কৃষ্ণকান্ত ভারী লাজুক একটু হাসল। কী সুন্দর যে দেখাল ওকে। মুগ্ধ দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে চপলা।
কৃষ্ণকান্ত বলল, খবর নিই না কে বলল? আমি রোজ তোমার কথা ভাবি।
থাক আর বানিয়ে বানিয়ে বলতে হবে না। এ ঘরে বসে তুই দিনরাত কী করিস বল তো!
এই পড়াশুনো করি।
সবাই বলে তুই নাকি ব্রহ্মচর্য করছিস। মেয়েদের দিকে তাকাস না।
ঠিক তা নয়।–কৃষ্ণকাও লজ্জা পেয়ে বলে।
তোকে আমি খুব ভাল চিনি, বুঝলি হনুমান? ব্রহ্মচর্য করছিস তো কী? তা বলে আমার মুখও দেখবি না নাকি?
তাই বলেছি! আজকাল অনেক কাজ পড়েছে, বউদি। ভোরবেলা সংস্কৃত পড়ি। লাঠিখেলা, ছোরাখেলা শিখি, ব্যায়াম করি, ধ্যান করি।
তুই এতসব করছিস কেন বল তো! স্বদেশি হবি নাকি সত্যিই?
এমনিই। স্বদেশিরা ছাড়া বুঝি এসব কেউ করে না?
কী জানি বাপু তোর এই বয়সে এসব লক্ষণ আমার মোটেই ভাল লাগে না।
এই বলে চেয়ারের পাশে চৌকির বিছানায় বসল চপলা। তারপর ডান হাতখানা বাড়িয়ে রূপবান দেওরটির মাথায় একটু হাত বুলিয়ে দিতে গিয়ে তার চোখে জল এল।
বউদির হাতের স্পর্শটি খুব স্বস্তিকর বোধ হচ্ছিল না কৃষ্ণকান্তর। বাস্তবিকই সে মেয়েদের সংস্পর্শ সম্পূর্ণ বাঁচিয়ে চলছে আজকাল। মেয়েদের কথা সে ভাবে না, তাদের দিকে তাকায় না, স্পর্শ গোমাংসের মতো পরিহার করে চলে। কিন্তু বউদিকে সে কিছু বলতে পারে না। বউদি তাকে বড় বেশি ভালবাসে। সে শুধু কাঠ হয়ে রইল।
চপলা আঁচলে চোখ মুছে বলে, কাল চলে যাচ্ছি।
কৃষ্ণকান্ত অবাক হয়ে বলে, কোথায় যাচ্ছ?
কলকাতা।
কেন? এত তাড়াতাড়ি যাওয়ার কথা তো ছিল না তোমার!
যাচ্ছি। আর ভাল লাগছে না রে।
কেন ভাল লাগছে না?
এ বাড়ির কেউই আমাকে পছন্দ করে না।
যাঃ, কী যে বলো!
তুই সব কথা জানিস না। আজকাল তো ভিতর-বাড়ির সঙ্গে সম্পর্ক নেই তোর।
আমি তো তোমাকে খুব পছন্দ করি।
তার তো নমুনা দেখতেই পাচ্ছি। দিনে একবারও খোঁজ করিস না বউদিটা বেঁচে আছে না মরে গেছে।
আমি তোমার খবর নিই। রোজ নিই। বিশ্বাস করো।
আচ্ছা করলাম।
তবে যাচ্ছ কেন? কে তোমাকে পছন্দ করে না?
চপলা খুব অন্যমনা হয়ে দেয়ালের দিকে চেয়ে বইল, জবাব দিল না। অনেকক্ষণ বাদে হঠাৎ বলল, তুই এত ঘর থাকতে এই ঘরটা বেছে নিলি কেন বল তো! এই ঘরটা তোর কি খুব ভাল লাগে?
কৃষ্ণকান্ত মৃদু হেসে কুণ্ঠিত গলায় বলে, এ ঘরটি একটু অন্যরকম, বউদি।
কীরকম?
অন্য সব ঘরের মতো নয়।
কিন্তু ঘরটা তো একদম বিচ্ছিরি। দেয়ালে নোনা ধরেছে, জানালার পাল্লা ভাঙা, চৌকিটা নড়বড়ে। লোকে বলে, এ ঘরে ভূতও আছে।
কৃষ্ণকান্ত মাথা নেড়ে বলে, দূর। সব বাজে কথা।
তুই কখনও ভূত দেখিস না?
না তো?
একা থাকতে পোর ভয় করে না?
