কী করে বুঝলি?
বাবার খুব ইচ্ছে এখন আমার পইতে হোক।
তোর পইতে! কই উনি তো আমাকে কিছু বলেননি!
কাউকেই বলেননি। শুধু আমাকে।
কবে পইতে?
ঠাকুরমশাই দিন দেখছেন। শিগগিরই। তুমি থেকে যাও।
থাকব? বাবাকে যে বলে এলাম কালই চলে যাব।
যেয়ো না বউদি। আমার তো মা নেই।
ওঃ, খুব তো সেন্টিমেন্টে খোঁচা দিতে শিখেছিস! আমাকে মা বলে সত্যি ভাবিস নাকি?
তোমাকে একটু মা-মা লাগে কিন্তু! সত্যি।
ইয়ার্কি করছিস না তো?
একদম না। তোমাকে ছুঁয়ে বলতে পারি।
বল তো।–বলে হাত বাড়াল চপলা।
কৃষ্ণকান্ত হাতখানা ছুঁয়ে বলল, সত্যি বলছি। এবার বলো আমার পইতে পর্যন্ত থাকবে?
থাকব। তবে শর্ত আছে।
কী শর্ত?
তোকে আমার ঘরে থাকতে হবে।
সে কী?
শোন বাপু তোর ভয় নেই। আমি তোকে একটুও জ্বালাতন করব না। তুই ধ্যান-ট্যান করিস করবি। আমি বাইরে একজন চাকর মোতায়েন রাখব যাতে কেউ ঘরে ঢুকতে না পারে।
কিন্তু এ ঘর থেকে গেলে আমি বাঁচবই না।
সত্যি?
সত্যি বউদি। বিশ্বাস করো, এ ঘরে কাকা থাকে, শশীদা থাকে।
তা হলে একটা কাজ করি?
কী বলল তো?
আমি তোর এই ঘরটাতেই এসে থাকি বরং। ওদিকটায় একটা খাট পেতে নিলেই হবে।
প্রস্তাবটা খুব পছন্দ হল না কৃষ্ণকান্তর। সে বউদির দিকে প্রশ্নাতুর চোখে খানিকক্ষণ চেয়ে থেকে বলল, তোমার একটা কী যেন হয়েছে। খুব ভয় পাচ্ছ।
পাচ্ছি।
কীসের ভয় বলল তো!
সে তুই বুঝবি না।
বলো না!
বলতাম, কিন্তু তোর মতো শুদ্ধ ব্রহ্মচারীর মনটাকে নষ্ট করে দিতে ইচ্ছে হয় না। থাক গে, সব শুনতে নেই।
কৃষ্ণকান্ত ভারী সুন্দর করে একটু হাসল। তারপর হঠাৎ বলল, ছোড়দির সঙ্গে শচীনদার বিয়ে দিতে পারলে না তো, বউদি!
শচীনের নাম উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে শরীরে বিদ্যুৎ খেলে গেল চপলার। সে স্পষ্ট টের পেল তার মুখ রক্তশূন্য হয়ে যাচ্ছে, বুক কাঁপছে।
চপলা হাসবার চেষ্টা করে বলল, কই আর পারলাম!
ছোড়দিটা খুব বোকা না?
বোধহয়।
কৃষ্ণকান্ত একটু ভেবে নিয়ে বলে, মুখে যা-ই বলুক ছোড়দি কিন্তু শচীনদাকেই বিয়ে করতে চায় জানো?
না তো। কী করে জানব? তুই টের পেলি কী করে?
আমি টের পাই।
তা হলে ওরকম করল কেন?
কে জানে! কিন্তু মাঝরাতে উঠে কাঁদতে বসত। আমি দু-একদিন দেখেছি।
একটু গম্ভীর হয় চপলা। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। তারপর বলে, তুই কি বিশাখার জন্য খুব ভাবিস?
না তো! ভাববার কী আছে? শচীনদার জন্য একটু কষ্ট হয়।
কেন?
শচীনদা যে ভীষণভাবে ছোড়দিকে বিয়ে করতে চায়।
আবার কেঁপে ওঠে চপলার বুক।
একটু শ্বাস তার বুকে আটকে আঁকুপাঁকু করতে থাকে। কম্পিত গলায় সে বলে, কী করে বুঝলি?
শচীনদা যে ছোড়দিকে চিঠি দেয়।
দেয়? সত্যি?—চপলার চোখ বড় হয়ে ওঠে ক্রমে।
দেখবে?
তোর কাছে আছে?
