আমি মৃদু কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করিলাম, তুমি তবে কী চাও?
তোমাকে খুশি করার জন্য কাজটা করব। আর কিছু চাই না।
বেশ। তাই করো।
তুমি খুশি হবে তো?
হ্যাঁ, হব।
কাজ না দেখেই?
আমি ব্যথিত হইয়া কহিলাম, কাজ তো বেশি কিছু নয়। আসলে কাজ নেইও। শুধু একটু সঙ্গে থাকা। কাজ করার জন্য তো ঝি চাকরের অভাব নেই।
আমি তো ইহাকে কিছুতেই বলিতে পারিলাম না যে, সঙ্গে থাকার জন্যও সুনয়নীর অনেক লোক আছে। আমি শুধু ইহার নৈকট্য কামনা করিয়া সঙ্গে থাকার ব্যাপারটি মস্তিষ্ক হইতে বাহির করিয়াছি।
কিশোবী হঠাৎ কহিল, তোমার বউ আমাকে পছন্দ করবে তো!
করবে না কেন!
একটু জিজ্ঞেস করে দেখো।
কেন বলো তো!
তোমার বউকে খুব বোকা ভেবো না। সেই চিঠি দেওয়ার পর একদিন বুড়ো খাজাঞ্চিমশাই হঠাৎ আমাকে দিয়ে একটা পরচা লেখালেন। কেন লেখালেন তখন বুঝতে পারিনি। পরে টের পেয়েছি। আমার হাতের লেখা তোমার বউ পরীক্ষা করেছে।
আমি বিস্মিত ও ভীত কণ্ঠে কহিলাম, তারপর?
কিশোরী হাসিয়া কহিল, আমি তিন রকম হাতের লেখা জানি।
০৬২. গায়ে নাড়া দিয়ে
গায়ে নাড়া দিয়ে কে যেন উত্তেজিত স্বরে ডাকছে, কুট্টিদা? কুট্টিদা?
ধ্রুব একটা অতল ঘুমের খাদ থেকে উঠে আসছিল। অতি কষ্টে চোখ খুলে তাকাল সে। মাথার ওপর তারাভরা আকাশ, নীচে কঠিন কংক্রিট। এরকম পরিস্থিতি তার কাছে অস্বাভাবিক কিছু নয়। এরকম হতেই পারে। সে আবার চোখ বোজে। শরীরের মধ্যে বিকেলের কেটে যাওয়া নেশা এখন শোধ নিচ্ছে। মাথাটা লোহার মতো নিরেট আর ভারী। তীব্র একটা যন্ত্রণায় খুলে পড়ছে চোখের ডিম। সে আবার চোখ বোজে।
কুট্টিদা’ কুট্টিদা!
কে রে?
আমি রতন। ওঠো, ওঠো শিগগির।
ধ্রুব ভারী বিরক্ত হয়ে বলে, কোন রতন?
আমি রতন। কী হয়েছে তোমার? এখানে কেউ শুয়ে থাকে? ওঠো!
উঃ, কী চাস?
ওঠো! বাড়ি চলো।
ধ্রুব চোখ খোলে। একটা গহন গুহার অন্ধকার থেকে হামাগুড়ি দিয়ে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করতে সে অস্ফুট স্বরে বলে, কী হয়েছে?
এখানে শুয়ে আছ কেন? কত বড় বাড়ির ছেলে তুমি সে কথা ভুলে যেতে আছে? ওঠো শিগগির!
শরীরটা এমন সেঁটে গেছে ফুটপাথে যে ভোলা অসম্ভব। তবু ধ্রুব প্রাণপণ চেষ্টায় একটু নড়ে। কিছু না ভেবেই সে জিজ্ঞেস করে, রেমিকে শ্মশানে নিয়ে গেছে নাকি?
শ্মশানে! কী যে বলো না! শ্মশানে নেবে কেন?
তবে ডাকছিস কেন? কী হয়েছে?
