আমি একটা বইতে পড়েছি ধ্যান করলে মনের জোর বাড়ে।
সে তো বটেই। শরীরের চেয়ে মনের শক্তি অনেক বেশি। মনের জোর যার আছে সেই প্রকৃত শক্তিমান। আর একথাও ঠিক, ধান মনের শক্তি বাড়িয়ে দেয়। কিন্তু তার জন্য একজন গুরু চাই। গুরুতে চাই ভক্তি ও বিশ্বাস।
পইতে হলে ধ্যানে অধিকার জন্মায়, বাবা?
তা জন্মায়। আচার্যও একরকম গুরু। তবে পুরুতমশাইয়ের তো বয়স হয়েছে, তাকে দিয়ে খুব বেশি কিছু হওয়ার নয়।
আমাদের কুলগুরু আছেন না, বাবা?
হেমকান্ত একটু হাসলেন। মৃদু স্বরে বললেন, আছেন তো বটেই। তবে বাবার আমল থেকেই তাদের সঙ্গে সংযোগ নেই। কোথায় আছেন তাও জানি না। জানলেও লাভ ছিল না। কুলগুরুরা আজকাল আর আচরণসিদ্ধ নন।
তা হলে কি ধ্যান করব না?
করবে না কেন? তবে খুব বেশি নার্ভের ওপর চাপ যেন না পড়ে। তুমি যাকে সবচেয়ে বেশি ভালবাসো তাকে ভেবো। দুর্গা, কালী, শিব। যাকে পছন্দ।
আমার কালীকে পছন্দ।
তবে তাকেই ভেবো। কিন্তু বেশি নয়। আমি নিজে অবশ্য খুব বেশি ধর্মাচরণ করিনি। মনু বোধহয় জানে। ওর কাছে শুনে নিয়ো।
মনুপিসির কাছেই তো আমি শুনি।
আর-একটা কথা।
কী বাবা?
তুমি নাকি আজকাল একবেলা মোটে ভাত খাও?
হ্যাঁ, বাবা।
কেন?
ব্রাহ্মণরা তো তাই করতেন।
উপনয়ন না হলে তো প্রকৃত ব্রাহ্মণের মতো আচরণ করার দরকার নেই। তাতে বরং শরীর-টরীর খারাপ হতে পারে। তোমার মা নেই, ঠিকমতো যত্নআত্তি হয় না। তার ওপর আবার ওসব করলে—
কৃষ্ণকান্ত বাবার দিকে চেয়ে বলে, তা হলে কী করব আপনি বলে দিন।
হেমকান্ত পড়ে পড়ে যান। নিজের ইচ্ছেমতো ছেলেকে পরিচালিত করতে তার ঠিক সাহস হয় না। বিশেষ করে কৃষ্ণকান্ত যখন ঠিক সাধারণ স্তরের ছেলে নয়। আরও একটা কথা হল, কৃষ্ণকান্ত অতিশয় পিতৃভক্ত। যারা পিতৃভক্ত এবং প্রতিভাবান তাদের কী করে পরিচালনা করা যায় তা হেমকান্ত কখনও ভেবে দেখেননি। তাঁর কনিষ্ঠ পুত্র তাকে বেশ জটিলতার মধ্যে ফেলে দিয়েছে।
হেমকান্ত কৃষ্ণকান্তর মাথায় সস্নেহে হাত রেখে বললেন, আমি তোমার ভালমন্দ যে খুব ভাল বুঝি তা নয়। কীসে যে তোমার ভাল হবে তা আমি ভেবে দেখব। তবে শুধু এইটুকু বলি, বেশি কৃচ্ছসাধন করার খুব একটা দরকার নেই।
কৃসাধন নয়। ব্রহ্মচর্য।
ও বাবা! সে তো অনেক বড় কথা।
করব না বাবা?
