জয়ন্ত মাথা নেড়ে বলে, না। আমাকে খবর দেবে কে? ভিতরে ঢুকতেই পারছি না। আপনার রিলেটিভরা গোটা নার্সিং হোম দখল করে আছে। কাউকে কিছু জিজ্ঞেস করলেই এমনভাবে তাকাচ্ছে যে, আমি যেন শত্রুপক্ষের লোক।
ধ্রুব সিগারেটটার কোনও স্বাদ পাচ্ছে না। ফস ফস করে বিস্বাদ ঝাঝহীন ধোঁয়া অভ্যাসবশে কয়েকবার টেনে সিগারেটটা ছুড়ে ফেলে দিয়ে বলে, রেমির একটা খবর নে তো, রতন।
নিয়েছি তো। এতক্ষণ ভিতরেই ছিলাম।
তবু আর একবার যা।
যাচ্ছি। তুমি চলো, গাড়ির মধ্যে শুয়ে থাকবে।
আমার জন্য ভাবছিস কেন? আমি সিদ্ধ মাতাল। এসবে কিছু হয় না।
বাড়ির একটা সম্মান আছে তো!
আচ্ছা যা, আর ফুটপাথে শোব না।
ভিতরে গিয়ে বসতেও পারো।
সেটা অনেকে পছন্দ করবে না। তুই যা। তাড়াতাড়ি খবরটা নিয়ে আয়।
রেমি তার সারা জীবনেও এত ফুল কখনও দেখেনি। চারদিক থেকে ফুলেরা কেঁপে ধরেছে তাকে। সাদা, হলুদ, লাল, গোলাপি কত বকমের যে ফুল, সব ফুল রেমি তো চেনে না। যেদিকে চোখ ফেরায় রেমি সেদিকেই শুধু রাশি রাশি থোকা থোকা, গুচ্ছ গুচ্ছ ফুল। আর কিছু নেই। এত সুন্দর সব গন্ধ যে শ্বাস বন্ধ হয়ে আসে।
ক্ষীণ কণ্ঠে রেমি বলল, এত ফুল কেন?
একটা কর্কশ পুরুষ-গলায় কে যেন নেপথ্য থেকে জবাব দিল, ফুল তোমার ভাল লাগে না?
লাগে। কিন্তু এত ফুল কেন?
সবাই তোমাকে ফুল দিচ্ছে যে, কী করা যাবে!
আমার শ্বাস আটকে আসছে। ফুল দিচ্ছে কেন আমাকে?
পুরুষ-গলা বলল, আসলে আমরা একটা ফুলের বাগানের ভিতর দিয়ে যাচ্ছি।
এটা কি বাগান?
এখানে ফুলের চাষ হয়। চলো।
কোথায় যাব?
চলো। হাতটা বাড়াও, আমি ধরছি।
রেমি ভুলেও জিজ্ঞেস করল না ‘তুমি কে?’–জিজ্ঞেস করতে নেই। সে কি জানে লোকটা কে?
না, সে জানে না। তবে মনে হয় এ লোকটা খুব স্বাভাবিকভাবেই তার সঙ্গে আছে। থাকারই কথা যে।
রেমি হাতটা বাড়ায়। ভারী দুর্বল, নির্জীব তার হাত। কাপছে, অবশ হয়ে আসছে। সে হাত বাড়াতেই একটা শক্ত কঠিন কর্কশ ঠান্ডা হাত সেটা ধরল। তারপর আস্তে আস্তে টেনে নিতে লাগল তাকে।
অজস্র বিচিত্র ফুলের রং অন্ধ করে দিচ্ছিল রেমিকে। গন্ধে পাগল হয়ে যাচ্ছে সে। পথ দেখতে পাচ্ছে না, লোকটাকে দেখতে পাচ্ছে না। তবু যাচ্ছে। শুধু যাচ্ছে। ফুলগুলো সরে সরে যাচ্ছে একটু করে। গালে, মুখে, কপালে স্পর্শ করছে বার বার। ভেজা, ঠান্ডা অদ্ভুত স্পর্শ।
পায়ের তলায় কি জল? ঠান্ডা, ভেজা মাটি, গা শিরশির করে, শীত-শীত করে। শিউরে শিউরে ওঠে রেমি। হাঁটে। তার দু’চোখ বেয়ে জল পড়ছে। সে কি কাঁদছে? কেন কাঁদছে?
হঠাৎ সে তার সঙ্গীকেই জিজ্ঞেস করে, আমি কি কাঁদছি গো?
