হেমকান্ত শান্ত মুখখানা তুলে বললেন, তার দরকার নেই, বউমা। আমি শিশুদের মতামতকেও মূল্য দিই। কাল সকালে বরং আমার সঙ্গে দেখা হলে জেনে নেব।
চপলা মৃদু স্বরে বলে, ও বোধ হয় ব্রহ্মচর্য করছে, বাবা।
হেমকান্ত উজ্জ্বল মুখে বললেন, ওর মধ্যে একটা কিছু আছে বলে কি তোমার মনে হয় না, বউমা?
খুব হয়।
কী আছে বলো তো!
ও খুব তেজি হবে।
হেমকান্ত একটু চুপ করে থেকে বললেন, আমার আর কোনও সন্তান এত উজ্জ্বল নয়। ওর ওই উজ্জ্বলতা তাই আমার কাছে আনন্দেরই বিষয়। কিন্তু ভয় কী জানো?
কী ভয়, বাবা?
এ তো স্বদেশিদের যুগ। তেজি ছেলে দেখে তারা আবার নিয়ে না দলে ভেড়ায়!
এ ভয় যে খুব আছে সে বিষয়ে চপলা নিশ্চিত। তবু মুখে বলল, তা নয়। ও হয়তো সাধু-সন্ন্যাসী হবে।
এ বাড়িতে সেই বীজাণুও আছে। তুমি তো সবই জানো। সাধু হলেও চিন্তার কথা, স্বদেশি হলেও চিন্তার কথা। আমার সঙ্গে তো ওর কোনও ঘনিষ্ঠতা নেই। তুমি একটু জানবার চেষ্টা করো তো, ও আসলে কী হতে চায়।
করব। কিন্তু আপনি ওকে নিয়ে অত ভাববেন না।
মা-মরা ছেলে বলে ভাবি। এই যে রাতে ভাত খায় না তা জানতে আমার কয়েকদিন সময় লেগে গেল, তাও কথাটা উঠল বলে, ওর মা বেঁচে থাকলে কি হত এরকম?
কেউ একথার জবাব দিল না। কারণ কথাটা অত্যন্ত কঠোর সত্য।
হেমকান্ত জিজ্ঞেস করলেন, বিশাখাকেও আজকাল দেখতে পাই না বড় একটা। সেও কি ভাইটার একটু দেখাশোনা করতে পারে না?
চপলা অবাক হয়ে বলে, কিন্তু কৃষ্ণ যে আজকাল এ বাড়িতে থাকেই না। বার বাড়িতে থাকে।
বার-বাড়ি? সে কী?–হেমকান্তর খাওয়া একদম থেমে গেল।
হ্যাঁ বাবা, আমি মনে করেছিলাম, আপনি জানেন।
জানব কী করে? এত বড় বাড়ি, কে কোথায় যাচ্ছে আসছে তা কি নজরে পড়ার কথা? বার বাড়িতে থাকে কেন?
ও-ঘরে ও ধ্যান করে। পড়ে।
কোন ঘরটায় বলো তো!
যে ঘরে শশিভূষণ ছিল।
তার মানে নলিনীর ঘর! —হেমকান্ত খুবই অবাক হয়ে বলেন, ও-ঘরে ও একাই থাকে নাকি? একদম একা।
হেমকান্তর এর পরেও অনেক প্রশ্ন থাকার কথা, কিন্তু সেসব করলেন না। একটা কথা মনে মনে স্থির করে নিলেন। তারপর অনেকক্ষণ বাদে বললেন, ছেলেটা অদ্ভুত।
একথার জবাব কী দেবে চপলা ভেবে পেল না। হেমকান্ত কোনও প্রশ্ন করেননি। কিন্তু তবু বোধ হয় কিছু শুনতে চান। তেমনভাবেই চপলার দিকে তাকালেন।
চপলা মৃদু স্বরে বলল, খুবই অদ্ভুত, বাবা। তবে এটা পাগলামি নয়। অন্য কিছু।
ধ্যান করে বলছ? কীসের ধ্যান? ও তো কোথাও দীক্ষা নেয়নি।
ওর ঘরে ঠাকুরের ফটো আছে।
ওঃ, নলিনীর সেই পাবনার ঠাকুর!–বলে আবার চুপ করে থাকেন হেমকান্ত। একটু যেন চিন্তিত। তারপর বললেন, তোমরা কিছু বলতে যেযো না। ওজন মেপে কথা না বললে একটা গোলমাল হয়ে যেতে পারে। যা বলার আমিই বলব।
