আজ যখন যৌবনের ভাণ্ডটি ফুরাইয়াছে, বয়সে লাগিয়াছে অস্তায়মান জীবনসূর্যের রং তখন একটা হাহাকার হৃদয় জুড়িয়া বাজিতেছে। কেবল মৃত্যুভয় নহে, ইহার মধ্যে সুপ্ত ভোগস্পৃহা, আকাঙক্ষা ও যৌবনোচিত আরও অনেক অতৃপ্ত বাসনা লুক্কায়িত আছে। মানুষ তো কেবল কতকগুলি আকাঙক্ষারই সমষ্টি নহে। বিধাতা তাহার মধ্যে অন্য সম্ভাবনার বীজও উপ্ত করিয়াছেন। তবু মানুষ বুঝি আকাঙক্ষা ছাড়া কিছুই জানে না।
আমার জীবনটার শেষভাগ এই আত্মধিক্কারেই পরিপূর্ণ হইয়া উঠিতেছে। আজ এই পরিণত বয়সে যখন সব সম্ভাবনা ও ভবিষ্যৎ স্বপ্নের দুয়ার রুদ্ধ হইয়াছে, যখন আর কিছুই হওয়ার নাই বলিয়া ধ্রুব জানিয়াছি তখন মাঝেমধ্যে যৌবনের পাছদুয়ারটি খুলিয়া দিয়া স্মৃতি রোমন্থন করিতে বড় মধুর লাগে।
সেই কিশোরীটির সব কথা এখনও ফুরায় নাই। তাহার সাংঘাতিক ভালবাসা ক্রমে আমাকে তাহার প্রতি মনোযোগী করিয়া তুলিল। তাহার পিতা এস্টেটের সামান্য কর্মচারী মাত্র। তাহার সহিত সুতরাং প্রকাশ্যে সহজভাবে আলাপাদি করা অসঙ্গত ও দৃষ্টিকটু হইত। কিন্তু কোনওপ্রকারে ইহার নৈকট্যও আমার কাম্য বিষয় হইয়া উঠিল।
অনেক ভাবিয়া স্থির করিলাম, ইহাকে যদি আমার স্ত্রীর সর্বসময়ের সঙ্গিনী ও সাহায্যকারিণী নিয়োগ করি তাহা হইলে বোধ করি তেমন খারাপ দেখাইবে না।
কিশোরীটি রোজ প্রাতঃকালে কুঞ্জবনে ফুল তুলিতে যাইত। এই খবরটি আমার জানা ছিল। প্রাতঃকালে শয্যাত্যাগ ও কখনও প্রাতঃভ্রমণ আমারও অভ্যাস ছিল।
একদিন ভোরবেলা যখন আকাশের তারা মুছিয়া যায় নাই, ব্রহ্মপুত্রের বুক হইতে দেবতাদের শরীর-গন্ধ বহন করিয়া এক অলৌকিক বাতাস বহিয়া আসিতেছে, আমাদের সাংসারিকতার স্তর যখন এক স্বপ্নলোকে নিমজ্জিত হইয়া আছে, তখন দুরু দুরু বক্ষে আমি কুঞ্জবনে গিয়া ঢুকিলাম।
কিশোরীটি বড়ই চপলা, দুষ্টমতি। আবছায়া ভোরের আলোয় আমি একটি করবী বৃক্ষের নীচে তাহার ছায়ামূর্তিটি দেখিতে পাইয়া অনুচ্চস্বরে নাম ধরিয়া ডাকিলাম। ছায়ামূর্তি চমকাইয়া উঠিয়া কিছুক্ষণ স্থাণুবৎ দাঁড়াইয়া রহিল। পরমুহূর্তেই আর তাহাকে দেখা গেল না। আমি বেশি ডাকাডাকি করিয়া নিঃশব্দচরণে তাহার অনুসন্ধানে ব্যাপৃত হইয়া পড়িলাম। বেশি ডাকাডাকি করিলে লোকে জানিয়া যাইবে।
কিন্তু কিশোরীটি দুষ্টবুদ্ধিতে অদ্বিতীয়া। কখনও খুব নিকটেই তাহার পদশব্দ শুনি। অদূরে তাহার দেহের স্পর্শে পত্রপুষ্প শিহরিত হইতেছে। অথচ সে ধরা দিতেছে না।
কিছুক্ষণের মধ্যে আমি ক্লান্ত হইয়া অনুচ্চ স্বরে বলিলাম, তোমার সঙ্গে একটু কথা ছিল যে! শুনতে চাও না?
আমার পশ্চাতে কয়েক হাত দূর হইতে সে বলিল, কী কথা?
সুনয়নীর শরীরটা ভাল নেই। তুমি ওর কাছে থাকবে?
ঝি হয়ে নাকি?
না, না, ছিঃ! ও কী কথা!
তবে কী হিসেবে থাকব?
এমনি থাকবে। সখী হয়ে।
সই! বুদ্ধিটা কার?
ধরো না কেন, আমারই।
কিশোরী খিলখিল করিয়া হাসিয়া বলিল, তোমার তো খুব বুদ্ধি!
আমি মাথা চুলকাইয়া বলিলাম, থাকবে কি না বলো।
কী দেবে?
