জীবন অনেক বড় এবং জটিল। তোমাকে যদি আমি উদ্ধার না করি তবে তুমি গলায় দড়ি দেবে ইত্যাদি লিখেছ। ঠাকুর-দেবতার নামে অনেক ভয় দেখিয়েছ। এসব বড় বাড়াবাড়ি। আমার জন্য তোমার এত আগ্রহ এতকাল কোথায় ছিল? তুমি সুন্দরী, সুপাত্রের অভাব হবে না। উপরন্তু কোকাবাবুর নাতি শরতের প্রতি নিজের দুর্বলতার কথা তুমি নিজেই প্রচার করেছ। তারপরও এই নাটক কেন?
আমি নাটক পছন্দ করি না। তবে তোমার প্রতি আমার স্নেহ আছে। কিন্তু তোমার প্রস্তাব গ্রহণযোগ্য নয়। আশা করি বুঝবে।–শচীন।
০৬০. রাজার ফ্ল্যাট
রাজার ফ্ল্যাট যেমন ফাঁকা হবে বলে ভেবেছিল রেমি, তা নয়। আসলে রাজাদের বাসায় এর আগে কখনওই আসেনি রেমি। আসার প্রয়োজনও দেখা দেয়নি। সে শুনেছে, রাজার বাবা-মা দিল্লিতে থাকে। এখানে সে একা। কিন্তু একদম একা যে নয় তা রেমি জানত না।
রাজার ফ্ল্যাটে তার এক বিধবা দিদি এবং তার মেয়ে থাকে। দিদির বয়স চল্লিশের ওপর। তার মেয়েটি যুবতী এবং দুর্দান্ত সুন্দরী। দরজা খুলে সে যখন চৌকাঠের ফ্রেমে দেখা দিল তখন বড় ম্লান হয়ে গেল রেমি।
মেয়েটিকে দেখে এমন একটা ধাক্কা লাগল রেমির মনে যে, তার এতক্ষণের দুঃসাহস ও নিয়ম ভাঙার আগ্রহ উবে গেল। মেয়েটিকে দেখামাত্র সে নিজের সঙ্গে মেয়েটির একটা চটজলদি তুলনা সেরে নিল মনে মনে। না, সে সুন্দরী হলেও এ মেয়েটির কাছে দাঁড়াতেই পারবে না।
রাজাকে দেখে মেয়েটি একটু অবাক হয়ে বলল, তুমি এই দুপুরে ফিরলে যে!
এমনি।–বলে রেমির দিকে চেয়ে রাজা বলে, আমার ভাগনি। জয়িতা।
জয়িতা রেমির পরিচয় পেয়ে চোখ বড় বড় করে বলে, ধ্রুবমামার বউ! উঃ, কী দারুণ!
রেমি মৃদু একটু হেসে বলে, দারুণ কেন?
জয়িতা দরজা ছেড়ে ভিতরের দিকে সরে গিয়ে বলল, আসলে দারুণ হল ধ্রুবমামা। আমরা সবাই কমামার ভক্ত।
এ সময়ে ধ্রুবর প্রসঙ্গ ভাল না লাগারই কথা রেমির। কিন্তু আশ্চর্য–লাগল। জয়িতা তার হাত ধরে ড্রয়িংরুমের একধারে দেয়ালে একটা অ্যাবস্ট্রাক্ট মুরালের নীচে চমৎকার নরম ডিভানে নিয়ে গিয়ে টেনে বসাল। বলল, তোমার কথাও ভীষণ শুনি। তুমি তো দারুণ সুন্দরী।
তোমার কাছেও?
আমি! আমার রংটাই যা ফরসা। চুল নেই, দেখো না!–বলে নিজের চুল সামনে টেনে এনে দেখায় জয়িতা। বলে, তুমি হচ্ছ সত্যিকারের সুন্দরী। আমি দেখন সুন্দরী।
রেমি রাজার সঙ্গে কুলের মুখে কালি দিতে এসেছিল এখানে। মনটা ছিল উত্তেজনা ও রাগে টানটান। ধ্রুব তাকে বলেছে, গো আহেড। ভিতরটা পাগল-পাগল ছিল সেই থেকে। হঠাৎ সব ভুলে গিয়ে খুব হাসল রেমি, বলল, তুমি তো বেশ কথা বলো!
জয়িতা আচমকা রেমিকে দু’হাতে ধরে বলল, জানো আমরা সবাই তোমাকে হিংসে করি?
আমাকে? আমাকে হিংসে করার কী আছে?
