কিন্তু কে শুনবে সেই আর্ত নীরব চিৎকার? ধ্রুব? হায়।
সেই দিন জয়িতা অনেকক্ষণ বসে ছিল তাদের বাড়িতে ধ্রুবর সঙ্গে দেখা করবে বলে। দেখা হয়নি। ধ্রুব ছিল না।
অনেক রাত অবধি জয়িতাকে আটকে রেখে গাড়ি করে বাড়ি পাঠিয়ে দিল রেমি। তার খুব ইচ্ছে ছিল, ধ্রুবর সঙ্গে জয়িতার আলাপ করিয়ে দেয়। সে যে রাজার সঙ্গে কোনও অবৈধ সংসর্গ করেনি তার সাক্ষী ছিল তো জয়িতা, তাই।
ধ্রুব ফিরল অনেক রাতে। বেশ মাতাল। তবে বেহেড নয়।
সেই রাতেও রেমি নীচের ঘরে ছিল।
ধ্রুব তাকে দেখে মৃদু হেসে বলল, সব হল? বরফ ভাঙল তা হলে?
রেমি শিউরে উঠে বলে, না, না, ছিঃ।
ছিছিক্কার কেন? গো অ্যাহেড। আবার কাল চলে যেয়ো। রোজ যেয়ো। কিছু হয় না ওতে।
রেমি এর জবাবে কী বলবে ভেবেই পেল না। শুধু অসহায় কাহিল হয়ে বসে ছিল বিছানায়।
ধ্রুব গোটা চারেক অ্যান্টাসিড গিলে বলল, আমি চেয়েছিলাম তোমার মুক্তি। এতকাল পরে সেটা হল।
রেমি আবার আতঙ্কিত হয়ে বলে, না।
মুক্তি হয়নি বলছ?
তুমি আমাকে বিশ্বাস করো না?
আমার বিশ্বাস-অবিশ্বাস দিয়ে তোমার কী হবে?
আমার সঙ্গে রাজার কিছু হয়নি। কিছু না। পায়ে পড়ি, এ প্রসঙ্গ আজ আর তুলো না।
ধ্রুব একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। বিছানায় এসে তার পাশে বসে বলল, আজ তোমাকে বেশ ব্রাইট দেখাচ্ছে।
কেন?–রেমি সভয়ে প্রশ্ন করে।
কেন সে তো তোমার জানবার কথা।
মোটেই ব্রাইট দেখানোর কথা নয়। সেই দুপুর থেকে তোমার জন্য বসে আছি। এতক্ষণ জয়িতা ছিল।
জয়িতা কে?
রাজার ভাগ্নী।
ও।
চেনো!
দেখেছি। ও এসেছিল কেন?
তোমার সঙ্গে দেখা করতে।
কেন? আমার সঙ্গে ওর কী দরকার?
ও তোমার অ্যাডমায়াবার।
তাই নাকি?
তোমার তো অনেক অ্যাডমায়ারার। আজ সব শুনলাম।
ধ্রুব মৃদু একটু হাসল। তারপর অস্ফুট গলায় বলল, গার্লস…!
কথাটা শেষ করল না। একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, আমার কথা থাক। তোমার কথা বলো।
আমার কী কথা?
ডিটেলস।
কীসের ডিটেলস?
সব। যা ঘটল তার সব। যদি অবশ্য আপত্তি না থাকে।
ঠিক এই সময়ে রেমির রাগ হল। সত্যিকারের রাগ। এই মাতাল, চরিত্রহীন, অস্থিরমতি পুরুষটির জন্য ভিতরে এক গভীর ও যুক্তিহীন ভালবাসার কারণ খুঁজে না পেয়ে নিজের ওপরেও তার এক তীব্র রাগ হল। দুই রাগ মিলে মিশে আচমকাই ফুঁসে উঠল সে।
তোমার ঘেন্না হয় না! ঘেন্না হয় না জিজ্ঞেস করতে? আমাকে কী মনে করো তুমি?
বলতে বলতে রেমি ধ্রুবর ওপর ঝাপিয়ে পড়ে আঁচড়ে কামড়ে জামা কাপড় ছিঁড়ে একটা ছেলেমানুষির ঝড় তুলে দিল।
প্রথমটায় ধ্রুব ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল। বিছানায় পড়ে গিয়ে রেমির আক্রমণ ঠেকানোর চেষ্টা করল কিছুক্ষণ। তারপর দু’হাতে রেমির দু’হাত চেপে ধরে বলল, নেশাটা কাটিয়ে দেবে নাকি?
দেব। সব নেশা কাটিয়ে দেব।
কেন?
