আমি কিছু শুনতে চাই না।–বিশাখা মাথা নেড়ে বলো। কিন্তু তার গলায় রাগের ঝঝ নেই। দুটো বড় বড় চোখ হঠাৎ টলটল করে ভরে উঠল জলে।
চপলা খুব দ্রুত চাপা গলায় বলে, আমি না হয় খারাপ। খুব খারাপ। আমার চরিত্র ধরলাম ভীষণ নোংরা।
ওসব বলছ কেন? বোলো না। পায়ে পড়ি। ওসব থাক।
শোন বিশাখা, শোন।
না।–বলে বিশাখা দুহাতে কান চাপা দিয়ে বলে, ওসব শুনতে চাই না।
কেমন একটা মরিয়া আবেগে চপলা হঠাৎ হাত বাড়িয়ে বিশাখার দুহাত চেপে ধরে রুদ্ধ গলায় বলল, শোন, শোনাটা ভীষণ দরকার।
বিশাখার দুচোখ দিয়ে টপ টপ করে জল পড়ছিল। ঠোঁট কাঁপছে। তারপরই হঠাৎ শব্দ করে কেঁদে ওঠে সে। মাথা নেড়ে বলে, কেন এরকম করলে বউদি? কেন এরকম হয়ে গেলে? কৃষ্ণ যে তোমাকে মায়ের মতো ভালবাসে!
একথায় চপলা কেমন যেন বিকল হয়ে যায়। কৃষ্ণ! কৃষ্ণ তার দেওর। হোট, এখনও অবুঝ। এই বালক দেওরটিকে কেন যে সে এত ভালবাসে! শুধু ভালবাসা নয়, কৃষ্ণের মধ্যে এক অদ্ভুত সম্মোহনকারী আকর্ষণ আছে। মনে হয় একদিন ছেলেটা মস্ত কিছু হয়ে উঠবে। তাই ভালবাসার সঙ্গে কৃষ্ণর প্রতি একটা শ্রদ্ধার ভাবও আছে চপলার। কিন্তু কৃষ্ণর কথাটা হঠাৎ বিশাখা কেন তুলল তা সে বুঝল না।
চপলা বিশাখার হাতদুটো ছেড়ে দিয়ে বলে, শচীনকে তো তুই দুচোখে দেখতে পারিস না।
বিশাখা দু হাতে মুখ ঢেকে কাঁদতে লাগল। জবাব দিল না।
চপলা ফের জিজ্ঞেস করল, তা হলে তোর এই অবস্থা কেন?
বিশাখা জবাব দিল না একথারও।
চপলা বলল, আমি খারাপ তো বলছিই। আমার খারাপ হওয়ার কারণ আছে। তুই বুঝবি না। নিজের দোষ আমি ঢাকতেও চাই না। কিন্তু আমি জানতে চাই, তোর কী হল? তুই কেন এরকম করছিস?
জবাব দেওয়ার মতো অবস্থা বিশাখার নয়। সে দৌড়ে গিয়ে বিছানায় উপুড় হয়ে পড়ল। তারপর কান্নার বাঁধ ভেঙে দিল।
অনেকক্ষণ চুপ করে দৃশ্যটা দেখল চপলা। কিন্তু আর বিশাখার কাছে যাওয়ার উৎসাহ বোধ করল না।
ঘর থেকে বেরিয়ে এসে দরজাটা ভেজিয়ে দিল সে।
ধীরে ধীরে কিন্তু মোেটামুটি দৃঢ় পদক্ষেপে হেঁটে সে হেমকান্তর ঘরের সামনে এল।
হেমকান্তর দিবানিদ্রা নেই বড় একটা। ইজিচেয়ারে আধশোয়া হয়ে রবীন্দ্রনাথের একখানা বই পড়ছেন।
চপলা ডাকল, বাবা।
হেমকান্ত কিছু বিস্মিত চোখ তুলে বললেন, বলো!
আমি কাল কলকাতা যেতে চাই। ব্যবস্থা করে দিতে পারবেন?
হেমকান্ত নড়েচড়ে সোজা হয়ে বসে বললেন, কালই যেতে চাও? কিন্তু দিনটা দেখতে হবে। পুরুতমশাইকে খবর পাঠিয়ে পাঁজিটা দেখতে বলে দাও তো।
পাঁজি দেখতে হবে না, বাবা। কাল দিন শুভ। আমি জানি।
দেখেছ?
