যান্য ছেলের নামে কান্তি যোগ করলেও কৃষ্ণকান্তর কান্তি ঘেঁটে দিয়ে নিজের নামের কান্তটুকু তিনি যোগ করেছেন।