না। একা তো থাকি না।
তাই নাকি? তোর সঙ্গে কে থাকে তবে?
কাকা।
কাকা! কাকা আবার কে রে?
আর শশীদা।
চপলা অবাক হয়ে দেওরের দিকে চেয়ে বলে, কী সব বলছিস! তোদের সেই শশীদা তো এখন জেলখানায়, তার ফাঁসি হবে। আর কাকা কে বল তো! নলিনীকান্ত?
কৃষ্ণকান্ত মাথা নেড়ে বলে, আমি কাকার ভয়েস শুনতে পাই।
ওমা!
সত্যি বউদি। যখন ভয়-ভয় করে, মাঝরাতে যদি হঠাৎ ঘুম ভেঙে যায়, তখন কাকার গলা কানে আসে।
চপলা শিউরে উঠে দেওরের হাত চেপে ধরে বলে, তোর মাথা খারাপ হয়ে গেছে।
কৃষ্ণকান্ত কাঁদো কাঁদো হয়ে বলে, সত্যি শুনি, বউদি। বিশ্বাস করো। কাকা বলে, ভয় কী রে! ভয় কী? আমি তো আছি।
চপলা বড় বড় চোখে চেয়ে ছিল। বলল, আমি তোকে আর এ ঘরে থাকতে দেব না।
কেন বউদি?
তোকে ভূতে পেয়েছে।
দূর! ভূত নয়। ভূত মানে যা অতীত। কিন্তু কাকা তো ভূত নয়। কাকা আছেন যে!
মাগো! তুই কী রে? শুনেই তো আমার গায়ে কাঁটা দিচ্ছে।
এই ঘরে শশীদাও আছে। শশীদা তো আর মরেনি।
তুই কি তারও ভয়েস শুনিস?
না। শশীদা যতদিন আমাদের বাড়িতে ছিল ততদিন কেবল ভুল বকত। খুব জ্বর ছিল। পরে জ্বর একটু কমলে একদিন আমাকে বলেছিল, তোমার ভিতরে ফায়ার আছে।
কীসের ফায়ার?
তা জানি না। তবে বলেছিল। আমি যখন বিছানায় শুই তখন নিজেকে একদম শশীদা বলে মনে হয়।
সেটা আবার কীরকম?
মনে হয় আমি সাহেব খুন করে পালিয়ে এসেছি। পুলিশ আমাকে খুঁজে বেড়াচ্ছে। ধরতে পারলেই নিয়ে গিয়ে ফাঁসিতে ঝোলাবে। ভাবতে এত আনন্দ হয় না।
চপলা ক্রমে বিস্ময়ে স্থির হয়ে যাচ্ছিল। চোখ ক্রমে বিস্ফারিত হচ্ছে।
তুমি শুনে ভয় পাচ্ছ, বউদি?
ভীষণ ভয় পাচ্ছি। লক্ষ্মীসোনা, আমার একটা কথা রাখবি?
কী কথা?
আগে আমাকে ছুঁয়ে বল কথাটা রাখবি।
ও বাবা, ওসব কিরে-টিরে আমি কাটতে পারব না। বলো না কী!
আমার সঙ্গে কাল কলকাতায় চল।
কলকাতা! না বউদি, আমার ভাল লাগে না।
লক্ষ্মীসোনা, বরাবরের মতো নয়, কয়েকদিনের জন্য চল।
কেন বলো তো?
তোর মাথা থেকে ওই ভূতগুলো না নামালে আমার শান্তি নেই।
তুমি যে কেন খামোকা ভয় পাচ্ছ? আমার তো বেশ লাগে।
ছাই লাগে। তোর মাথারই ঠিক নেই। তোর চোখ-মুখও কেমন অন্যধারা হয়ে গেছে। চোখদুটো অত জ্বলজ্বল করে কেন তোর?
করে! সত্যি করে?–কৃষ্ণকান্ত খাড়া হয়ে বসে ব্যগ্র গলায় জিজ্ঞেস করে।
করেই তো। একদম ডাকাতের মতো, খুনির মতো চোখ। এত অল্প বয়সে তোর চোখ এরকম। হল কী করে, ভূতে না পেলে?
আমি যে রোজ ধ্যান করি।
কার ধ্যান করিস?
সে আছে।
তোর মাথা খারাপ হতে আর বাকি নেই। আমি শ্বশুরমশাইয়ের কাছে যাচ্ছি এখনই। দাঁড়া।
কৃষ্ণকান্ত মাথা নেড়ে বলে, আমাকে কলকাতা যাওয়ার পারমিশন বাবা এখন দেবে না।
