রেমি অবাক হল না। এ তো সে জানেই। ঘেন্নায় মুখটা একটু কুঁচকে বলল, তোমরা কী বলল তো!
খারাপ। খুব খারাপ। এরপরও শ্বশুরকে তোমার ঘেন্না হয় না?
রেমি জবাব দিল না। মুখ ফিরিয়ে বেরিয়ে এল।
পিছন থেকে ধ্রুব বলল, রেমি, এই বাড়ি থেকে যাতে কেউ তোমার পিছু না নেয় সেজন্য আমি চেষ্টা করেছি। জগাদাকে অন্য একটা কাজে লাগিয়ে রেখেছি। তবু যদি নেয় তবে একটু কাটিয়ে দিয়ো।
পিছু নেবে?—রেমি একটু থেমে যায়।
ঠিক পিছু নেওয়ার কথা নয়। কার সঙ্গে মিট করছ সেটা দেখে চলে আসবে। কিন্তু আমার মনে হয় সেটাও উচিত নয়। তুমি বরং একটু ঘুরে-টুরে কালীঘাট পার্ক হয়ে তারপর গির্জার দিকে যাও।
রেমি মাথা নেড়ে বলল, পারব না। আমি তো চুরি করছি না। যে খুশি পিছু নিক, দেখুক।
ভয়টা তোমার নয়। রাজার। কেষ্ট চৌধুরী তোমাকে কিছু বলবে না, কিন্তু ওর পিছনে লোক লাগাবে।
রেমি পুরোটা শুনতে দাঁড়াল না। বেরিয়ে এল।
গির্জার গলির মুখে রাজা দাঁড়িয়ে ছিল। রেমিকে দেখেই তার মরা চোখ ধক করে জ্বলে উঠল।
এই! তুমি কেমন আছ?
রেমি একটু হাসবার চেষ্টা করল। মাথা নেড়ে লাজুক ভঙ্গিতে বলল, ভাল। তুমি?
আমি ভাল নেই, রেমি। দিনরাত হাঁ করে তোমার কথা ভাবছি।
অত ভাবার কী?
তুমি বোধহয় আমার কথা ভাবো না?
ভাবি। কিন্তু তোমার মতো পাগল তো নই। একটা ট্যাকসি ধরো।
কোথায় যাবে?
যেখানে নিয়ে যাবে সেখানেই যাব। এখানে নয়। চলো।
ট্যাকসিতে উঠেই একটু অসভ্যতা শুরু করেছিল রাজা। হাত চেপে ধরল। বার দুই চুমু খাওয়ার চেষ্টা করল। ওর গা জোরো রুগির মতো গরম। চোখ জ্বলজ্বলে। একটা খ্যাপামি খুব ভালরকম পেয়ে বসেছে রাজাকে। কিন্তু রেমির শালীনতা বোধ অন্যরকম। ট্যাকসিতে কি চুমু খাওয়া যায়! বিশেষত অচেনা ট্যাকসিওলা একজন পুরুষমানুষ এবং তার সামনে একটা আয়নাও রয়েছে, যা দিয়ে সে প্যাসেঞ্জারদের ভালরকম জরিপ করে।
কী হচ্ছে, রাজা?
কতকাল পরে তোমাকে এত কাছে পেয়েছি, রেমি।
চিরকালের মতোই তো পাবে। ট্যাকসিতে এসব নয়।
চলো তা হলে আমার ফ্ল্যাটে।
সেখানে কী?
আমি তোমার সবটুকু চাই। আজই। এক্ষুনি।
রেমি দাঁতে ঠোঁট কামড়াল। ক্ষতি কী? তার কোনও শারীরিক কামনা নেই এখন। কোনও ভালবাসার আবেগও কাজ করছে না। তবু ক্ষতি কী? ধ্রুব চৌধুরীরও জানা উচিত যে তার সতীলক্ষ্মী বউ আর সেরকম নেই। নষ্ট হয়েছে।
রেমি বলল, ঠিক আছে। আমি একটা টেলিফোন করব তার আগে।
টেলিফোন কেন?
দরকার আছে। প্রশ্ন কোরো না।
ট্যাকসি এক জায়গায় দাঁড় করায় রাজা। রেমি নামতে নামতে বলে, তুমি এসোনা, প্লিজ। আমি একা কথা বলব।
রাজা নড়ল না, কিন্তু সন্দিহান চোখে চেয়ে রইল।
রেমি ওষুধের দোকানে ঢুকে ফোন করল।
ধ্রুব চৌধুরী আছেন?
