রেমি একটু অবাক হয়ে বলে, একজনের জন্য এতজন পাগল!
পাগল মানে দারুণ পাগল। লোকটা যে দারুণ অ্যাট্রাকটিভও সেটা তো মানবে। শুধু চেহারাটাই নয়। আরও কিছু আছে। কখনও টের পাও না।
আমি!–রেমি খুব অসহায়ের মতো বলে, আমি ঠিক ওকে বুঝতে পারি না।
কিন্তু তোমার মনে হয় না ও তোমাকে হিপনোটাইজ করে রেখেছে।
তা বোধহয় হয়।–রেমি একটু ভেবে বলে।
ওর ওই হিপনোটিজমটাই সাংঘাতিক। কী একটা আছে, বোঝা যায় না। মাঝে মাঝে মনে হয় আনফ্যাদমেবল।
ও কোনও মেয়ের সঙ্গে কখনও মিশত না?
জয়িতা একটু ভেবে বলে, আমি তত তেমন কিছু জানি না। ধ্রুবমামা একটু অহংকারী মানুষ। এ ধরনের লোকেরা কখনও মিষ্টি মিষ্টি কথা বলে না, মেয়েদের কখনও কমপ্লিমেন্ট দেয় না। মেয়েদের সঙ্গ বেশিক্ষণ সহ্যও করতে পারে না। ভাবে, বেশিক্ষণ মেয়েদের সঙ্গ করলে পুরুষের পৌরুষ কমে যায়।
রেমি খুব হাসতে থাকে। বলে, বোধহয় তাই আমারও সঙ্গ করে না।
তুমি কিন্তু ভীষণ লাকি। অনেকের মুখের গ্রাস ছিনিয়ে নিয়েছ। কত মেয়ে যে তোমাকে হিংসে করে!
তুমি করো?
করতাম। তোমাকে দেখে মনে হচ্ছে হিংসে করাই যায় না।
কেন?
কী যে মিষ্টি না তুমি! ধ্রুবমামাও কম লাকি নয়।
পতিগর্বে এখন রেমি রমরম করছে ভিতরে-ভিতরে। সে তো জানত না, ধ্রুব নামক এক পাথরের বিগ্রহে এত কিশোরী ও যুবতী পুজো দিতে চেয়েছে। সেই দুর্লভ পুরুষ তার। রেমির বুকে হঠাৎ খামচে ধরল এক ভয়। তার?
মনের ভাব অনুযায়ী রেমির মুখের ভাব এত সহজেই পালটায় যে, লোকের চোখে ধরা পড়ে। জয়িতা তার হাত ধরে বলল, তোমার মনে দুঃখ দিলাম না তো!
না।–ক্ষীণ স্বরে রেমি বলে, দুঃখ দেওয়ার মতো কিছু তো বলোনি।
কথা অনেক হয়েছে, এবার চা খাবে? দাঁড়াও মাকে ডাকি। মা বোধহয় ঘুমোচ্ছে।
রেমি হঠাৎ জয়িতার দিকে চেয়ে কাঁদো কাঁদো হয়ে বলে, আমি বাড়ি যাব।
বাড়ি যাবে! এই তো এলে।
না, শোনো। আমার বাড়ি যাওয়া ভীষণ দরকার। আমি একটা জরুরি কাজ ভুলে গিয়েছিলাম।
মিথ্যে কথাটা খুব ভাল বলতে পারে না রেমি। কিন্তু তার মুখের করুণ ভাবটায় কোনও ফাঁকি ছিল না। জয়িতা তার মুখটার দিকে কয়েক পলক চেয়ে থেকে হঠাৎ হেসে ফেলে বলে, কী যে পাগলি না একটা তুমি! খুব ভাল মিলেছে বোধহয় তোমাদের দুটিতে। কী কাজ ভুলে এসেছ বলল
তো!
সে আছে একটা।
একটুও বসবে না?
না গো, বড় জরুরি ব্যাপার।
রাজামামা যে নিয়ে এল তোমাকে, দাঁড়াও মামাকে তা হলে ডাকি।
রাজা কী করছে?
নিজের ঘরে গেছে। বোধহয় জামাকাপড় পালটাতে। ডেকে আনছি, বোসো।
রেমি প্রমাদ গুনল। রাজা কি রেগে যাবে তার ওপর? খুব রেগে যাবে? যাক। রেমি পারবে না। সে ধ্রুবর বউ। ধ্রুবর বউ। আর কারও হতে পারবে না সে। তাকে ছাড়ুক, মারুক, ভাঙুক ধ্রুব।
রেমি উঠে দাড়িয়ে বলল, তুমি রাগ কোরো না, জয়িতা। একটা কথা বলব?