যা লাগে সবই পাবে। শাড়ি গয়না টাকা। সুনয়নী মানুষও ভাল।
হঠাৎ কিশোরী চাপা গর্জনে বলিল, থাক, আর বউয়ের প্রশংসা করতে হবে না।
আমি অপ্রতিভ হইয়া বলিলাম, তা বলিনি। বলছিলাম সুনয়নী তোমাকে কোনও কষ্ট দেবে না।
আমি শাড়ি গয়না টাকা কিছু চাই না।
তবে কী চাও?
আমি সতীনের সেবা করতে পারব না।
সতীন! আমি নির্লজ্জ মেয়েটার এই সাংঘাতিক বেহায়াপনায় একেবারে হতবাক হইয়া গেলাম, বুকের ভিতরটা দমাস দমাস করিতে লাগিল। পাগলিনী বলে কী!
আমি গলা খাঁকারি দিয়া কহিলাম, ওসব আবার কী কথা!
কেন? তোমার কি লজ্জা হল নাকি?
আমি কিশোরীকে মুখোমুখি দেখিবার জন্য পিছন ফিরিলাম। একটি ঝুমকা ফুলের গাছের আড়ালে সে দাঁড়াইয়া আছে।
বলিলাম, তোমারও এসব বলতে লজ্জা হওয়া উচিত।
কেন, সেদিন তো নদীর পাড়ে অন্য কথা বলেছিলে।
আমি সংকুচিত হইয়া বলি, তোমার কি ভয়ডর নেই? এসব আর কাউকে বোলো না। বললে কলঙ্ক রটবে। তোমার বিয়ে হবে না।
বিয়ে আবার নতুন করে কী হবে? দু’বার হয় নাকি?
আমি প্রমাদ গণিলাম। গলা খাঁকারি দিয়া কহিলাম, আচ্ছা, ওসব কথা থাক। কাজটা করবে তো!
আমাকে ওর সেবা করতে নিচ্ছ কেন?
ভাবলাম আলস্যে সময় কাটিয়ে কী করবে? তোমারও কাজ হবে, সুনয়নীরও ভাল হবে।
আমাকে তুমি দেখতে পারো না কেন?
কে বলল দেখতে পারি না?
আমি সব টের পাই।
আচ্ছা, আর ছেলেমানুষি করতে হবে না। তোমার বাবাকে আজই বলব যাতে সুনয়নীর কাছে তোমাকে পাঠায়।
কিশোরী ধৈর্যহীন স্বরে কহিল, না, বাবাকে বলবে না।
তা হলে? তুমি কি কাজ করতে চাও না?
কাজ আবার কী? আমি চাকরি করতে পারব না।
এটা চাকরি হবে কেন?
আমি সব বুঝি। শোনো, আমি সুনয়নীর কাছে এমনি থাকব। সেবা-টেবার ত্রুটি হবে না। কিন্তু তার বদলে টাকা পয়সা গয়নাগাঁটি কিছু দিতে পারবে না। আমি ওসব নেব না।
কেন? নিলে ক্ষতি কী?
তোমরা বড়লোক, ইচ্ছে করলেই দিতে পারে। কিন্তু ওসব আমার চাই না।
এই কিশোরী যে সহজে প্রলুব্ধ হইবে না এইরকম ধারণা আমার ছিল। ইহার মধ্যে কিছু অসাধারণত্ব আছে, যাহা সহজলভ্য নহে। আমাকে ইহার চরিত্রের সেই রহস্যময় দিকটিই মুগ্ধ করিল। কিশোরীর চেহারাটি ধারালো রকম এবং আকর্ষণীয় বটে, কিন্তু আমার রূপতৃষ্ণা বিশেষ প্রবল নহে। সুতরাং একমাত্র নারীদেহ বা রূপ দেখিয়া মোহিত হওয়া আমার চরিত্রে নাই। কিন্তু এই কিশোরীর ওই অতিরিক্ত, ব্যাখ্যার অতীত একটা চারিত্রিক গুণ আমাকে একেবারে পাড়িয়া ফেলিল। ব্যাখ্যার অতীত এই কারণে যে, মেয়েটি নিতান্তই দরিদ্র এক কর্মচারীর কন্যা। ইহাদের সংসারে নিত্য অভাবের গীত কীর্তন হইতেছে। সেই বিকট দারিদ্র্যের দূষিত আবহাওয়া ইহাদের নৈতিক বোধ ও সততারও হানি ঘটাইতেছে। ব্রাহ্মণের ব্রহ্মতেজ অস্তমিত, এখন বুঝি তাহার মনুষ্যত্বও যায়। সেই পরিবেশে জন্মিয়া ও লালিত-পালিত হইয়া এই মেয়েটি কী করিয়া নিজের অভ্যন্তরে দীপশিখাটিকে নিষ্কম্প রাখিয়াছে তাহা কে জানে! কিংবা মেয়েটি আমার প্রতি মোহমুগ্ধ বলিয়াই কি বিষয়গত ক্ষুদ্রতা হইতে ঊর্ধ্বে উঠিবার চেষ্টা করিতেছে? এবং আমিও ইহার প্রণয়পাশে আবদ্ধ হইয়া একান্তই ভাবাবিষ্ট নয়নে ইহার গুণ আবিষ্কারে উঠিয়া পড়িয়া লাগিয়াছি!
