আর রেমি তখন ঘরবন্দি হয়ে কখনও হাসে, কখনও কাঁদে, কখনও চুপ করে বসে থাকে। কী ভাবে, তা সে নিজেও ভাল বুঝতে পারে না। কোনও বিষয়ে আগাগোড়া কিছুই চিন্তা করতে পারে না সে। কখনও এটা নিয়ে এক টুকরো ভাবে, কখনও আর-একটা নিয়ে আর-এক টুকরো ভাবে। মাথার ভিতর দিয়ে খণ্ড-মেঘের মতো চিন্তা ভেসে যায়। কোনওটাই থামে না, আকাশ ভরে ওঠে না, ঘটে না। বৃষ্টিপাত। ধ্রুবর প্রেমিকার কথা ভাবে একটু, তক্ষুনি রাজার মুখ মনে পড়ে যায়, কৃষ্ণকান্তর জন্য ভাবনা হতে থাকে হঠাৎ, তারপর না-হওয়া একটা বাচ্চার অশ্রুত কান্নার শব্দ কানে আসে তার। সমীর! হ্যাঁ, সমীরকেও তার মনে পড়ে। জলঢাকা যাওয়ার পথে সমীরের সেই তার কাছে আত্মবিসর্জন! সবচেয়ে বেশি, সবচেয়ে গভীরভাবে সে যার কথা ভাবে তার মতো শক্ত তার দ্বিতীয় নেই। ধ্রুব।
ধ্রুব তাকে লক্ষ করে, কিন্তু বেশি কথা বলে না। একটু গম্ভীর দেখায় ওকে আজকাল। কিন্তু খুব লক্ষ করে তাকে। বিয়ের পর এতকালের মধ্যে এমন করে রেমিকে লক্ষ করেনি সে আগে।
কিন্তু ধ্রুবর সেই চোখের ভিতরে কী আছে তা টের পায় না রেমি। ভিতরে ভিতরে একটা বাঁধ কেটে যাচ্ছে তার। যে আবেগটা ধ্রুব নামে এক সীমানায় আবদ্ধ ছিল এতকাল তা আর নেই। ধ্রুবর প্রেমিকা আছে। তারও আছে রাজা। তারা তো এখন আর শুধু পরস্পরের নয়। কোথায় কী করে যেন একে অন্যের দাবি একটু করে হারিয়ে ফেলেছে।
কিন্তু রাগ করে না রেমি। অভিমানও হয় না। শুধু অসহায় এক কান্না ভিতর থেকে উঠে এসে তাকে ওলটপালট করে দিয়ে যায়।
বেসিনে মাটিমাখা হাত ধুতে ধুতে একদিন বাথরুম থেকেই ধ্রুব মুখ ফিরিয়ে তার কান্না দেখছিল। দেখতে দেখতে হঠাৎ বলল, তুমি কিন্তু একটু কেমন হয়ে যাচ্ছ। আনব্যালানসড। বুঝলে!
রেমি জবাব দিল না।
ধ্রুব এসে ভেজা হাতখানা তার কপালে রেখে বলল, এমন কিছু ঘটনা তো ঘটেনি।
ঘটেনি!—রেমি কান্নার মধ্যেও অবাক না হয়ে পারে না।
ধ্রুব উদাস গলায় বলে, আমরা তো সবাই একদিন মুছে যাব। আমরা যা সব করেছি তার চিহ্নও থাকবে না কোথাও। বুঝলে! অনুতাপ শোক এইসব কত কী করে মানুষ অযথা আয়ুর খানিকটা সময় বইয়ে দেয়। ওঠো, বি এ স্পাের্টসম্যান।
রেমি বেশ আশ্চর্য একথা শুনে উঠল। চোখের জলও মুছল। কাঁদতে কাঁদতে হিক্কা উঠে গিয়েছিল তার। সেটা বন্ধ হল না। ধ্রুবর দিকে চেয়ে বলল, তাকে আনো।
কাকে?
তাকে! আমি দেখব।
ধ্রুবর কোথাও হাসি ছিল না। চোখে না, ঠোঁটে না। রেমিকে একজন ডাক্তারের মতো চোখে দেখল কিছুক্ষণ। রোগটা ধরার চেষ্টা করল যেন। তারপর বলল, একদম পেগলে যাচ্ছ। আজকাল শ্বশুরের পদসেবা-টেবা করতেও ভুলে গেছ বোধহয়।
আমি ওঁর পদসেবা করি না তো! উনি ওরকম নন।
আহা। করলেও তো পারো।
কেন?