অনেক কিছু আছে। ওরকম জঁদরেল শ্বশুর, অত টাকা, ক্ষমতা। কিন্তু আমরা তোমাকে হিংসে করি তোমার স্বামী-ভাগ্যে। ধ্রুবমামার মতো একজন প্লেবয়কে কী করে বাগালে বলো তো!
প্লে-বয় কী?
ওঃ, তুমি তো আবার সেকেলে।
মোটেই সেকেলে নই। ইংলিশ মিডিয়ামের ছাত্রী। তবে যাকে প্লে-বয় বলে, ও তো ঠিক তা নয়।
নয় বুঝি!
মোটেই নয়। বাইরে থেকে মনে হয়। আমরা তো বাইরে থেকেই মনে করি। তুমি মামি এবার ভিতরের খবর একটু আধটু বলো। রাজা ঘরে ঢোকবার পরই ভিতরের দিকে কোথায় যেন গেছে। এখনও দেখা নেই। তাতে বেঁচে গেছে রেমি। বাজার সঙ্গে নিভৃত হওয়ার চিন্তাটাই যেন তার কাছে অস্পৃশ্য মনে হচ্ছে। কেন যে এরকম হল তা বুঝল না রেমি। কিন্তু জয়িতাকে ধ্রুবর কথা বলার মধ্যে যে শিহরিত আনন্দ পেতে লাগল সে তা বলার নয়।
একদম পাগল। বুঝলে, একদম পাগল! যখন ভাল তখন ওর মতো ভাল নেই, আবার যখন বিগড়ে যায় তখন সেই বাঁকা বাঁশকে সোজা করার সাধ্যি কারও নেই।
জয়িতা খুব আগ্রহ নিয়ে শুনতে শুনতে বলে, খুব পার্সোনালিটি ওর, না?
খুব।
আমরা জানি। নইলে কৃষ্ণকান্ত চৌধুরীকে ঘোল খাওয়ানো তো সোজা নয়। তুমি একটা কথা জানো, বউদি?
কী কথা?
বললে আমাকে ঘেন্না করবে না তো?
ওমা! তোমাকে ঘেন্না করার কী আছে?
আছে। বললে হয়তো ভাববে, মেয়েটা কী রে।
বলোই না।
আমি কিন্তু একরত্তি বয়েস থেকে ধ্রুবমামাকে বিয়ে করার জন্য পাগল।
খুব হেসে উঠে রেমি বলে, যাঃ।
সত্যি। বিশ্বাস করো। আমাদের আত্মীয়তার সম্পর্কটা ফিলমজি। লতায়-পাতায় মামা ভাগনি। আসলে বিয়ে-টিয়ে অনায়াসেই হতে পারে। তাই আমি বরাবর ভেবে রেখেছিলাম বড় হয়ে ধ্রুবমামাকেই বিয়ে করব।
ওমা, করলে না কেন?
করব কী করে? লোকটা আমাকে পাত্তা দিল নাকি?
দেয়নি! তোমার মতো সুন্দরীকে যে পাত্তা না দেয় সে বোকা।
জয়িতা চোখ বড় বড় করে বলে, আর কী ডাঁটিয়াল জানো! আমি চিঠি দিতাম, ও জবাব পর্যন্ত দিত না।
চিঠি দিতে? কেন, দেখা হত না?
দেখা হলে কী হবে? এমন গম্ভীর হয়ে ডাঁট নিয়ে থাকত যে কাছে ঘেঁষতেই পারতাম না। তাই একদিন চিঠি দিলাম।
প্রেমপত্র?
তাছাড়া কী আর। তবে খুব ভিতু প্রেমপত্র। পরপর দু’বার চিঠি দিয়ে একটাও জবাব পেলাম না।
খোঁজ নিয়েছিলে চিঠি পেয়েছে কি না।
নিইনি আবার! চিঠি পেয়ে নাকি একটু ভ্রু কুঁচকেছিল। তারপর মুচকি একটু হেসেছিল দয়া করে। কেন? তোমাকে বলেনি সেসব কথা?
না, কোনওদিন বলেনি।
আসলে ধ্রুবমামার দোষ নেই। বিয়ের আগে ও অনেক প্রেমপত্র পেত। একতরফা। যতদূর জানি, নিজে কোনও মেয়েকে পাত্তা দিত না কোনওদিন? কারা প্রেমপত্র দিত জানো? আমার মতো অনেক মেয়ে।বলেই জয়িতা হঠাৎ মুখটা কানের কাছে এনে বলল, তাদের মধ্যে বউদি টউদিও আছে, কাজিনও আছে। তোমার বরকে পারলে মেয়েরা ছিঁড়ে খায়।