ওপাশ থেকে জগা বলে, আপনি কে?
জগাদা, তোমার দাদাবাবুকে ডেকে দাও। আমি রেমি।
কথা বলতে বলতেই ধ্রুব ফোন হাতে নেয়, বলল রেমি।
আমি রাজার ফ্ল্যাটে যাচ্ছি।
ও। তাতে কী?
বুঝতে পারছ না?
পারছি তো। তুমি ওর ফ্ল্যাটে যাচ্ছ। তারপর?
তারপর কী হতে পারে অনুমান করো।
কী হবে?
অনেক কিছু। যা যা হওয়া সম্ভব।
ও। তা এটা জানাতে আমাকে টেলিফোন কেন?
বাঃ, তোমাকে জানাব না?
কেন? আমি তো বাধা দিইনি কখনও।
তবে বলছ না কেন—গো অ্যাহেড?
তুমি কিন্তু চেঁচাচ্ছ, রেমি। কোনও পাবলিক প্লেস থেকে কথা বলছ না তো? তা হলে সবাই কিন্তু শুনছে।
রেমি সচেতন হয়ে দেখে, বাস্তবিকই দোকানদাব আর খদ্দেররা তার দিয়ে চেয়ে আছে। একটু লজ্জা পেয়ে সে গলা নামিয়ে বলে, তুমি তা হলে অনুমতি দিচ্ছ?
অনেকদিন আগেই দিয়েছি।
শ্বশুরমশাই শুনলে কী বলবেন?
সেটা তিনিই জানেন। কিন্তু তুমি অত অনুমতির ধার ধারছ কেন? এসব কি মেয়েরা স্বামী আর শ্বশুরকে জানিয়ে করে?
আমি জানালাম। আমি তো ভয় পাই না, তাই জানালাম।
ভয়ের কী? গো অ্যাহেড।
রেমি ফোনটা রেখে দিল।
তার আশা ছিল, রাজার ফ্ল্যাটে যাচ্ছে এ খবরটা জানিয়ে রাখলে সেখানে হয় ধ্রুব গিয়ে হাজির হবে, না হয় অন্তত জগাকে পাঠাবে। একটা কিছু হবেই। হবেই।
কিন্তু রাজার ফ্ল্যাটে কেউ বাধা দিতে আসেনি। কেউ না।
০৫৯. চপলা খুব ধীরে ধীরে
চপলা খুব ধীরে ধীরে নলিনীকান্তর পুরনো, পরিত্যক্ত ঘরখানার দিকে এগিয়ে গেল। প্রায় পা টিপে টিপে। আজকাল কৃষ্ণকান্ত এই ঘরে থাকে। স্বেচ্ছা-নির্বাসনের মতোই। সে কদাচিৎ ভিতর বাড়িতে যায়। বলাই বাহুল্য, এই ঘরখানাকে বাড়ির অন্য সবাই ভয় পায়। কারণ এ ঘরের বাসিন্দা নলিনীকান্তর অপঘাতে মৃত্যু ঘটেছিল। হর কম্পাউন্ডার থেকে শুরু করে অনেকেই নলিনীর ভূতকে ঘোরাফেরা করতে দেখেছে। কিন্তু কৃষ্ণর কেন ভূতের ভয় নেই? সব বাচ্চাদের থাকে, কৃষ্ণরই কেন নেই তা বুঝতে পারে না চপলা। এই কিশোর দেওরটি ক্রমেই নিজেকে একটা কুয়াশা দিয়ে ঢেকে ফেলছে যেন।
চপলা ভেজানো দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে একটু দ্বিধা করল। ভিতরে ঢুকতে কেমন কেমন লাগছে। আজকাল কৃষ্ণ নাকি ধ্যান করে, মৌন পালন করে, স্ত্রীলোকের মুখের দিকে সহজে তাকাতে চায় না।
কিন্তু চপলা ওর সঙ্গে আজ একটু কথা না বলে পারবে না। আস্তে দরজাটা ঠেলল সে। ভেজানো দরজা ফাঁক করে দেখল, কৃষ্ণকান্ত টেবিলে বাতির আলোয় লেখাপড়া করছে। প্রাইভেট টিউটর পড়িয়ে চলে গেছে। এখন সে একা।
চপলাকে দেখে কৃষ্ণকান্ত একটু হাসল। বলল, এসো বউদি।
চপলা ঘরে ঢুকে দরজা ভেজিয়ে দিয়ে বলল, কী রে হনুমান, কদিন হল বউদির খোঁজ নিস না যে বড়!