দেখেছি। আপনি শুধু একজন কাউকে সঙ্গী দিলেই হবে।
তার আর ভাবনা কী? খাজাঞ্চিমশাই যেতে পারবেন।
ভাল। আর-একটা কথা বাবা, আমি যে কাল যাচ্ছি সেটা যেন গোপন থাকে।
কেন বলো তো!
কথাটার জবাব চপলা ভেবে আসেনি। হেমকান্ত এরকম প্রশ্ন করবেন বলে আশাও করেনি। সে তাই কথাটা ঘুরিয়ে দেওয়ার জন্য বলল, আপনার ছেলেকে একটা টেলিগ্রাম করে দিলে ভাল হয়। স্টেশনে থাকতে পারবে।
সে তো ঠিক কথা। দেওয়া যাবে। তুমি গিয়ে গোছগাছ করো।
চপলা ধীরে ধীরে নিজের ঘরে ফিরে আসে। বুকটা কেমন করছে। বুকটা ভেঙে গুঁড়িয়ে যাচ্ছে একটা পাষাণভরে।
ছেলেমেয়ে দুজন একে একে ঘুম থেকে উঠল। তাদের যান্ত্রিকভাবে সাজিয়ে দিল চপলা। খাইয়ে খেলতে পাঠাল ছাদের ঘরে। বিকেল পেরিয়ে সন্ধে হল।
চপলা এ সময়ে একবার কাছারির দিকে উকিঝুকি দেয় রোজ। আজ দিল না। শচীনের জন্য জলখাবার পাঠানো আজকাল তারই কাজ। কিন্তু সে উঠল না। দাসীরা যা ভাল বুঝবে সাজিয়ে দেবে।
অন্ধকার ঘরে সেজ জ্বালিয়ে দিয়ে গেছে একজন চাকর। বাতিটা কমিয়ে মশার শব্দের মধ্যে চেয়ারে চুপচাপ বসে থাকে চপলা। বাইরে বৃষ্টির জোর বাড়ছে। বাদলা বাতাস হঠাৎ ঘরে ঢুকে চারদিকের জিনিসপত্রে একটা শব্দ তুলে চলে গেল। সেজবাতি লাফিয়ে চিমনিতে কালি ফেলতে লাগল। দরজা বন্ধ করতে উঠল না চপলা।
সন্ধে পার হওয়ার মুখেই বোধ হয় আচমকা দরজায় শচীনের লম্বা ফরসা চেহারাখানা দেখে একটু চমকে উঠেছিল চপলা।
এত সাহস শচীন কোনওদিন করেনি। তাদের দেখা হয় নীচের তলায় পিছন দিককার একটা ঘরে। দোতলা অন্দরমহল। এখানে যার-তার উঠে আসবার অধিকার নেই।
চপলা বুঝল, শচীন এখন সত্যিই পাগল।
শচীন জিজ্ঞেস করল, আজ দেখা নেই কেন? এতক্ষণ নীচে অপেক্ষা করলাম।
আজ আমার শরীর ভাল নেই।
কী হয়েছে?
জ্বর।
জ্বর! তাতে কী? একটা খববও তো পাঠানো যেত।
আমার জ্বর তাতে আপনাকে খবর দেব কেন? আপনি তো ডাক্তার নন। উকিল।
ওটা আবার কেমন কথা, চপলা? বলে শচীন ঘরে ঢুকল। দুপা এগিয়ে এসে বলল, আজ কি মুড ভাল নেই?
চপলা শচীনের দিকে চেয়ে বলল, আপনার সত্যিই মাথার ঠিক নেই।
কেন বলো তো!
দোতলায় উঠে এসেছেন! লোকে কী ভাববে?
ভাবুক না। ভাবুক, বলুক। আমার কিছু যায় আসে না।
যায় আসে না কেন?
আমি যে পাগল! তুমিই বলেছ।
০৫৮. মাথার ঠিক ছিল না রেমির
দিন কয়েক মাথার সত্যিই ঠিক ছিল না রেমির। তার সামান্য মাথা কতই বা বইতে পারে? কিন্তু সেই কয়েকটা দিন ধ্রুব ছিল অস্বাভাবিক রকমের স্বাভাবিক। এক ফোঁটা মদ খায়নি। অফিসে যায়নি। বলতে গেলে সারাক্ষণই বাড়িতে থেকেছে। পিছন দিকে সামান্য একটু জমি আছে। সেখানে কোনওকালে ফুলগাছ লাগানো হত। আজকাল হয় না। ধ্রুব হঠাৎ সেই পতিত জমি উদ্ধারে মন দিল কয়েকদিন। মাটি খুঁড়ে সার দিয়ে কয়েকটা গাছ লাগাল।