বলোই না।
তুমি আমার সঙ্গে চলো।
ও বাবা, বাঘের ঘরে ঘোগকে ঢোকাবে?
কেন নয়? বাঘ তো পাথরের। চলল।
খুব হাসল জয়িতা। তারপর বলল, সত্যি কথা বলতে কী মামি, ইস তোমাকে মামি-ফামি ডাকতে ইচ্ছেই করে না— আচ্ছা, বউদি ডাকব? ডাকলে ক্ষতি কী? ধ্রুবমামা তো আর সত্যিকারের মামা নয়। ডাকব?
ওমা! অত ফর্মালিটির কী আছে? তুমি আমাকে রেমি বলে ডেকো, আমি খুব খুশি হব।
বাবাঃ বাঁচলাম। তোমার মতো একটা বাচ্চা মেয়েকে নাম ধরেই ডাকা সবচেয়ে ভাল।
চলো তো এখন। শাড়িটা পালটে নাও।
সত্যি যাব?
যাবে। না নিয়ে আমি নড়ছি না।
তা হলে পনেরোটা মিনিট সময় দাও। এই প্রথম ধ্রুবমামার সঙ্গে সত্যিকারের আলাপ হয়ে যেতে পারে। একটু সাজি আজ? অবশ্য যদি তুমি পারমিশন দাও।
দিচ্ছি। কিন্তু তোমার মায়ের ঘর কোনটা?
কেন, যাবে?
একটু আলাপ করে যাই।
আসলে এইভাবে নিজের পাহারার ব্যবস্থা করছিল রেমি। কারণ অস্থির ও পাগল রাজা আড়ালে কোথাও অপেক্ষা করছে অধৈর্য হয়ে।
এসো।–বলে ডাইনিং কাম ড্রয়িং পেরিয়ে একটা ঘরে তাকে নিয়ে গেল জয়িতা।
তার মা ঘুমোচ্ছিল ঠিকই। রাজার এই দিদি মোটেই প্রবীণা নন। বয়স সম্ভবত চল্লিশের ধার ঘেঁষে। চমৎকাব বাঁধুনি শরীরের। মেয়ের মতোই সুন্দর চেহারা। হঠাৎ মা আর মেয়েকে দুই বোন মনে হবে।
পরিচয় পেয়ে দিদি তাড়াতাড়ি হাত বাড়িয়ে একেবারে কাছটিতে বসিয়ে বললেন, তুমি ধ্রুবর বউ! ও বাবা!
এই অবাক হওয়া এবং চমকে যাওয়ার মধ্যে একটা সমীহ এবং ভয়ের ভাব আছে। রেমি অনেক আগে থেকেই এটা টের পেয়ে আসছে। ধ্রুবর বউ যেন কী সাংঘাতিক একটা ব্যাপার।
দিদি বললেন, আমরা তোমাদের বাড়িতে খুব একটা যাইনি। আত্মীয়তা তো তেমন কাছের নয়। তবে সব খবর রাখি।
রেমি বিনীতভাবে একটু হাসে।
দিদি বলেন, তোমরা হলে ভি আই পি। তবে আমার স্বামী যখন মারা যান তার আগে কৃষ্ণকান্ত চৌধুরী অনেক সাহায্য করেছিলেন। সে কথা কোনওদিন ভুলব না।
রেমি এসব কথায় আবার আত্মস্থ হয়ে যায় পুরোপুরি। তার শ্বশুর কৃষ্ণকান্ত চৌধুরী, যাকে এক ডাকে সবাই চেনে, যার ক্ষমতার হাত বহু দুর প্রসারিত, তার স্বামী ধ্রুব চৌধুরী, যে বহু যুবতীর কামনার লক্ষ্যস্থল ছিল। তা হলে সে তো কম কিছু পায়নি জীবনে।
কিছুক্ষণ কথা বলতে না বলতেই আচমকা রাজা এসে ঘরে ঢুকল।
বউদি, একটু শুনে যাও।
দিদি শশব্যস্তে বলে, যাও। কথা বলো।
রেমি ধীরে ধীরে ওঠে। রাজা তাকে নিয়ে আসে দক্ষিণের একটা ফাঁকা ঘরে। সেখানে খাটে বিছানা পাতা। জানালা একটু ভেজানো।
