বেড়ালটা নির্নিমেষ চোখে চেয়ে ছিল ধ্রুবর দিকে। মৃদু আর-একটা মিয়াও আওয়াজ করল সে।
আতঙ্কিত ধ্রুব কিছুতেই বেড়ালটার চোখ থেকে চোখ সরাতে পারছিল না। তার মনে হচ্ছিল বেড়ালটা তাকে সম্মোহিত করে ফেলেছে। খুব ধীরে ধীরে তার বাহ্যচেতনা লুপ্ত হয়ে যাচ্ছে।
অসহায় ধ্রুব বিকারগ্রস্তের মতো ডাকল, জগাদা! জগাদা!
দরজাটা হাট করে খুলে গেল হঠাৎ। জণর বিশাল চেহারাটা দাঁড়াল দরজা জুড়ে।
কী ব্যাপার! এখনও শোওনি?
ধ্রুব বেড়ালটার দিকে আঙুল দেখিয়ে বলল, ওটা এখানে কেন? কী চায়?
জগা বেড়ালটাকে দেখে নিচু হয়ে কোলে তুলে নিয়ে একটু আদর করে বলল, আহা, বউমা নেই বলে ভারী একা হয়ে পড়েছে বেচারা। ঘুরে ঘুরে খুঁজছে।
ধ্রুব একটা বড় শ্বাস ফেলল। ভয়টা বেরিয়ে গেল শ্বাসের সঙ্গে। বলল, তোমার ছেলেকে এখানে শুতে বলেছি।
হ্যাঁ, বলছিল আমাকে। কিন্তু শোওয়ার কি কারও সময় হবে আজ? বউমার অপারেশন শুরু হল বলে। বাবু ফোন করেছিল, রক্ত দিতে পারে এমন কয়জন লোক চাই।
ধ্রুব হঠাৎ নড়েচড়ে বসে বলল, সে তো আমিও দিতে পারি।
জগা হাসল, সে তো ভাল কথা। বউমার জন্য যদি কিছু করতে পারো তাহলে বুঝব মরদ। কিন্তু যা মাল টেনে বসে আছ এ অবস্থায় ডাক্তাররা কি তোমার রক্ত নিতে চাইবে?
তবু আমি সঙ্গে যাব।
তুমি খুব ভয় খেয়েছ কুট্টি। কীসের এত ভয় তোমার?
জানি না। তবে ভয় খাচ্ছি ঠিকই। জগাদা চাবি দাও। আর খানিকটা না খেলে আমি মরে যাব।
জগা ট্যাঁক থেকে চাবিটা বের করে ধ্রুবর দিকে ছুঁড়ে দিয়ে বলল, কুট্টি, তোমার সব সাহস বিপ্লব আর তেজ গিয়ে এখন বোতলে জমা হয়েছে। এটা কিন্তু খুব কেরানির কথা নয়। যাও, গিলে পড়ে থাকো। মা বাপ বউ বা দুনিয়ার জন্য কিছু তোমাকে ভাবতে হবে না। কিছু ভাল লোক দুনিয়াকে চালিয়ে নেয়, আর তোমার মতো কিছু ফালতু লোক বসে বসে খায় আর ফুর্তি করে।
তুমি আমাকে ঘেন্না করো, জগাদা?
না, কোলে পিঠে করে মানুষ করেছি, ঘেন্না করতে চাইলেই বা পারব কেন?