তুমি কেন ভালবাসবে না আমাকে?
এ কি গায়ের জোরের জিনিস, রেমি?
আমার কোনও জোর নেই?
না। আজ আর নেই।
০৬৩. ইরফান নামে যে লোকটা
ইরফান নামে যে লোকটাকে বিপিন লাঠির তালিম দেওয়ার জন্য পাঠিয়েছে সে লোকটা যে ওস্তাদ এক নজরেই বোেঝা যায়। চওড়া ধরনের চ্যাপটা মেদহীন পেটানো শরীর। এক বিন্দু ঢিলেমি নেই শরীরে। পাখসাট মেরে লাঠি ঘোরায় বিদ্যুতের গতিতে।
বার-বাড়ির মাঠের ধারে কাঠের চেয়ারে বসে নিবিষ্টভাবে দেখছিলেন হেমকান্ত। ইরফান তালিম দিচ্ছে কৃষ্ণকান্তকে। কৃষ্ণকান্তর পায়ের কাজ চমৎকার। বয়সের অনুপাতে তার গ্রহণক্ষমতা অনেক বেশি। হেমকান্ত দেখলেন, ঘণ্টাখানেকের তালিমে চমৎকার পাল্লা দিয়ে যাচ্ছে কৃষ্ণকান্ত। তার বুকটা ভরে যায়। গা গরম হয়ে ওঠে।
ইরফান ঘেমো শরীরে লাঠিটা নামিয়ে রেখে হেমকান্তকে একটা সেলাম দিয়ে বলল, এ তো তৈরি আছে কর্তা। বেশি সময় লাগবে না।
হেমকান্তর রক্ত চনমন করছিল অনেকক্ষণ। কিন্তু চক্ষুলজ্জায় মুখ ফুটে বলতে বাঁধছিল, একটু হবে নাকি আমার সঙ্গে? ওস্তাদ লোক দেখলে কার না ইচ্ছে হয় তার সঙ্গে তাল ঠুকতে!
কৃষ্ণকান্ত ধপাস করে হেমকান্তর চেয়ারের পাশে মাটিতে বসে বলল, বাবা, আপনি একটু লাঠি ধরুন না। ইরফানদাদা ভাল লড়ে।
হেমকান্ত লাজুক গলায় বললেন, না, না। থাক।
বলেন বটে, কিন্তু চেয়ারে ঠেস দিয়ে রাখা লাঠিটা হাতে তুলে নেন তিনি।
ইরফান একটু হেসে বিনীতভাবে বলে, ধরেন না কর্তা। ধরেন।
হেমকান্তকে আর বলতে হল না। উঠে কাপড়টা মালকেঁচা মেরে নিলেন। তারপর নেমে পড়লেন।
ইরফান ভালই লড়ে। কিন্তু হেমকান্তর বিস্মৃতপ্রায় কলাকৌশল সবই কৃষ্ণকান্তকে শেখাতে গিয়ে আবার আয়ত্তে এসেছে। আধ ঘণ্টা লাঠি ঠোকাঠুকি করলেন ওস্তাদের মতোই। ইরফান হয়তো তেমন গা ঘামাল না। একটু ছেড়ে এবং বাঁচিয়ে লড়ল। তা হোক। হেমকান্তর তৃপ্তি এটুকুই যে, তিনি ততটা বুড়িয়ে যাননি।
লড়াইয়ের শেষে হেমকান্ত খুব চওড়া মুখে হাসছিলেন। মনটা বড় ভাল লাগছে। শরীরটা লাগছে পালকের মতো হালকা আর ঘোড়ার মতো তেজি।
কৃষ্ণকান্ত বাবার কৃতিত্বে মুগ্ধ। বড় বড় চোখে হেমকান্তর দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, বাবা, আপনি ইরফানদাদার চেয়েও ওস্তাদ।
ইরফানও বিনীতভাবে বলে, কর্তার হাত বড় সজুত।
হেমকান্ত লজ্জায় রাঙা হলেন।
ভেজা গামছায় গা মুছে ছেলেকে নিয়ে ঘরে এসে বসলেন হেমকান্ত। মিছরির জলে লেবু দেওয়া সরবতের গ্লাস হাতে তুলে নিয়ে বললেন, শুনলাম তুমি নাকি ধ্যান-ট্যান করো!
কৃষ্ণকান্ত বলে, করি।
ধ্যানট্যান গুরু ছাড়া করা বিপজ্জনক। অধীরবাবুব ছেলে ওইসব করতে গিয়ে পাগল হয়ে গেল। তা তোমার এই বয়সেই ধ্যানের ইচ্ছে হল কেন?