আছে।-বলে কৃষ্ণকান্ত তার টেবিলের টানা থেকে একটা মুখ-আঁটা খাম বের করে আনে।
মুখ-আঁটা খামটা হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে বসে থাকে চপলা। বুকের ভিতরটা-ধড়ফড় করতে থাকে। শচীনের হাতের লেখা সে চেনে। খামের ওপর তারই গোটা হাতের লেখায় শ্রীমতী বিশাখা চৌধুরী নামটা দেখেও যেন বিশ্বাস হয় না। সে জিজ্ঞেস করল, এ চিঠি তুই কোথায় পেলি?
শচীনদা তো আজই বিকেলবেলায় চিঠিটা আমাকে দিয়ে বলল, ছোড়দির কাছে পৌঁছে দিতে।
এতে কী লেখা আছে জানিস?
না। কী করে জানব! পরের চিঠি পড়তে নেই।
চপলার মন আঁকুপাঁকু করছে জানার জন্য। চিঠিটা সে ব্লাউজের মধ্যে রেখে বলল, আমি বিশাখাকে দিয়ে দেবখন।
দিয়ো।
এরকম আরও চিঠি দিয়েছে নাকি?
না। এই প্রথম আমাকে চিঠি পৌঁছে দিতে বলো।
একটু নিশ্চিন্ত হয় যেন চপলা। শচীনের হাত এড়িয়ে সে পালাতে চাইছে কলকাতায়, তবু কী আশ্চর্য, নিজের অধিকারটুকু পাছে চলে যায় সেই ভয়ে পাগল হয়ে যাচ্ছে ভিতরে ভিতরে।
চপলা উঠে দাড়িয়ে বলল, আমি যাচ্ছি রে। তুই পড়।
কলকাতায় যাবে না তো!
দেখি শ্বশুরমশাইয়ের সঙ্গে কথা বলতে হবে। তোর পইতের দিন কবে ঠিক হল আগে জেনে নিই।
ছোড়দি কেমন আছে গো, বউদি?
ভালই তো!
না। ছোড়দিটা বড় কান্নাকাটি করত। ওর জন্যই আরও আমি পালিয়ে চলে এসেছি।
ভাবিস না। দেখবি সব ঠিক হয়ে যাবে। মেয়েরা কথায় কথায় কাঁদে।–বলতে বলতে আনমনে দরজার কাছ থেকে মুখ ফিরিয়ে বলে, যোগীবর, তোমার ভয় নেই। আমি তোমাকে যোগভ্রষ্ট করতে এ ঘরে আসব না। তবে মাঝে মাঝে দেখে যাব। তাতে দোষ নেই তো!
শৈশব ও যৌবনের মধ্যবর্তী একটা অদ্ভুত দ্বৈত সত্তার টানাপোড়েন চলছে এখন কৃষ্ণকান্তর মধ্যে। সে এবার যে হাসিটা হাসল তা শিশুর মতো। বলল, কী যে বলো না!
চপলা অন্ধকার মাঠটা ধীর পায়ে পার হয়। ধীরে ধীরে নিজের ঘরে আসে সে। আজ সন্ধেবেলায় এই ঘরের দরজার কাছেই তাকে স্পর্শ করেছিল শচীন। তার সমস্ত শরীর শাঁখের মতো বেজে উঠেছিল সেই স্পর্শে। সাড়া দিয়েছিল। অনাবৃষ্টির তৃষিত শরীরও ছিল পুরুষ-স্পর্শের জন্য উন্মুখ। কিন্তু এই প্রাচীন বাড়ির পুরনো বদ্ধ বাতাসে সংস্কারের ভূতও তো কিছু আছে, যেমন আছে গুপ্ত প্রণয়ের অনেক কেলেঙ্কারি। চপলার অর্ধেক মন নত হয়েছিল শচীনের কাছে, বাকি অর্ধেক আড় হয়ে ছিল।
চপলা জলে ভিজিয়ে খুব ধীরে ধীরে সাবধানে খামের জোড় খুলে ফেলে। বর্ষাকালের ভেজা বাতাসে আঠা তেমন জোড়েনি ভাল করে। চমৎকার নীলাভ একটা কাগজে ছোট ছোট সুন্দর হস্তাক্ষর।
বিশাখা, তোমার চিঠি পেয়েছি। এত কিছু হয়ে যাওয়ার পর নতুন করে আবার তোমার কাছ থেকে এরকম প্রস্তাব আশা করিনি। হঠাৎ কেনই বা এরকম পাগলের মতো আচরণ করছ? আমার বিয়ে করবার কোনও সংকল্প নেই। বাড়ি থেকে যে প্রস্তাব উঠেছিল তাতে আমি অসম্মতি জানিয়ে দিয়েছি।
