বাড়ি ফাঁকা। রেমি দোতলার সামনের বারান্দায় দাঁড়িয়ে রাস্তা দেখছিল।
দেখতে দেখতে আনমনা রেমি হঠাৎ ভীষণ চমকে উঠল। গলির মধ্যে আজকাল কয়েকটা দোকান হয়েছে। বাড়ির ফটকের উলটোদিকেই একটা পানের দোকান। এতদিন লক্ষ করেনি রেমি। দেখতে পেল সেই দোকানের সামনে রাজা দাঁড়িয়ে আছে। উদভ্রান্ত চেহারা। উর্ধ্বমুখ হয়ে তাকে অবাক চোখে দেখছে।
চোখে চোখ পড়তেই হাত তুলে রেমিকে দাঁড়াতে ইঙ্গিত করে কোথায় যেন চলে গেল খুব তাড়াতাড়ি হেঁটে।
রেমি বিবশ হয়ে গেল। রাজা কি প্রায়ই ওখানে এসে দাঁড়িয়ে থাকে আজকাল! তাকে দেখার জন্য? সে কখনও টের পায়নি তো আগে!
একটা শিহরন আর ভয় খেলা করে গেল রেমির শরীরে। তাকে যে এমনভাবে কেউ কামনা করে, এত পাগলের মতো তাকে চায় এটা ভাবলেই শিউরে ওঠে গা। কিন্তু পাগলটা এত বিপজ্জনকভাবে যদি রোজ এসে হানা দেয় তা হলে ধরা পড়ে যাবে। এ বাড়িতে আসতে বাধা নেই রাজার। অনায়াসেই আসতে পারে। সেটা দৃষ্টিকটুও হবে না। কিন্তু ওই পানের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে হাঁ করে চেয়ে থাকাটাই অস্বাভাবিক। ও কেন করে ওরকম?
রেমি হঠাৎ শুনতে পেল ফোন বাজছে। ফোন তার ধরার কথা নয়। কিন্তু হঠাৎ তার মনে হল, ফোনটা হয়তো রাজাই করছে।
সে ঘরে এসে ফোন তুলে নিল কানে, কে বলছেন?
রেমি, আমি রাজা।
আন্দাজ করেছিলাম। কী ব্যাপার বলে তো! ওরকমভাবে বাইরে দাঁড়িয়ে ছিলে কেন?
সাধে কি আর ওভাবে দাঁড়াতে হয়? তোমার শ্বশুর আমাকে ওয়ার্নিং দিয়েছে। বাড়িতে ঢুকলে খুন করবে।
বলো কী? কেন, তুমি কী করেছ?
যা করেছি তা তো তুমি জানোই। তোমার সঙ্গে মেলামেশা।
সেটা তো উনিই করতে বলেছিলেন।
হ্যাঁ, কিন্তু উনিই আবার আইন পালটেছেন। উনি যখন যেভাবে নাচাবেন আমাদের তেমনি নাচতে হবে।
রেমি খুব ক্লান্ত বোধ করে বলল, ওঁর ছেলেও তো আমার সঙ্গে ডিভোর্স চাইছে। তুমি কথাটা ওঁকে বলেছ?
না। ওসব বলে লাভ নেই। উনি কানে তুলবেন না। মানুষটা ওর কাছে বড় কথা নয়। বড় হচ্ছে ফ্যামিলি। কুট্টিদা তোমাকে ছাড়লেও উনি তোমাকে ও-বাড়ি থেকে বেরোতে দেবেন না। দরকার হলে খুন করবেন, তবু বাড়ির বউকে অন্য পুরুষের ঘর করতে দেবেন না।
রেমি একটু দ্বিধায় পড়ে বলল, ঠিক তা নয়, রাজা। তোমার কুট্টিদা আমাকে তাড়ালেও উনি আমাকে ভীষণ ভালবাসেন। এমনকী সব বিষয়সম্পত্তি আমার নামে লিখে দিতেও চেয়েছিলেন।
ওসব বিশ্বাস কোরো না, রেমি। পালাও। পালাব? পারলে এক্ষুনি। যদি বাঁচতে চাও। তুমিই তো বলছ উনি খুন করবেন। আমাদের রিস্ক নিতে হবে।
আমি যে-কোনও রিস্ক নিতে পারি, রাজা। মরতে আমার একটুও ভয় নেই। কিন্তু তোমাকে বিপদে ফেলতে ইচ্ছে করে না।
আমার বিপদ তোমাকে না পেলে। তোমাকে না পেলে আমি মরে যাব।
রেমি একটু ম্লান হাসল। ঠোঁট কামড়ে বলল, সে তো বুঝতেই পারছি। নইলে বোকার মতো পানের দোকানে দাঁড়িয়ে থাকতে না।
গত চারদিন ধরে রোজ ঘণ্টা চারেক এই গলিতে ঘোরাঘুরি করি।
কেউ দেখে ফেলেনি তো!