বাকি সময়টা হেমকান্ত খুব আনমনে খেয়ে উঠে গেলেন।
গভীর রাতে কেরোসিনের উজ্জ্বল বাতির সামনে বসে হেমকান্ত তার ছেলের কথা ভাবলেন কিছুক্ষণ। তার ছেলে! ভাবতে শরীর কণ্টকিত হয়ে ওঠে পুলকে, গৌরবে, আনন্দে। কিন্তু বস্তুত নিজের কোনও সন্তানকেই তো তিনি সৃষ্টি করেননি। তারা তার মাধ্যমে সৃষ্ট হয়েছে মাত্র। কী করে তারা শরীর ধারণ করল, কোথা থেকে পেল প্রাণ, সে রহস্য তো তার অধিগম্য নয়। তবে এ ছেলে তার একথা তিনি ভাবেন কেন? এই যে “আমার ছেলে’ বা ‘আমার’ বলে বোধ এ এক বিষম অজ্ঞতাপ্রসূত ধারণা। আসলে তার সন্তান বলে তিনি যাদের জানেন তারা কোনও বৃহতের জটিল সৃষ্টিলীলার ফসল। তিনি নিজেও তাই। হেমকান্ত শুধু এদের অভিভাবক, নিরাপত্তারক্ষী ও জোগানদার। এইসব মহৎ চিন্তা আজ তাঁর হৃদয়কে দ্রব করে ফেলল। মনটা প্রসারিত হয়ে গেল বহু দুর পর্যন্ত।
এই রাত্রির নির্জন নিরাশ্রয়ে হেমকান্ত তার বর্তমান পরিস্থিতির কথা ভাবলেন। একথা সত্য যে তার জীবনে এখন দুই স্তরের দুটি গ্লানির সংক্রমণ ঘটেছে। তার নিজের জীবনে মনু! তার পুত্রবধূর ক্ষেত্রে শচীন। এই দুই গ্লানি আজকাল অহরহ তাঁকে নিষ্পেষিত করে। চপলার ব্যভিচারহেতু তার নিজের সঙ্গে মনুর সম্পর্কটাকে পর্যন্ত অশুচি মনে হয়। অথচ এরকম মনে হওয়ার কোনও কারণ নেই। সেদিনকার সেই কিশোরীর বয়ঃসন্ধির বাঁধনছেড়া ভালবাসা আজ বয়স ও অভিজ্ঞতার শাসনে সংযত ও সেবামুখী। তিনি নিজেও মৃত্যুচিন্তায় আক্রান্ত হওয়ার পর থেকে আরও স্তিমিত, আরও শ্লথ। তবু একটা ঘনায়মান ব্যভিচারের নৈকট্য নতুন করে তাঁর আর মনুর সম্পর্কটাকে বিচার করতে চাইছে অন্য একরকম মাপকাঠিতে। আসছে সংশয়, সন্দেহ, যা আগে কখনও ছিল না।
এই ক্লিষ্ট সময়টায় কৃষ্ণকান্তের মধ্যে কয়েকটি উজ্জ্বল লক্ষণ দেখে তার গ্লানি অনেক কেটে গেল। বুকটা হালকা লাগতে লাগল।
বাইরে তুমুল বৃষ্টিপাত ঘটে যাচ্ছে। জানালার পাল্লা সামান্য ফাঁক করতে গিয়ে তিনি বায়ুবেগের প্রবলতা টের পেলেন। যতদূর চোখ যায় অন্ধকারে সাদা আবছা একটা পতনশীল জলের ঝরোখা।
জানালা আবার বন্ধ করে দিয়ে তিনি ডায়েরি লেখার খাতাটি খুলে বসলেন।
আজ মনে হইতেছে, বয়স হইয়াছে, এ জীবনের অনেক ছেলেখেলা এবার গুটাইতে হইবে। কিন্তু মন কি বয়সের শাসন মানে?
আশ্চর্য এই, যখন যৌবন ছিল তখন আমি প্রকৃত বৃদ্ধের ন্যায় নিস্পৃহ ও উদাস আচরণ করিয়াছি। স্ত্রী ছাড়া অন্য নারীর যৌবনের দিকে আগ্রহী হই নাই। নিজের স্ত্রীর প্রতিও যথোচিত মনোযোগী ছিলাম? মনে হয় না।