হ্যাঁ।
কেন বলো তো! আমার তো কিছু মনে পড়ছে না!
মনে করে দেখার দরকার কী?
তবে কাঁদছি কেন?
মনের মধ্যে কান্না জমে ছিল বোধহয়। কাঁদো। কাঁদলে চোখের জলে মাটি উর্বর হবে। আরও ফুল ফুটবে।
কথাটা খুবই যুক্তিযুক্ত মনে হয় রেমির কাছে। ঠিকই তো। একথা সে তো ভূগোলের বইতেও পড়েছিল। চোখের জল মাটির উর্বরতা বাড়ায়। ভূগোলের বই? না কি বিজ্ঞানের বই! ঠিক মনে নেই।
আমার পা অবশ হয়ে আসছে কেন গো?
পা?
হ্যাঁ। আমি পা দুটোয় সাড়া পাচ্ছি না। অবশ।
একটু হাসির শব্দ শুনল রেমি। তবে বিদ্রুপের হাসি নয়। মজার হাসি। পুরুষটি বলল, শুধু পা নিয়ে ভাববার কিছু নেই।
তাই বুঝি?
হ্যাঁ, রেমি। শরীরটা কিছু নয়।
তা অবশ্য ঠিক।
যখন শরীর থাকবে না তখন তুমি সব কিছুর মধ্যে ছড়িয়ে থাকবে।
কী রকম গো?
এই ফুল মাটি জল বাতাস সব কিছুই তখন রেমি হয়ে যাবে।
খুব মজা হবে, না?
হাসে ভারী মজা। ভারী আনন্দ।
তখন কেউ ভাল না বাসলেও দুঃখ হবে না, না?
না, একটুও না। কিন্তু তখন তোমাকে সকলেই ভালবাসবে।
বাসবে? ঠিক জানো?
না বেসে উপায় আছে?
রেমি মৃদু একটু হাসল। আবেগের হাসি৷ ঠিকই তো। তখন ভাল না বেসে উপায় আছে? তখন ততা রেমিকেই শ্বাসের সঙ্গে বুকের মধ্যে নিতে হবে। রেমি যে বাতাস হয়ে যাবে তখন। রেমি হয়ে যাবে ফুল। তখন রেমির দিকে তাকিয়েই মুগ্ধ হয়ে যেতে হবে। রেমি হয়ে যাবে মাটি। আর মাটিকে কি অস্বীকার করা যায়? তখন চাবদিকটাই হয়ে যাবে রেমিময়। সবকিছুই রেমি হয়ে যাবে।
রেমি বলল, আমার খুব ভাল লাগছে।
লোকটা জবাব দিল না। শুধু অনুকম্পার একটু হাসি হাসল। রেমি বলল, শুনতে পাচ্ছো?
পাচ্ছি।
আমি কিন্তু আর হাঁটতে পারছি না। এবার চলো ফিরে যাই।
কোথায় ফিরে যাবে?
তাই তো! রেমি ভেবে পেল না, কোথায় ফিরবে। তার যে কিছু মনে পড়ছে না। অনেক ভেবে সে বলল, ফিরে যাওয়ার কথা কি ছিল না!
ওঃ, হ্যাঁ। সেইখানেই তো তোমাকে ফিরিয়ে নিয়ে যাচ্ছি।
কোথায় বলো তো!
যেখানে তুমি ছিলে। আকাশ বাতাস মাটি গাছপালার মধ্যে।
তাদের মধ্যে মিশে যাব?
যাবে রেমি। বললাম তো।
কিন্তু আর-একটা জায়গা ছিল যে আমার! রেমি বলে কোনও কোনও লোক ভাবত আমাকে। তারা খুব মজার লোক।
তাদের কাছে আর নয়, রেমি।
নয়?- রেমি একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল।
না, রেমির কিছু মনে নেই। মনে নেই সেই কালীঘাটের বাড়ি, যেখানে একটা অদৃশ্য খোঁটায় বাঁধা ছিল তার অস্তিত্ব। কিছুতেই ভেঁড়া যেত না বন্ধন। অথচ কেউ বাঁধেনি তাকে।
রাজার ফ্ল্যাট থেকে এক অবশ্যম্ভাবী পতনের মুখ থেকে জয়িতাকে নিয়ে ফিরে এসেছিল রেমি। তার সর্বাঙ্গ বলে উঠতে চেয়েছিল, ওগো, এই দেখো, এখনও আমি শুদ্ধ, এখনও একগতি, এখনও আমি তোমারই।