না। গলির মোড়ে লাল বাড়িটায় আমার এক বন্ধু থাকে। দরকার হলে তার ঘরে ঢুকে পড়ি। বন্ধু কি সব জানে?
না জানলেও আন্দাজ করছে। আমার মুভমেন্টটা তো যথেষ্ট সন্দেহজনক।
কেন অমন করছ, রাজা? আমি এমন কিছু দুর্লভ তো নই।
এখন ভীষণ দুর্লভ। আর তুমি যত দুর্লভ হবে আমি তত পাগল হব।
প্লিজ, পাগল হোয়ো না। তুমি যদি বাড়িতে ঢুকতে সাহস না পাও তা হলে আমিই বেরোব। দেখা করব তোমার সঙ্গে।
পারবে?
রেমি হাসে, পারব না কেন? কেউ তো আমাকে আটকাচ্ছে না।
কুট্টিদা বাড়িতে নেই?
আছে। থাকলেই কী?
ওর সামনে দিয়ে বেরিয়ে আসতে পারবে?
ওমা! কী বলে রে পাগল! ও তো আমি গেলেই বাঁচে।
এখন আসতে পারবে, রেমি?
পারব।
আমি মোড়ে অপেক্ষা করি তা হলে?
না। তুমি ট্রাম ডিপোর কাছে গির্জার গলির মুখটায় থাকো। আসছি।
উঃ, বাঁচালে! তোমাকে না দেখে একদম থাকতে পারছি না।
আমিও না।
ফোনটা রেখেই রেমি বুঝতে পারল তার শেষ কথাটা সম্পূর্ণ মিথ্যে এবং বানিয়ে বলা। রাজাকে দেখে তার বেশ কয়েকটা দিন কেটে গেছে। কিন্তু সে বিন্দুমাত্র বিরহ বোধ করেনি।
রেমি নীচের ঘরে এসে দেখল, ধ্রুব নেই। ওয়ার্ডরোব খুলে রেমি শাড়ি ব্লাউজ বের করে পরতে লাগল। সামান্য প্রসাধন মাখল মুখে। চুল আঁচড়াল। যখন চটিজোড়া খুঁজছে তখন দরজায় টোকা দিয়ে ঘরে ঢোকে ধ্রুব।
ঢুকেই বলে, বেরোচ্ছ! বাঃ! এই তো উন্নতি দেখা যাচ্ছে।
রেমি জবাব দিল না। চটি পরল।
ধ্রুব তার দিকে খানিকক্ষণ চেয়ে থেকে বলল, ওই গাড়লটাকে বোলো ওভাবে এ গলিতে ঘুরঘুর করতে। কেষ্ট চৌধুরীর চোখ তো মোটে একজোড়া নয়।
রেমি থমকায়। তারপর বলে, তুমি তা হলে জানো?
শুধু আমি কেন, জগাদা হরিদা থেকে শুরু করে ঠিকে ঝি পর্যন্ত জানে।
জানে?
পানওলাটা কেষ্ট চৌধুরীর একজন ক্যাডার, আর ক্যাডার বলেই ইলিগাল কনস্ট্রাকশন করে দোকানঘরটা খুলতে পেরেছে। গাড়লটা যা ভাবছে তা নয়।
রেমি যদিও নার্ভাস বোধ করছিল, তবু বলল, বেশ তো, জেনে এখন কী করবে?
তা আমি কী জানি! তোমার শ্বশুর জানে। তাকে জিজ্ঞেস কোরো।
আমি ওর সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছি।
হ্যাঁ। গির্জার গলির মুখে ও দাঁড়িয়ে আছে। যাও।
তুমি আমাদের কথা শুনেছ?
সে আর শক্ত কথা কী? নীচের হলঘরে এক্সটেনশন ধরে যে কেউ শুনতে পারে। ইন ফ্যাক্ট আমি শুনলেও জগাদা শুনত। সে তোমাকে নজরে রাখছে।