তোমাকে নিয়ে পারা যায় না। দাঁড়াও, আমি তোমাকে ধরে তুলছি।
রতন লোকটা কে তা ধ্রুব চিনতে পারছে না। তবে লোকটার গায়ে বেশ জোর আছে। বগলের তলায় দুটো হাত ভরে দিয়ে পিছন থেকে এক ঝটকায় তুলে ফেলল তাকে। মাথাটা চড়াৎ করে ঘুরে গেল বর। দপ দপ করতে লাগল চোখের ডিম। মাথাটা ঝুলে পড়ল আলগা অনাত্মীয় একটা জিনিসের মতো। সবচেয়ে বিপদের কথা হল, ধ্রুব নিজের পা দুটোর জায়গায় একটা শূন্যতা অনুভব করল হঠাৎ। তার ধারণা হল, ফুটপাথে শুয়ে থাকার সময় কোনও গাড়ি তার পা দু’খানা কেটে দিয়ে গেছে।
পা! ওঃ, আমার পা!–বলে ধ্রুব চেঁচিয়ে ওঠে।
রতন নামক লোকটা মোলায়েম গলায় বলে, সোজা হয়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করো। পা দুটো অমন ভাঁজ করে রেখেছ কেন?
ধ্রুব চেষ্টা করে। কিন্তু পা দুটো কোথায় তা সে বুঝতে পারে না কিছুতেই। দুটো সঁড়ার মতো জিনিস সে দেখতে পাচ্ছে তলার দিকে। ও দুটোই পা নাকি?
রেমি! রেমি এখনও মরেনি?
কী যে সব বলল তুমি! মরবে কেন?
তা হলে?
রক্ত দেওয়া হচ্ছে। পাঁচজন সার্জেন এসে গেছে। একজন বড় হোমিয়োপ্যাথ আছে। এক তান্ত্রিককে আনা হয়েছে।
অপারেশন?
তা জানি না। তবে কিছু একটা হচ্ছে।
এখন কি রাত?
ভোর চারটে।
ধ্রুব সোজা হয়ে দাঁড়ায়। ঘুমটা ঝরে পড়ছে শরীর থেকে। আস্তে আস্তে ঝি ঝি ছাড়ার মতো নেশাটা কেটে যাচ্ছে তার। কিন্তু নেশা কাটা কোনও আরামদায়ক অনুভূতি নয়। ব্যথা যন্ত্রণা তেষ্টা হতাশা চাগাড় দিয়ে ওঠে।
হাঁটতে পারবে?
পারব।–বলে রতনের দিকে তাকায় ধ্রুব। চিনতে পারে। চুনীপিসির ছেলে। আপন পিসি নয়, একদা তাদের দেশের বাড়িতে রতনের মা ছিল দাসী। ছোটপিসির খাস দাসী।
ধ্রুব বলল, এবার ছেড়ে দে।
রতন সাবধানে হাত সরিয়ে নেয়। বলে, এই ঠান্ডায় এভাবে শুয়ে ছিলে, সর্দি বসে যায় যদি?
আমার কিছু হয় না। ওদিককার খবর কী?
খারাপ কিছু নয় বোধহয়। বড়কর্তা বসে আছেন। চিন্তা নেই। বহু লোক এসেছে। তুমি বাড়ি যাবে?
ধ্রুব মাথা নেড়ে বলে, না।
রতন হাত দিয়ে ধ্রুবর জামাকাপড় ঝেড়ে দিতে দিতে বলে, তা হলে একটা গাড়ি খুলে দিই! শুয়ে থাকো।
একটা সিগারেট দে তো!
আমি তো খাই না। দাঁড়াও কারও কাছ থেকে চেয়ে আনি।
থাক। বলে ধ্রুব একটা মস্ত হাই তোলে।
বাইরে নিজ্ঝুম কয়েকটা গাড়ি দাড়িয়ে আছে শুধু। লোকজন কেউ নেই। এই ঠান্ডায় সবাই লবিতে ভিড় করেছে। শুধু একটা ল্যাম্পপোস্টের তলায় ঠেস দিয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে আছে জয়। খুবই রহস্যময় এবং আততায়ীর মতো দেখাচ্ছে তাকে।
চোখে চোখ পড়তেই জয়ন্ত বলল, সিগারেট? আমার কাছে আছে। নেবেন?
ধ্রুব উদার গলায় বলে, দাও।
জয়ন্ত এগিয়ে আসে। পকেট থেকে সিগারেট বের করে দেয়। তারপর বলে, আমি এতক্ষণ আপনাকে পাহারা দিচ্ছিলাম।
তাই নাকি?–বলে ফের হাই তোলে ধ্রুব। তারপর বলে, পাহারা দেওয়ার কিছু নেই। আমার অভ্যাস আছে! মাতালদের মুখে কত কুকুর মুতে দিয়ে যায়। এতে কিছু হয় না। ইটস অল ইন দি গেম। রেমির কোনও খবর পেলে?