একটা কাজ নিয়ে থাকা ভাল। যেরকম অবস্থা করেছ তাতে এখন তোমাকে একপলক দেখেই সবাই টের পেয়ে যাবে যে, এই কচি মেয়েটার কিছু একটা হয়েছে। তোমার শ্বশুরমশাইও সেটা টের পাচ্ছেন। উনি মোর দ্যান অ্যাভারেজ বুদ্ধিমান। পদসেবা-টেবা করে সেটা কাটিয়ে দেওয়াই বুদ্ধিমতীর কাজ হবে।
রেমি একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, ওঁকে নিয়ে তোমার কি আজকাল খুব ভাবনা হয়?
ধ্রুব একথার জবাব না দিয়ে বলল, তোমাকে নিয়েই ভাবনা হচ্ছে। কেঁদেকেটে মুখখানা করেছ রাবণের মা। এত কান্নার কী আছে? কত মেয়ে ডিভোের্স করে আবার বিয়ে করছে।
আমি কি তাদের দলে?
দল আবার কী! তারাই কি খুব খারাপ মেয়ে? যার সঙ্গে যার বনে না তার সঙ্গে খাম আর ডাকটিকিটের মতো সেঁটে থাকার দরকার কী? না বলে ছেড়ে দেওয়াই তো ভাল।
ছাড়ছিই তো।
ছাড়ছ, কিন্তু এমন একটা সিন করছ যে সবাই ভাবছে এই ছাড়ার পিছনে তোমার কোনও দায় নেই। যত দায় আমার।
রেমির চোখ ভরে জল এল ফের। সে কথা বলতে পারল না। কোনওরকমে আঁচলে চোখ ঢেকে বলল, তুমি এখন যাও। ধ্রুব চলে গেল।
রেমি তার কান্না শেষ করল অনেকক্ষণ বাদে। তারপর ভাবতে বসল। শ্বশুরমশাই কিছু টের পাচ্ছেন সত্যি? পাওয়ারই কথা। সে আজকাল দোতলার ঘরে থাকে না। থাকে ধ্রুবর সঙ্গে একই ঘরে। গত কয়েকদিন এরকমই আছে সে। কিন্তু অদ্ভুত থাকা। পাশাপাশি দুজনে শোয়, একই বিছানায়। মাঝখানে একটু নো-ম্যানস-ল্যান্ড ফাঁকা পড়ে থাকে। কেউ সেটুকু ডিঙোয় না। আসন্ন বিচ্ছেদের সূচনা? হবে। সেই বিচ্ছেদের কিছু আগাম চিহ্ন রেমির মুখ-চোখে গভীরভাবে পড়েছে। শ্বশুরমশাই তীক্ষ দৃষ্টিসম্পন্ন মানুষ। সবই লক্ষ করেন। কিন্তু কখনওই কিছু আগ বাড়িয়ে বলতে আসেন না। কৃষ্ণকান্তর স্ট্র্যাটেজি অন্যরকম। কখন দ্রুত অ্যাকশন নিতে হবে, কখন অপেক্ষা করতে হবে তিনি তা চমৎকার বোঝেন। রেমিকে তিনি বরাবর এই সুযোগটা দিয়েছেন। সম্ভবত এখনও দিচ্ছেন। রেমি আজকাল শ্বশুরের দেখাশুনো ঠিকমতো করে না। ওপরে যায় খুব কম। উনি হয়তো অপেক্ষা করেন। সব টের পেয়েও নিজে থেকে কিছু করেন না।
রেমি আজ ওপরে এল। পড়ন্ত বেলায়। কৃষ্ণকান্ত বাড়ি নেই। কখন বেরিয়েছেন তা খোঁজ নিয়ে জেনে রেমি বুঝতে পারল, উনি দুপুরে খাননি। আজকাল নাকি প্রায়দিনই দুপুরে খান না। পার্টির কী সব জরুরি মিটিং চলছে।
অনেকদিন লতুর সঙ্গে দেখাই হয় না। কোনওকালে ননদের সঙ্গে ভাব ছিল না রেমির। ঝগড়াও নেই। সহজ একটা ঈর্ষাহীন, ভালবাসাহীন সম্পর্ক ছিল মাত্র। লতু আজকাল খুব পার্টি করে। প্রায়ই বাড়ি থাকে না। আজও নেই।