আমি তোমাদের সঙ্গে যাব। তার আগে একটু মেরে নিই, দাঁড়াও।
০০৫. ধনীর বাড়িতে শোক
ধনীর বাড়িতে শোকের তেমন উচ্ছ্বাস থাকে না। অর্থ, আরাম, বিলাস ও ব্যসন মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের মধ্যে একটা দূরত্ব রচনা করে। আত্মীয়তার বন্ধন সেখানে শিথিল হতে বাধ্য। কোকাবাবুর বাড়িতে শোকের একটা সৌজন্যসূচক স্তব্ধতা বিরাজ করছে বটে, কিন্তু প্রকৃত শোক যে এ নয় তা বারবাড়ি পার হয়ে গাড়িবারান্দা অতিক্রম করে বৈঠকখানায় ঢুকতে ঢুকতেই অনুভব করলেন হেমকান্ত।
কোকাবাবুর এস্টেটের কর্মচারীরা অভ্যাগতদের অভ্যর্থনা জানাতে প্রস্তুত হয়েই ছিল। প্রৌঢ় নায়েব বিশ্বেশ্বর এগিয়ে এসে জোড়হাতে বলল, আসুন, আসুন।
হেমকান্তর বুকে এক প্রগাঢ় যন্ত্রণা থাবা গেড়ে আছে। না, কোনও ব্যথা বা বেদনা নয়, জ্বালা নয়। যেন একসেরি একটা লোহা তাঁর হৃৎপিণ্ডের সঙ্গে লেগে ঝুলে আছে। বৈঠকখানায় অনেক বিশিষ্ট ব্যক্তি সময়োচিত গাম্ভীর্য মুখে মেখে বসে আছেন। প্রায় সকলকেই হেমকান্ত চেনেন। নীরবে দু-একজন হাত জোড় করে নমস্কার জানালেন তাঁকে। দু-একজন হতাশাভরে মাথা নাড়লেন। মোক্তার রাজেনবাবু উঠে এসে হেমকান্তর সঙ্গে ভিতরবাড়ির দিকে হাঁটতে হাঁটতে বললেন, কোকাবাবুর বিষয়-সম্পত্তির অবস্থা খুবই খারাপ।
হেমকান্তকে খবরটা স্পর্শ করল না। নির্বিকার মুখে বললেন, তাই নাকি?
কেন, আপনি জানেন না?
তো। ইদানীং প্রায় সবই গোপনে বিক্রি করে দিচ্ছিলেন। কিন্তু নগদ টাকাও কিছু দেখা যাচ্ছে না কোথাও। ছেলেতে-ছেলেতে তুমুল হচ্ছে।
হেমকান্ত আর-একটু বিবর্ণ হয়ে গেলেন। রাজেনবাবু ফের বৈঠকখানায় ফিরে গেলেন। বিশ্বের আগে আগে পথ দেখিয়ে নিয়ে হেমকান্তকে কোকাবাবুর ঘরে হাজির করে দিল।
আশ্চর্য, আজও কোকাবাবুর ঘরের এক কোণে বসে ক্লান্ত এক কীর্তনীয়া তারকব্রহ্ম নাম করে যাচ্ছে, মৃদু করতালের সঙ্গে। ডাক্তার সূর্যকান্ত সেন একটি চেয়ারে গম্ভীর মুখে বসে আছেন। আর একটি চেয়ারে কোকাবাবুর বড় ছেলে মাথায় হাত দিয়ে বসা। দু-একজন দাসী ও চাকর উদ্দেশ্যহীনভাবে দাঁড়িয়ে আছে। কোকাবাবুর শ্বাস উঠেছে। জ্ঞান নেই। গলায় আজ একটা নতুন জিনিস দেখতে পেলেন হেমকান্ত। সোনার একটা চেন ছিল। সেটি নেই। তার জায়গায় একটা কাঠির মালা পরানো।
কী একা, কী আত্মীয়-পরিজনহীন আজ কোকাবাবু! মৃত্যু মানেই কি একাকীত্ব ও পরিজনহীনতা? মুমূর্ষ ওই মানুষটি কি এই মুহূর্তে টের পাচ্ছেন যে, তার স্ত্রী আছে, পুত্রকন্যা আছে, বিষয়-সম্পত্তি আছে? এমনকী দেহ বা অস্তিত্বই কি অনুভব করছেন? সেই ফরসা ও সুন্দর চেহারাটির আজ কী দশা! এই দেহটি একটু পরেই অগ্নিতে সমর্পিত হবে। তখন কোকাবাবু কোথায়?
কে একজন একটি চেয়ার এগিয়ে দিল। কিন্তু হেমকান্ত বসলেন না। তাঁর মনে হল বসতে গেলেই তিনি মূৰ্জিত হয়ে পড়ে যাবেন।
তিনি সূর্য ডাক্তারের চেয়ারের হাতলটি ধরে দাঁড়িয়ে রইলেন। সূর্য ডাক্তার ধীরে ধীরে উঠে তার কানে কানে বললেন, আর কয়েক মিনিট। হয়ে এসেছে।
হেমকান্ত জিভ দিয়ে শুকনো ঠোঁট ভেজানোর চেষ্টা করলেন। কিন্তু জিভটাও শুকনো এবং খড়খড়ে। মানুষ এত নিষ্ঠুরভাবে আর-একজন মানুষের মৃত্যুর কথা ঘোষণা করে কী করে? নিজের মৃত্যুর অমোঘতার কথা তার মনে পড়ে না?