ভেবে দেখি। একজন পণ্ডিতের বিধান নিতে হবে।
সরবত শেষ করে হেমকান্ত উঠলেন। তার মনটা আজ স্বচ্ছন্দ নয়। ভিতরে-ভিতরে একটা অস্বস্তি কাজ করছে। জীবনটা নানা সমস্যায় কণ্টকিত। নানা ভাবনায় মন আক্রান্ত।
বর্ষণশেষে শরৎঋতুর আবির্ভাবে চারদিকের প্রকৃতিতে একটা সাজো-সাজো ভাব। বৃষ্টির দেবতা আকাশকে ধুয়ে মুছে ফটফটে নীল ফুটিয়ে তুলেছেন। তাতে ভাসছে খণ্ড-মেঘের কাশফুলি সৌন্দর্য। তার সঙ্গে মানিয়েই বুঝি নদীর ওধারে অফুরান মাঠে কাশফুলের বন্যা এসেছে। আজকাল সকালের বাতাসে একটু হিম থাকে। শিশির জমে থাকে ঘাসের ওপর। হেমকান্তর বড় প্রিয় এই ঋতু। দোতলার বারান্দায় বসে অনেকক্ষণ চেয়ে রইলেন নদীর দিকে। মনটা যে ভাল হয়ে উঠল, তা নয়। তবে অন্যমনস্ক রইলেন।
আচমকাই রঙ্গময়ী আজ অপ্রত্যাশিত হানা দিল।
এই বয়সে যদি হাতে পায়ে চোট লাগে তবে কে দেখবে তোমাকে বলো তো! অত বাহাদুরি করতে কে তোমাকে বলেছে?
হেমকান্তর মুখে আনন্দের একটা ছটা ফুটে ওঠে। হাসিমুখে বলেন, আরে, হঠাৎ নিষিদ্ধ এলাকায় যে? কী ব্যাপার?
ঠাকুরবাড়ির দালান থেকে দেখতে পেলাম তুমি ওই ডাকাতে চেহারার লেঠেলটার সঙ্গে তাল ঠুক। দেখে ভয়ে মরি। কী জোরে লাঠি ঘোরাচ্ছিল লোকা, আর কী ঠোকাঠুকির শব্দ! এখনও বুক দুরদুর করছে।
হেমকান্ত উদারভাবে হাসলেন, তোমার এত ভয় কেন বলো তো! আমার লাগলে সেবা করতে হত সেই ভয়?
না। বরং উলটোটা। তোমার চোট লাগলে আমি এসে সেবাটুকুও করতে পারতাম না। যতদিন বড়বউ আছে।
কেন পারতে না? এত মনের অসুখে মরো কেন বলো তো।
সে কথা পুরুষমানুষেরা বুঝবে না। কিন্তু বাহাদুরিটা কাকে দেখানোর জন্য হচ্ছিল শুনি!
হেমকান্ত খুব তরল হেসে বললেন, বুড়ো বয়সের খোঁটা দিচ্ছ তো! বুঝেছি। যদি বলি তোমাকে দেখানোর জন্য?
আমাকে! রঙ্গময়ী চোখ বড় বড় করে বলে, আমাকে বীরত্ব দেখিয়ে লাভ কী? নতুন করে মজতে হবে নাকি?
হেমকান্ত খুব রাঙা হয়ে গেলেন লজ্জায়। রঙ্গময়ী একটু ঠোঁটকাটা বরাবরই। ওর সঙ্গে টক্কর দিতে যাওয়া বৃথা।
রঙ্গময়ী ছিটেগুলির মতো তীব্র গলায় ফের বলে, আর বুড়ো বয়সের খোঁটা কখন দিলাম বলো তো! তোমার কি ধারণা আমি তোমাকে বুড়ো ভাবি?
নইলে একটু লাঠি চালাচালির জন্য অত চিন্তা হবে কেন? ভাবছিলে বুড়ো বয়সে লেগে-টেগে গেলে হাড়ে বাত সেঁদোবে। তাই না?
তোমাকে বুড়োবাতিকে পেয়েছে। সব কথার মধ্যে খোঁটা দেখছ।
হেমকান্ত মৃদু হেসে বলেন, ঝগড়ার মাথাটি তো বেশ পাকা। ওদিকে বড়বউয়ের ভয়ে মেচি বেড়াল।
রঙ্গময়ী অপলক চোখে কিছুক্ষণ চেয়ে থেকে বলে, ঝগড়া করি খুব, তাই না! আচ্ছা সে কথার জবাব পরে দেব। কিন্তু বুড়ো বয়সের কথাটা আগে শেষ করো।
হেমকান্ত হাতজোড় করে বলেন, ঘাট হয়েছে। মাপ চাইছি।
তা হলে কখনও ভাববে না তো যে মনু আমাকে বুড়ো বলেছে!
তার জন্য তোমার অত দুশ্চিন্তা কেন বলো তো, মনু?
দুশ্চিন্তা আমার হবেনা তো কার হবে? শেষে এই নিয়ে আকাশ-পাতাল ভাবতে বসবে। তা হলে কি বুড়ো হয়ে যাচ্ছি! তা হলে কি শিগগির মরে যাব? তা হলে কি সংসার করা বৃথা? হাঁ করে এইসব ভেবে ভেবে সত্যিই বুড়োটে হয়ে যাবে।
